সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্প

মাছচাষিদের প্রণোদনার অর্থ আত্মসাতে কারসাজি

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২১, ০৫:৫৭ এএম

দেশের সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরার কালীগঞ্জে দুস্থ মাছচাষিদের করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বরাদ্দ প্রণোদনার অর্থ বণ্টনে বড় ধরনের অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, স্বজনপ্রীতি ও কৌশলে ঘুষ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। করোনাকালীন লকডাউনের সময় কর্মহীন হয়ে পড়া উপকূলীয় এলাকার অসহায়, দুস্থ, ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক মাছচাষি ও ঘেরমালিকদের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এ প্রণোদনার অর্থ বরাদ্দ করা হয়। অথচ যারা এ প্রণোদনার অর্থ পেয়েছেন তাদের অর্ধেকেরই বেশি প্রকৃত মাছচাষি নন। আর তাদের অধিকাংশই সচ্ছলও বটে।

প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে ‘সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ’ প্রকল্পের মাধ্যমে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি কালীগঞ্জের ১২টি ইউনিয়নে ৫ হাজার ৩৭২ জন মাছচাষিকে এ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, যারা এ প্রণোদনার অর্থ পেয়েছেন তাদের অর্ধেকেরই বেশি প্রকৃত মাছচাষি নন। যার ফলে দুস্থ মাছচাষিরা বঞ্চিত হয়েছেন। আর এ ক্ষেত্রে বঞ্চিত মাছচাষিদের অভিযোগের তীর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও মৎস্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তারা বলছেন, প্রতিটি ইউনিয়নেই স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিরা ঘের বা পুকুর না থাকা সত্ত্বেও নিজেদের নামে, একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে কিংবা আত্মীয়স্বজনদের নামে প্রণোদনার টাকা বণ্টন করেছেন। এছাড়া কিছু মাছচাষি তাদের নামে বরাদ্দ প্রণোদনার টাকার অর্ধেক বা তার চেয়েও অনেক কম পেয়েছেন।

প্রণোদনার অর্থ পেতে বিষ্ণুপুরের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের আবু হানিফ নিজের ও স্ত্রীর নামে নতুন সিম (প্রণোদনার টাকা মোবাইল ব্যাংকিং চ্যানেলে পাওয়ার জন্য) তোলেন। তাদের দুজনের নামে প্রণোদনার ২৩ হাজার টাকা বরাদ্দ হলেও দুজনে মিলে সর্বসাকল্যে পেয়েছেন মাত্র ৫ হাজার টাকা। এছাড়া ছাত্র, স্থানীয় চিকিৎসক কিংবা যারা কোনোদিন মাছচাষের সঙ্গে জড়িতই ছিলেন না, এমন অনেক ব্যক্তির নামেও প্রণোদনার অর্থ বরাদ্দ হয়েছে। যার ফলে বঞ্চিত হয়েছেন প্রকৃত দুস্থ মাছচাষিরা। তারা মানববন্ধন করে প্রতিকার চেয়ে জেলা প্রশাসক বরাবর চিঠি দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অভিযোগ শুনেছি। এ বিষয়ে তদন্ত করতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (সার্বিক) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

সাতক্ষীরার কালীগঞ্জের সাধারণ মাছচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক ক্ষতিগ্রস্ত ঘেরমালিক জানেনই না যে তাদের জন্য প্রণোদনার অর্থ সহায়তা বরাদ্দ হয়েছে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত অনেক চাষির কাছ থেকে কৌশলে জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে তা দিয়ে সিম তুলে বিকাশে টাকা আসার পর সেই টাকা থেকে বড় একটি অংশ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে কিছু জনপ্রতিনিধি ও মৎস্য কর্মকর্তার প্রতিনিধির বিরুদ্ধে।

তবে কোনো কোনো জনপ্রতিনিধি এ প্রণোদনার অর্থ বরাদ্দের একেবারের অবগত নন বলে জানিয়েছেন। তাদেরই একজন কালীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান শেখ নাজমুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার উপজেলায় যে মৎস্যচাষিদের জন্য প্রণোদনার বরাদ্দ এসেছে তা আমিই জানি না। পরে শুনলাম এখানে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে সিম তুলে চাষি নয় এমন লোকের নামে বরাদ্দ এসেছে। আবার যাকে খুশি তাকে সামান্য টাকা দিয়ে বিদায় করে দেওয়া হয়েছে। যার ফলে প্রকৃত মৎস্যচাষিরা বঞ্চিত হয়েছেন।’

প্রণোদনার অর্থ বণ্টনে স্থানীয় কোনো কোনো জনপ্রতিনিধি অনিয়ম করেছেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ভাইস চেয়ারম্যান নাজমুল বলেন, ‘হ্যাঁ, বেশকিছু স্থানীয় জনিপ্রতিনিধির জড়িত থাকার কথা সত্য।’

জানা গেছে, প্রণোদনার তালিকায় যাদের নাম দেওয়া হয় তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ৬০ টাকা ও জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে একটি করে মোবাইল সিম কিনে বিকাশ অ্যাকাউন্ট খুলে ইউনিয়নে নিয়োগকৃত মৎস্য অফিসের প্রতিনিধিরা রেখে দেন। অনুদানের টাকার মেসেজ এলে তাদের অধিকাংশকে মাত্র ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা দিয়ে বিদায় দেওয়া হয়। বাকি টাকা প্রতিনিধিরা আত্মসাৎ করেন। অধিকাংশ তালিকাভুক্ত মাছচাষি বা ঘেরমালিকরা জানেনও না যে তাদের বিকাশ অ্যাকাউন্টে কত টাকা এসেছিল। এভাবে এ চক্রটি উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে নিয়োগকৃত মৎস্য অফিসের প্রতিনিধির মাধ্যমে কোটি টাকার বাণিজ্য করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তালিকা তৈরির জন্য যারা মৎস্য অফিস থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন তারা হলেন ১নং কৃষ্ণনগরের আবু রায়হান, ২নং বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের আবদুর রহমান মোড়ল, ৩নং চাম্পাফুল ইউনিয়নের চান্দুলিয়া গ্রামের শহর আলীর ছেলে রজব আলী (তার নিজস্ব কোনো জমিজমা না থাকলেও বাবার নামে ১৮ হাজার এবং ভাইয়ের নামে ১৩ হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন), ৪নং দক্ষিণশ্রীপুর ইউনিয়নে এসএম আমিনুল ইসলাম, ৫নং কুশুলিয়া ইউনিয়নের জিএম মনিরুল ইসলাম, ৬নং নলতা ইউনিয়নে সামছুদ্দীন হক, ৭নং তারালী ইউনিয়নে বাসুদেব সরকার, ৮নং ভাড়াশিমলা ইউনিয়নে মোস্তাফিজুর রহমান, ৯নং মথুরেশপুর ইউনিয়নে গোলাম ফারুক, ১০নং ধলবাড়িয়া ইউনিয়নে মোস্তফা আলম, ১১নং রতনপুর ইউনিয়নে আবদুর রফিক গাজী এবং ১২নং মৌতলা ইউনিয়নে রায়হান। এসব প্রতিনিধি প্রকৃত মৎস্যজীবী ও ঘেরমালিকদের নাম প্রণোদনার তালিকায় না দিয়ে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে তালিকা তৈরি করে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ অনেক মাছচাষির।

গরিমহল ইউনিয়নের আবুল কাশেম বলেন, ‘আমার ঘের থাকা সত্ত্বেও আমি প্রণোদনা পাইনি। কিন্তু যাদের তিন একরের বেশি জমি এবং অনেকে রয়েছে ঘের নেই, তারা মেম্বার-চেয়ারম্যানের লোক বলে টাকা পেয়েছে। আবার অনেকে মৎস্য অফিসের প্রতিনিধিদের টাকা দিয়েছে বলে প্রণোদনা পেয়েছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তারালী ইউনিয়নের এক মাছচাষি বলেন, ‘অনেকে টাকা দিয়ে চুক্তি করেছে, তাই তারা প্রণোদনা পেয়েছে। প্রতিনিধিদের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে নতুন সিম তুলে বিকাশে টাকা নিয়েছে।’

বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের শাহ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কৃষ্ণনগরের ৩নং ওয়ার্ডে পারুলগাছা এলাকার ছাত্র আতাউর রহমান, যার কোনো ঘের নেই, কিন্তু তিনি প্রণোদনার টাকা পেয়েছেন। এছাড়া অসীম রায় টাকা পেয়েছেন ঘের না থাকা সত্ত্বেও। আর নলতা ইউনিয়নে ১৪ থেকে ১৫ জনের নামে ১৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ হলেও তাদের মাত্র ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে কালীগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার রবিউল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অভিযোগ পেয়েছি। জেলা থেকে তদন্ত হচ্ছে। তদন্ত কার্যক্রম শেষ হলে তারপর জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ বঞ্চিতদের ক্ষেত্রে তাহলে কী হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা সরকারি সিদ্ধান্তের ব্যাপার।’

প্রণোদনার অর্থ বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে কালীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাইদ মেহেদী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এগুলো সত্য নয়, ঘেরমালিকরা অসত্য তথ্য দিয়েছে। অনেকের ঘেরের পরিমাণ বেশি থাকায় দুস্থ মৎস্যচাষিরা বঞ্চিত হয়েছেন। এছাড়া মেম্বার-চেয়ারম্যানরা প্রণোদনা আত্মীয়দের দিয়েছেন। অর্থাৎ স্বজনপ্রীতি হয়েছে, দুর্নীতি হয়নি। এছাড়া কয়েকজন মেম্বার নিজের নামে নিয়েছেন। যদিও তাদের ঘের রয়েছে, তারপরও না নিলেও পারতেন।’

আর কৌশলে জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে তা দিয়ে সিম তুলে বিকাশে টাকা আসার পর সেখান থেকে বড় একটি অংশ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘না, এরকম একটা ঘটনা শুনছিলাম, কিন্তু তা সত্য নয়।’

অন্যদিকে উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসব অভিযোগ সত্য নয়। এরকম কিছু ঘটেনি। নিয়ম মেনেই সব করা হয়েছে।’ তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করলেও অভিযোগ তদন্তে যে সভা হয়েছে তা স্বীকার করেছেন এ মৎস্য কর্মকর্তা।

এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয় সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্পের ডেপুটি প্রজেক্ট ডিরেক্টর মনিষ মণ্ডলের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যদি কোনো অভিযোগ উঠে থাকে সে ক্ষেত্রে তদন্ত হবে।’ তদন্তে যদি অভিযোগের সত্যতা মেলে তাহলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্পের অধীনে ৭৫ উপজেলায় ৭৮ হাজার ৭৪ জনকে মোট ১০০ কোটি টাকার প্রণোদনা দেওয়ার কথা রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত