জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে করা মামলায় ঢাকা-৭ আসনের আওয়ামী লীগদলীয় সংসদ সদস্য (এমপি) হাজী মো. সেলিমকে বিচারিক আদালতের দেওয়া ১০ বছরের কারাদন্ড বহাল রেখেছে উচ্চ আদালত। তবে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এ মামলায় সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে তাকে বিচারিক আদালত তিন বছরের যে সাজা দিয়েছিল সেটি থেকে খালাস পেয়েছেন তিনি। এ মামলায় হাইকোর্টে হাজী সেলিমের আপিল সংশোধন (আংশিক গ্রহণ ও আংশিক খারিজ) করে এ গতকাল মঙ্গলবার রায় দেয় বিচারপতি মো. মঈনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের বেঞ্চ। রায়ে বলা হয়েছে, রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে হাজী সেলিমকে। এ সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণ না করলে তার জামিননামা বাতিল করে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।
বিচারিক আদালতের রায়ে হাজী সেলিমকে দেওয়া ১০ লাখ টাকা অর্থদন্ড ও অনাদায়ে আরও এক বছর কারাদন্ডের রায় বহাল রয়েছে হাইকোর্টের রায়ে। এ মামলায় উল্লিখিত জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করারও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ মামলায় হাজী সেলিমের স্ত্রী গুলশান আরা সেলিমকে সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে তিন বছর কারাদন্ড দিয়েছিল বিচারিক আদালত। গত বছর ২৯ নভেম্বর রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। হাইকোর্টের রায়ে তার আপিলটি বাতিল করা হয়েছে।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি শুনানি শেষে রায়ের জন্য ৯ মার্চ (গতকাল) ধার্য করে হাইকোর্ট। আদালতে দুদকের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মো. খুরশিদ আলম খান। হাজী সেলিমের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুল বাসেত মজুমদার। সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা। আইনজীবীরা জানান, রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পেলে সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিলের সুযোগ থাকছে হাজী সেলিমের সামনে।
সম্প্রতি কুয়েতের একটি আদালতে অর্থ ও মানব পাচারের অভিযোগে চার বছরের কারাদন্ড হয় লক্ষ্মীপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলের। রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর গত ২২ ফেব্রুয়ারি তার আসন শূন্য ঘোষণা করে জাতীয় সংসদ সচিবালয়। যেদিন (গত ২৮ জানুয়ারি) থেকে তিনি দন্ডিত হয়েছিলেন সেদিন থেকে আসনটি শূন্য বলে ধরে নেওয়া হয়।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় দুদকের আইনজীবী মো. খুরশিদ আলম খান জানান, এ রায়ের ফলে সংবিধান অনুযায়ী হাজী সেলিম সংসদ সদস্য পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন। অন্যদিকে হাজী সেলিমের আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনের বিধান অনুযায়ী রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পেলে আপিলের জন্য দুই মাস সময় পাব আমরা। একই সঙ্গে অনুলিপি পেলে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়েছে হাইকোর্টের রায়ে। এখন আমরা হাইকোর্টের রায়ের অনুলিপির অপেক্ষায় থাকব। এটি পেলে আত্মসমর্পণ ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে। এ সময়ের মধ্যে তার (হাজী সেলিম) সংসদ সদস্য পদে থাকতে কোনো বাধা নেই।’
অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিচারিক আদালতের রায়ে হাজী সেলিমকে দেওয়া ১০ বছর কারাদন্ড বহাল রেখেছে হাইকোর্ট। আর তিন বছরের সাজা থেকে খালাসের বিষয়ে আপিল করা হবে কি না সেটি কমিশনকে অবহিত করেছি। কমিশন আমাদের সিদ্ধান্ত দেবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, দন্ড বহাল থাকায় সংবিধান অনুযায়ী তিনি সংসদ সদস্য পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন। আপিলের সুযোগ পাওয়া আর দন্ড স্থগিতের সুযোগ এক নয়। দুটো ভিন্ন জিনিস। আপিল করলেই দন্ড স্থগিত হয়ে যায় না। পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পেলে তিনি আত্মসমর্পণ ও আপিলের সুযোগ পাচ্ছেন।’
হাজী সেলিমের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে রাজধানীর লালবাগ থানায় ২০০৭ সালের ২৪ অক্টোবর মামলা করে তখনকার দুর্নীতি দমন ব্যুরো (বর্তমানে দুদক)। বিচার কার্যক্রম শেষে ২০০৮ সালের ২৭ এপ্রিল সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালত এক রায়ে হাজী সেলিমকে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ১০ বছর এবং সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে তিন বছরের কারাদন্ডাদেশ দেয়।
এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের ২৫ অক্টোবর হাইকোর্টে আপিল করেন হাজী সেলিম। ২০১১ সালের ২ জানুয়ারি হাইকোর্ট এক রায়ে হাজী সেলিমের সাজা বাতিল করে তাকে খালাস দেয়। এরপর হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করে দুদক। শুনানি শেষে ২০১৫ সালের ১২ জানুয়ারি আপিল বিভাগ হাজী সেলিমকে খালাস দিয়ে হাইকোর্টের ওই রায় বাতিল করে পুনরায় হাজী সেলিমের আপিলের শুনানি করতে হাইকোর্টকে নির্দেশ দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি ফের শুনানির পর্যায়ে আসে। গত বছর ১১ নভেম্বর হাজী সেলিমের মামলার যাবতীয় নথি তলব করে হাইকোর্ট। এরই ধারাবাহিকতায় শুনানি শেষে এ রায় হলো।
আপিল খারিজ হলে হাজী সেলিমের এমপি পদ বাতিল হতে পারে : লক্ষ্মীপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য (এমপি) কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলের মতোই নৈতিক স্খলনের দায়ে এমপি পদ হারাতে পারেন ঢাকা-৭ আসনের আওয়ামী লীগদলীয় এমপি হাজী মোহাম্মদ সেলিম। অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের এক মামলায় ১০ বছরের কারাদণ্ড বহাল থাকায় হাজী সেলিমের এমপি পদ নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার থেকে এ আলোচনা শুরু হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় বিচারিক আদালতের দেওয়া হাজী সেলিমের ১৩ বছরের কারাদণ্ড কমিয়ে গতকাল ১০ বছর বহাল রেখেছে হাইকোর্ট। বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের ২ (ঘ) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর অন্তত দুই বছরের বেশি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে এবং মুক্তিলাভের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হলে তিনি এমপি হিসেবে থাকতে পারবেন না।
জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রায়ের কপি হাতে পেলে সংবিধান অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এমপি পদ সাংবিধানিক। সেক্ষেত্রে সংবিধানেই ঠিক করে দেওয়া আছে, যদি সংসদ সদস্য নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন তার পদ থাকবে কিনা। রায়ের কপি পেলে সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তবে রায়ের পরে হাজী সেলিমের আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা সাংবাদিকদের জানান, হাইকোর্টের দেওয়া রায়ই চূড়ান্ত নয়। এর বিরুদ্ধে আপিল আবেদন করা হবে। সুপ্রিম কোর্ট আপিল আবেদন গ্রহণ করার পর যদি এ রায় বাতিল হয় তাহলে তার এমপি পদ বাতিল হওয়ার সুযোগ নেই।
এর আগে কুয়েতে ফৌজদারি অপরাধে চার বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ায় লক্ষ্মীপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র এমপি পাপুলের এমপি পদ বাতিল করে গত ২২ ফেব্রুয়ারি প্রজ্ঞাপন জারি করে সংসদ সচিবালয়। এতে বলা হয়, রায় ঘোষণার দিন ২৮ জানুয়ারি থেকে তার আসন শূন্য হয়েছে।
সাবেক আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংবিধানের ৬৬ (২) (ঘ) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে বলা আছে যে, কোনো সংসদ সদস্য যদি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্যূন দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে পদে থাকার যোগ্যতা হারাবেন। কাজেই আপিল খারিজ হলে হাজী সেলিমের এমপি পদ থাকবে না।’
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘সংবিধানের ৬৬ (২) (ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য যদি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন এবং ন্যূনতম দুই বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন, তাহলে তার সংসদ সদস্য পদ থাকবে না। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তার (হাজী সেলিম) নৈতিক স্খলন হয়েছে।’
