ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ইয়াহিয়ার সামরিক প্রস্তুতি শুরু

আপডেট : ২১ মার্চ ২০২১, ১২:৪২ এএম

মুক্তিপাগল হাজার হাজার মানুষের দৃপ্ত পদচারণায় অগ্নিগর্ভ রাজধানী ঢাকা। পথে, অলি-গলিতে সর্বস্তরের মানুষের মিছিল। উড়ছে কালো পতাকা। বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, ব্যবসাকেন্দ্র। মিছিল যাচ্ছে, মিছিল আসছে। সব মিছিলেরই গন্তব্য কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর। শত ব্যস্ততার মাঝেও ধানমন্ডির সেই বাড়িটার বারান্দায় বারবার আসছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রতি মিছিলের উদ্দেশেই রাখছেন সংক্ষিপ্ত বক্তব্য। দৃপ্ত কণ্ঠে তার ঘোষণা ‘আর কোনো আপস নয়। চরম ত্যাগের জন্য আপনারা প্রস্তুত থাকুন। সাত কোটি মানুষের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে।’

আজ ২১ মার্চ। একাত্তরের এই দিনে প্রেসিডেন্ট হাউজে ইয়াহিয়ার সঙ্গে প্রায় ৯০ মিনিট বৈঠক করেন বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন আহমদ। কিন্তু সংকটের কোনো সমাধান হলো না। উদ্বিগ্ন মুজিব-তাজউদ্দীন বেরিয়ে এলেন প্রেসিডেন্ট হাউজ থেকে।

একদিকে যখন ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠক চলছে, আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সংকট নিরসনের; বাইরে তখন অমীমাংসিত বৈঠক আরও উত্তেজিত করে তুলছে সংগ্রামী বাঙালিকে। বাড়ছে বাঙালির সভা, বড় হচ্ছে মিছিল। অন্যদিকে, জেনারেল ইয়াহিয়া তার সামরিক উপদেষ্টাদের নিয়ে সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে। প্রতিদিনই পাকিস্তান এয়ারলাইনসের ছয় থেকে সতেরটি বোয়িং ৭০৭ বিমান সৈন্য ও রসদ নিয়ে ঢাকায় আসছে। সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র বোঝাই হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরেও ভিড়ছে কয়েকটি জাহাজ। বাড়ানো হচ্ছে পাকিস্তান স্থল ও নৌবাহিনীর শক্তি।

১২ উপদেষ্টা নিয়ে আজ কঠোর সামরিক প্রহরায় করাচি থেকে ঢাকা এলেন পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো। সেনা মোতায়েন করা হয় ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দরে। সেখানে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয় সাংবাদিকদের। ভুট্টোকে বিমানবন্দর থেকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে নিয়ে আসার সময় রাস্তার দু’পাশে ভুট্টোবিরোধী স্লোগান দেয় সাধারণ মানুষ।

সন্ধ্যায় কড়া সেনা প্রহরায় প্রেসিডেন্ট ভবনে যান ভুট্টো। সেখানে দু’ঘণ্টারও বেশি সময় রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে। বৈঠক শেষে হোটেলে ফিরেই উপদেষ্টাদের নিয়ে আবারও বৈঠক করেন ভুট্টো। এর আগে হোটেল লাউঞ্জে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের ভুট্টো বলেন, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।

বিকেলে ন্যাপপ্রধান মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী চট্টগ্রামের পোলো গ্রাউন্ডে এক বিশাল জনসভায় বলেন, আলোচনায় ফল হবে না। এদেশের হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি থেকে চাপরাশি পর্যন্ত যখন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে মানে না, তখন শাসনক্ষমতা শেখ মুজিবের হাতে দেওয়া উচিত।

মগবাজারে এক নারী সমাবেশে সেনাবাহিনীর সাবেক বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে একটি প্যারা মিলিটারি গঠনের আহ্বান জানানো হয়। নারায়ণগঞ্জের নারীরা নৌমিছিল বের করেন। সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিক্ষুব্ধ লেখক-শিল্পীরা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।

ঢাকায় স্বাধীন বাংলাদেশ শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদ আগামী ২৩ মার্চ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানি পণ্য বর্জন সপ্তাহ পালনের কর্মসূচি নেয়। গাজীপুরে জারিকৃত কারফিউ দুপুর ১২টায় ছয় ঘণ্টার জন্য প্রত্যাহার করা হয়। পরে সন্ধ্যা ৬টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য আবারও কারফিউ বলবৎ করা হয়। অন্যদিকে ব্রিটিশ সরকার বাংলাদেশে যাতায়াতের জন্য পাকিস্তানি বিমান ও জাহাজকে মালদ্বীপের ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত