থমথমে অচলাবস্থার অবসান চান নোয়াখালী কোম্পানীগঞ্জ বসুরহাটের বাসিন্দারা। তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান। আর কোনো রক্তারক্তি দেখতে চান না তারা। গত দুই মাস ধরে কয়েক দফায় বসুরহাটের রাজনৈতিক সংঘাত, সংঘর্ষ এখন রক্তপাতে রূপ নিয়েছে। এখন বসুরহাটজুড়ে শুধুই অস্থিরতা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারাও বলছেন, অনেক হয়েছে, এখন সমাধান দরকার। শুধু স্থানীয় পর্যায়েই নয়, পুরো দেশ তাকিয়ে আছে বসুরহাটের দিকে। ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতারাও এ নিয়ে হতাশ। দলের সাধারণ সম্পাদকের এলাকা ও তার পরিবারের সদস্যকে ঘিরে জটিলতা তৈরি হওয়ায় অন্য কেউই এ বিষয়ে মন্তব্য করা থেকেও বিরত থাকছেন।
আওয়ামী লীগের এক প্রেসিডিয়াম সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, বসুরহাটের ঘটনা নিয়ে দলের কিছুটা অস্বস্তি রয়েছে। আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যেই এর সমাধান হবে আশা করছি। তিনি বলেন, এর মধ্যে পুরো বিষয়টি জানতে জেলাকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। জেলা থেকে প্রতিবেদন এসেছে। তিনি জানান, জেলা পর্যায়ে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণেই এ পরিস্থিতি হয়েছে।
নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ সমাধান স্থানীয় পর্যায়ে সমাধান হবে না। এখানে তৃতীয়পক্ষও সুযোগ নিচ্ছে। দলের ও এলাকার ইমেজ ক্ষুণ্ন করতে অনেকেই বাইরে থেকে উসকানি দিচ্ছে। তাই আমরা চাই কেন্দ্র থেকে এর সমাধান আসা দরকার।
এদিকে গতকাল শুক্রবারও বসুরহাট এলাকার পরিস্থিতি ছিল অস্বাভাবিক। মামলা-হামলা ও গ্রেপ্তার আতঙ্কের মধ্যে সময় পার করছেন এই এলাকার মানুষ। বসুরহাটের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে মোতায়েন করা তিন শতাধিক পুলিশ ও র্যাবের সদস্য নিয়মিত টহল দিচ্ছেন। এছাড়া আছেন প্রশাসনের একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বসুরহাটে অবস্থান করছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের একজন পুলিশ সুপারসহ জেলা পুলিশের বেশ কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তা।
গত বৃহস্পতিবার জেলা শহর মাইজদী থেকে গ্রেপ্তার করা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদলকে পুলিশের ওপর হামলার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি জাহেদুল হক রনি।
গতকাল মিজানুর রহমান বাদলকে নোয়াখালীর ১নং আমলি আদালতে হাজির করা হলে আদালতের বিচারক শোয়াইব উদ্দিন খান মিজানুর রহমান বাদলকে জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন। এর আগে মঙ্গলবার গুলিতে নিহত আলাউদ্দিনের ছোট ভাই এমদাদ হোসেন ওরফে রাজু বৃহস্পতিবার রাতে কাদের মির্জাকে প্রধান আসামি করে একটি লিখিত অভিযোগ নিয়ে থানায় যান। এজাহারে ত্রুটি থাকায় পুলিশ এজাহার গ্রহণ করেনি বলে এমদাদ সাংবাদিকদের জানান। এর আগে এজাহারে সমস্যা থাকায় মামলা নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছিলেন পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেন।
এদিকে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা খিজির হায়াত খানের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা করছেন তার সহধর্মিণী আরজুমান পারভীন। তিনি জানান, আমি এসপি সাহেবকে জানিয়েছি। ওসি সাহেব থানায় এলে মামলা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন।
বসুরহাটের একজন খুচরা ও পাইকারী ব্যবসায়ী বলেন, বাজারে এসব রাজনৈতিক হানাহানির কারণে এখন আর ক্রেতা আসছে না। সারাদিন বসে থাকতে হয়। অস্থিরতার কারণে আমাদের অবস্থা শোচনীয়। আমাদের পরিবারও উৎকণ্ঠিত থাকে কখন আমরা হামলার শিকার হই! গুলিবিদ্ধ হই। বোমার মুখে পড়ি। তিনি বলেন, আমরা এ হানাহানি চাই না। এ অস্থিরতা যেন কাটে সে বিষয়ে প্রশাসন, ঊর্ধ্বতনরা যেন আমাদের বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি দেন।
কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, বসুরহাট বাজারটি এ অঞ্চলের সব থেকে বড় বাজার। প্রায় তিন মাস ধরে বাজারের ওপর নানা কর্মসূচির কারণে ব্যবসায়িক ক্ষতির মধ্যে রয়েছেন তারা। বসুরহাট বাজারে লোকজনের স্বাভাবিক উপস্থিতিও কমে গেছে।
বসুরহাটের ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সহসভাপতি ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ব্যবসায়ীরা আজকে দোকানপাট খুলেছেন। আমাদের সেক্রেটারির বক্তব্যের পর আশ্বস্ত হয়েছেন। আস্তে আস্তে ক্রেতা সমাগম বাড়ছে।
অন্যদিকে ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন নিজাম বলেন, আমরা অশান্তিতে আছি। গত দুদিন আমাদের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে। বসুরহাট বাজারের মানুষ একটা সন্ত্রাসী তা-ব দেখেছে। মানুষ আতঙ্কে ছিল। গত বুধবার ১৪৪ ধারা জারি ছিল। এখন কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসছে। এ সময় তিনি এমন স্বাভাবিক অবস্থা বজায় রাখার দাবি জানান।
বাদলের পরিবারের সংবাদ সম্মেলন, নিঃশর্ত মুক্তির দাবি : গতকাল নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদলের নিঃশর্ত মুক্তি চাইলেন তার স্ত্রী সেলিনা আক্তার কাকলী। এজন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা করেছেন। এদিন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে উপজেলার চরফকিরা ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের চরকালী গ্রামে নিজ বাড়িতে বাদলের মুক্তির দাবিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন এ কথা বলেন তিনি। কাকলী বলেন, ‘কাদের মির্জার যড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বিনা কারণে আমার স্বামী জেলে রয়েছে। কোম্পানীগঞ্জে সব সংঘর্ষ, সহিংসতা, রক্তপাত খুনের জন্য একমাত্র আবদুল কাদের মির্জা দায়ী। তিনি কোম্পানীগঞ্জের সব অপরাজনীতির হোতা।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, যাদের লোক মারা গেছে তাদের কোনো মামলা নেওয়া হয়নি, পুলিশ টালবাহানা করছে। কিন্তু যাদের লোক মারা যায়নি তাদের মামলা নেওয়া হয়েছে। বাদলের মা আরাধন বেগম বলেন, ‘একেবারে মিথ্য বানোয়াট কারণে আমার ছেলেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সব সংঘাতের জন্য কাদের মির্জা একমাত্র দায়ী।’ তিনি দ্রুত কাদের মির্জাকে আইনের আওতায় আনার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান।
গত মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৪টায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা খিজির হায়াত খানের ওপর হামলার প্রতিবাদে বসুরহাট বাজারের রূপালী চত্বরে এক প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে উপজেলা আওয়ামী লীগ। পরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সভায় আবদুল কাদের মির্জার অনুসারীরা সভার একেবারে শেষ মুহূর্তে ককটেল ও গুলি ছোড়ে এবং সভার পার্শ্ববর্তী এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নৈরাজ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি করে। এ সময় সভাস্থল থেকে উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতারা একসঙ্গে হয়ে কাদের মির্জার অনুসারীদের প্রতিরোধ করতে গেলে মাকসুদাহ গার্লস স্কুল রোড এলাকায় দুই গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ককটেল বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। মধ্যরাত পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দলের দুই গ্রুপের অনুসারীরা বসুরহাট বাজারের বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ, গোলাগুলি ও ভাঙচুর চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে আহত হন ওসি মীর জাহিদুল হক রনিসহ চার পুলিশ। সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অন্তত ৫০ জন আহত হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গুলিবিদ্ধ সিএনজি অটোরিকশাচালক ও স্থানীয় যুবলীগকর্মী মো. আলাউদ্দিন (৪০) মারা যান।
বসুরহাটে উত্তেজনার শুরু গত বছর ৩১ ডিসেম্বর থেকে। ওইদিন আবদুল কাদের মির্জা পৌর নির্বাচনের ইশতেহার ঘোষণাকালে নির্বাচন, জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতি, ফেনী ও নোয়াখালীর দুই সাংসদের বিরুদ্ধে অপরাজনীতি এবং টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজির নানা অভিযোগ তোলেন। পরে তিনি তার ভাই ওবায়দুল কাদের ও ভাবির বিষয়ে মন্তব্য করে আলোচনায় আসেন। এরই মধ্যে ওবায়দুল কাদেরের অনুসারী দাবি করে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান বাদলের নেতৃত্বে কাদের মির্জাবিরোধী একটি পক্ষ মাঠে নামে। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি চাপরাশিরহাট বাজারে বাদলের সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় কাদের মির্জার অনুসারীরা। ওই ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন স্থানীয় সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মুজাক্কির। পরদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এরপর গত মঙ্গলবার রাতে আবার দুপক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে আলাউদ্দিন নামে এক যুবলীগ নেতার মৃত্যু হয়।
