দেশে করোনার ঊর্ধ্বগতি কমাতে আবার আগের অবস্থায় যাচ্ছে সরকার। বিয়ে, সভা-সমাবেশ, ওয়াজ মাহফিলসহ যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠান বন্ধ করতে বা কমাতে ইতিমধ্যেই সব জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন ও ইউএনওদের চিঠি দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অ্যান্টিজেন টেস্ট বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গুটিয়ে ফেলা কভিড হাসপাতালগুলো আবার চালু হচ্ছে। জেলা হাসপাতালের কভিড বেডে আবার রোগী ভর্তি শুরু হয়েছে।
বিশেষ করে মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মানার ওপর বেশি জোর দিচ্ছে সরকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মতে, মানুষ স্বাস্থ্যবিধি না মানলে প্রয়োজনে আইন প্রয়োগ করা হবে। জোর করে হলেও স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য করা হবে। অবশ্য সর্বোচ্চ সংক্রমিত এলাকায় এখনো লকডাউনের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ঢাকার কভিড হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত থাকতে বললেও চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে আরও কিছুদিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে।
অন্যদিকে করোনার শনাক্ত হার ৫ শতাংশের ওপরে উঠে যাওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না খোলার পরামর্শ দিয়েছেন জাতীয় কারিগরি কমিটির এক সদস্য। শিগগির কমিটি সভা ডেকে এ সুপারিশ দেবে সরকারকে।
গত দুই সপ্তাহ ধরে দেশে দেড়গুণ হারে করোনার সংক্রমণ বাড়ছে। গত ১৯ জানুয়ারি দৈনিক শনাক্তের হার ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছিল, একপর্যায়ে তা ৩ শতাংশেরও নিচে নেমে আসে। কিন্তু মার্চের শুরু থেকেই সেই সংক্রমণ ফের বাড়তে থাকে। সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে পরীক্ষা অনুপাতে শনাক্তের হার ৭ দশমিক ১৫ শতাংশে উঠে গেছে।
করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধির এমন পরিস্থিতিকে ‘লক্ষণ ভালো নয়’ বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এর আগে গত সপ্তাহে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে এবং পরে আরেকটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। মাস্ক পরাসহ তিন দফা নির্দেশনাও দিয়েছেন তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকও গত সপ্তাহজুড়ে করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানার জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখনই কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি না মানলে সামনে বড় বিপদের শঙ্কার কথা বলেছেন। গতকাল রবিবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, এখন যারা আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের বেশিরভাগই তরুণ, আক্রান্তদের অনেককেই আইসিইউতে ভর্তি করা লাগছে।
এ সময় তিনি সবাইকে সতর্ক করে বলেন, গেল দুই মাস আমরা স্বস্তিতে ছিলাম, তাই এখন আমরা কোনো কিছু মানছি না। সামনের দিকে আমরা আরও বড় বিপদে পড়তে যাচ্ছি যদি আমরা স্বাস্থ্যবিধি না মানি।
শনাক্ত ৭ শতাংশের ওপরে : গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে গত ৭৪ দিন বা আড়াই মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ রোগী শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ১৫৯ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং শনাক্ত হার বেড়ে ৭ দশমিক ১৫ শতাংশে উঠেছে। শনাক্তের এ হার গত ৬৩ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে গত ১০ জানুয়ারি এর চেয়ে বেশি ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ হারে ১ হাজার ৭১ রোগী শনাক্ত হয়েছিল। গত ফেব্রুয়ারিজুড়ে গড়ে ২ দশমিক ৮২ শতাংশ হারে রোগী শনাক্ত হলেও চলতি মাসের প্রথম দিন থেকেই নতুন করে সংক্রমণে ঊর্ধ্বগতি শুরু হয়। ওইদিন হঠাৎ করে রোগী শনাক্ত হার ৪ শতাংশের ওপরে উঠে। তারপর থেকে গত দুই সপ্তাহ ধরে ক্রমান্বয়ে দেড়গুণ হারে শনাক্ত বাড়ছে। এছাড়া দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দৈনিক রোগী শনাক্তের সংখ্যাও তিন-চারশো থেকে বেড়ে ১ হাজার ১০০ ছাড়াল।
এদিকে করোনা রোগী শনাক্ত বাড়ার পাশাপাশি মৃত্যুও বাড়ছে। সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৮ জন করোনা রোগী মারা গেছেন, যা গত ৪৯ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে গত ২৪ জানুয়ারি এর চেয়ে বেশি ২০ রোগীর মৃত্যু হয়েছিল।
লক্ষণ ভালো নয় : সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতিতে দেশে করোনা পরিস্থিতির ‘লক্ষণ’ ভালো নয় বলে মনে করছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, লক্ষণ ভালো নয়। গত দুই সপ্তাহ ধরে দেড়গুণ হারে সংক্রমণ বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবাইকে পরিপূর্ণ সচেতন হওয়া দরকার। সচেতন হলে যে ফল পাওয়া যায়, সেটা নভেম্বরে আমরা দেখেছি। শীতকালের আগে যেভাবে বিয়ে, জনসমাগম হচ্ছিল, তখন বেড়ে গিয়েছিল। পরে শীতকালে দ্বিতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কায় ম্যাজিস্ট্রেট নামল, সবাই স্বাস্থ্যবিধি মানল, সরকারি অফিস-আদালতে কড়াকড়ি আরোপ করা হলো। ফলে নভেম্বরে শনাক্ত ওপরে উঠেও আবার নামানো গেছে। কাজেই চেষ্টা করলে যে পারা যায় সেটা আমরা নভেম্বরে দেখিয়েছি।
বর্তমানে সর্বোচ্চ সচেতন থাকার সময় এসে গেছেউল্লেখ করে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, সমস্ত রোগীকে শনাক্ত করে আইসোলেশনে নেওয়া, চিকিৎসা দেওয়া, তাদের সংস্পর্শে আসা লোকজনদের কোয়ারেন্টাইন করাএসব কড়াকড়িভাবে মানতে হবে। পাশাপাশি টিকাও দিতে হবে।
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আগের ব্যবস্থা : গত দুই সপ্তাহ ধরে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে আহ্বান জানানো হচ্ছে। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না। কিছুতেই মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানানো যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে সরকার বাধ্য হয়ে আগের উদ্যোগগুলো নতুন করে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এ ব্যাপারে গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন করে কোনো উদ্যোগ নেওয়ার দরকার নেই। পুরনোগুলোই নতুন করে বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নিচ্ছি।
এ কর্মকর্তা জানান, হাসপাতাল পরিচালক, জেলা প্রশাসন, ইউএনও, সিভিল সার্জনসবাইকে নতুন করে চিঠি দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গতকাল সারা দেশের সিভিল সার্জনদের সঙ্গে মিটিং করেছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তাদের বলা হয়েছে, নিজ নিজ এলাকায় বিয়ে, সভা-সমাবেশ, ওয়াজ মাহফিলসহ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান কমিয়ে দেওয়ার জন্য বা বন্ধ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মহাপরিচালক বলেন, লোকজন পরীক্ষা করতে চায় না। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি পরীক্ষা বাড়ানোর। অ্যান্টিজেন টেস্ট বাড়ানোর জন্য সবাইকে চিঠি দেওয়া হবে। সংক্রমণ কমে আসায় সরকারি হাসপাতালে কভিড ইউনিটের যেসব বেড সংকোচন করা হয়েছিল, সেগুলো আবার চালু করতে বলা হয়েছে। কিছু কভিড হাসপাতাল সাময়িক বন্ধ করা হয়েছিল, সেগুলো আবার চালু করার জন্য বলা হয়েছে। ঢাকায় এখনো যেসব হাসপাতাল আছে, সেখানে কভিড রোগীর চিকিৎসার সক্ষমতা আছে। এর মধ্যে রাজধানীতে মহানগর জেনারেল হাসপাতাল, মিরপুরের লালকুঠি হাসপাতালসহ কিছু কভিড হাসপাতাল সাময়িক গুটিয়ে নেওয়া হয়েছিল। প্রয়োজন হলে সেগুলো পুনরায় চালু করা হবে। তবে ঢাকার বাইরে জেলা হাসপাতালগুলোতে বেড সংকোচন করা হয়েছিল, সেগুলো আবার চালু করা হয়েছে। মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানতে চাইছে না। প্রয়োজনে আইন প্রয়োগ করে মানতে বাধ্য করা হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা ঠিক হবে না : করোনার সংক্রমণ ৫ শতাংশের ওপরে উঠে যাওয়ায় এখন দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা ঠিক হবে না বলে মনে করেন করোনা মোকাবিলায় গঠিত সরকারের জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি গত শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্কুল-কলেজ খোলার ব্যাপারে জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির কোনো মিটিং হয়নি। শিগগির আমরা মিটিং করব। সেখানে যে সিদ্ধান্ত হবে, তা সুপারিশ আকারে সরকারকে পাঠাবে। তবে এখন স্কুল-কলেজ খোলা ঠিক হবে না। কারণ শনাক্ত হার ৫ শতাংশের নিচে না থাকলে স্কুল-কলেজ খোলার ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিষেধ করেছে। আমাদের দেশে ৫ শতাংশের নিচে গিয়েছিল। তখন স্কুল-কলেজ খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। এখন তো ৭ শতাংশের ওপরে চলে গেছে। তাই আগের সিদ্ধান্ত বলবৎ থাকার কথা নয়। কারণ বাচ্চারা সংক্রমিত হয়ে যাবে।
এ বিশেষজ্ঞ বলেন, লকডাউনের চিন্তা করে লাভ নেই। বাংলাদেশে লকডাউন হয় না। রাজাবাজার ও ওয়ারীতে লকডাউন দেওয়া হয়েছিল। ঠিকমতো হয়নি। তবে এবার সংক্রমণ গত বছরের মতো হবে না বলে মনে করেন তিনি। বললেন, ইতিমধ্যেই অনেকের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। সেটার ফল আমরা পাব। এবার সর্বোচ্চ ১০ শতাংশে উঠবে, এর বেশি উঠবে না। তবে সবাইকে মাস্ক পরতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মানতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
দ্বিতীয় ঢেউ বুঝতে আরও দুই সপ্তাহ : বর্তমানে সংক্রমণের যে ঊর্ধ্বগতি সেটা করোনার দ্বিতীয় ঢেউ কি না, তা চার সপ্তাহ গেলে বোঝা যাবে বলে মনে করেন ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, কেবল দুই সপ্তাহ গেল। প্রত্যেক সপ্তাহে যদি আগের সপ্তাহের তুলনায় শনাক্ত দেড়গুণ হারে বাড়ে এবং সেটা যদি টানা চার সপ্তাহ হতে থাকে, তাহলে সেটাকে দ্বিতীয় ঢেউ বলা যাবে। শনাক্তের হার ৫ শতাংশের নিচে থেকে বেড়ে বর্তমানে ৭ দশমিক ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত দুই সপ্তাহ ধরে দেড়গুণ হারে বাড়ছে। ফলে নতুন করে করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি রোগটির দ্বিতীয় ঢেউ কি না তা নিশ্চিত হতে আরও দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে।
