কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরি

পাইকগাছায় হুমকিতে পরিবেশ

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২১, ১২:০৩ এএম

খুলনার পাইকগাছা উপজেলায় প্রশাসনের নির্দেশ উপেক্ষা করে অবৈধভাবে কাঠ পুড়িয়ে তৈরি করা হচ্ছে কয়লা। প্রায় ২৫টির মতো কারখানায় প্রতিদিন পোড়ানো হচ্ছে কয়েক হাজার মণ কাঠ। এভাবে কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরি করায় এলাকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। এতে একদিকে সৃষ্ট ধোঁয়ায় তৈরি হচ্ছে শ্বাসজনিত নানা ব্যাধি। অপরদিকে, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যেরও মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানায়, প্রায় ২৫ বছর আগে উপজেলার চাঁদখালী ইউনিয়নের চাঁদখালী-কয়রা সড়কের পাশে চাঁদখালী বাজারের দক্ষিণপাশে গড়েরডাঙ্গা গ্রামে কয়লা তৈরির কারখানাগুলো গড়ে উঠতে শুরু করে। ২-৩ বছরেই গড়েরডাঙ্গা থেকে বাজাদার পাড়া পর্যন্ত আধা কিলোমিটারের মধ্যে ৪০ থেকে ৪৫টি কারখানা গড়ে তোলা হয়। কারখানার এক কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে  একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে, দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুটি মাদ্রাসা। সে সময় সুন্দরবনের গরান কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরি হতো। এক সময় গরান কাঠ কমতে শুরু করে সুন্দরবন থেকে। তাছাড়া আশপাশের নদীগুলোও ভরাট হতে থাকে। নদী ভরাটের ফলে কাঠ পরিবহনে সমস্যা দেখা দেয়। তখন কারখানা চালু রাখতে মালিকরা সাধারণ (বিশেষ করে শিরিষ গাছ) কাঠের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব কয়লার কারখানায় দেদার পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। জেলা প্রশাসক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো অনুমোদন ছাড়াই এসব কয়লা তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে। শক্ত মাটি, ইট ও কাঠের গুঁড়া মিশিয়ে তৈরি করা চুল্লিতে পোড়ানো হচ্ছে শত শত মণ কাঠ।

গত ৮ মার্চ কারখানা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ওই এলাকায় প্রায় ২৫টি কয়লা তৈরির বিশেষ ধরনের অবৈধ চুল্লি। অধিকাংশ কারখানায় তালা দিয়ে চলে গেছেন কারখানা মালিকরা। কিন্তু চুল্লিতে কাঠ পুড়ছে। নির্গত হচ্ছে প্রচুর কালো ধোঁয়া। ওই সড়ক দিয়ে চলাচলকারীদের ধোঁয়ার কারণে কাশতে দেখা গেছে।

এ সময় মো. হাবিবের কারখানায় চুল্লির মধ্যে কাঠ সাজাচ্ছিলেন মো. শাহজান, রেহেনা বেগমসহ আরও কয়েক শ্রমিক। মো. শাহজান বলেন, একটি চুল্লিতে দেড়শ’ মণ কাঠ ধরে। কাঠ পুড়ে শেষ হতে প্রায় ৬ দিন লাগে।

এলাকার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, এই কারখানার কারণে বেঁচে থাকা দায়। ধোঁয়া ও কটু গন্ধে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। এলাকার মানুষের হাঁচি, কাশি ও বুকে ব্যথা লেগেই আছে। কিন্তু প্রশাসন একদম চুপ। মাঝে মধ্যে এসে দেখে চলে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কয়লা ব্যবসায়ী বলেন, কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরি অবৈধ হলেও কিছু করার নেই। এ ব্যবসায় অল্প পুঁজিতে ভালো লাভ হয়। তাই এ ব্যবসা করে যাচ্ছি।

তবে, কয়লা কারখানার মালিক আবদুল হালিম খোকন বলেন, এই ব্যবসায় তেমন লাভ হয় না। এক মণ কয়লা বিক্রি হয় ৭৩২ টাকা থেকে ৭৫০ টাকা।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন কনসালট্যান্ট শৈলেন্দ্রনাথ বিশ্বাস বলেন, কয়লা তৈরিতে কাঁচা কাঠ পোড়ানোয় কার্বন ও সিসা নির্গত হয়। যে এলাকায় এসব চুলায় কাঠ পুড়িয়ে ধোঁয়ার সৃষ্টি করা হচ্ছে, সেখানে নিশ্চিতভাবে শিশু জন্মগতভাবেই ফুসফুসের সমস্যা নিয়ে জন্ম নেবে। এ ছাড়া এসব চুল্লির ধোঁয়ায় মানুষের অ্যাজমা সমস্যা, ফুসফুসের শ্বাসকষ্টজনিত রোগ ও অ্যালার্জির সমস্যা এবং চোখের সমস্যাসহ নানাবিধ রোগ হতে পারে।

পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ বি এম খালিদ হোসেন সিদ্দিকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, চুল্লিগুলো উচ্ছেদ করার যন্ত্রপাতি আমাদের নেই। আশা করছি আগামী সপ্তাহে উচ্ছেদ করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত