২৫ বছর আগেও এমন হয়েছিল। বড়রা যে খেলার মাঠে বোমা সাজিয়ে রাখতে পারে বুঝতে না পেরে বেঘোরে প্রাণ দিয়েছিল এক শিশু। সেবার গানের দোহাই দিয়ে বোমা আর ভোট এড়িয়ে যেতে বলেছিলেন কবীর সুমন।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে তারপরও নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচন হতেই হয়। আর নির্বাচন এলে সন্ত্রাসও যেন একটু বেশি মাত্রায় হতে হয়। এবারের বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে সন্ত্রাস আগের চেয়ে বেশি না কম হচ্ছে সেই বিতর্ক পরিসংখ্যান দিয়েও থামানো যাবে না। দলাদলির রাজনীতি তো এমনই!
সোমবার বর্ধমানের রসিকপুরের এক মাঠে খেলতে যাওয়া শিশু দু'টি যে এমন সন্ত্রাসনির্ভর দলাদলির রাজনীতির শিকার তাতে কোনো সন্দেহ নেই। শেখ ইব্রাহিম আর শেখ আফরোজের ভুল- তারা হাঁড়িতে রাখা গোল বস্তুটিকে বল ভেবেছে এবং বলসদৃশ বস্তুটি নিয়ে বিপুল উৎসাহে খেলতে গেছে। যা হবার তা-ই হয়েছে তারপর। মুহূর্তেই বিকট শব্দে কেঁপে উঠেছে গোটা এলাকা। বড়রা ছুটে গিয়ে দেখেন মাটিতে তড়পাচ্ছে রক্তাক্ত দুই মানবশিশু। তাদের একজন এখনো মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে, অন্যজন চলে গেছে এই পৃথিবী ছেড়ে।
ঘটনাটি নির্বাচনের ডামাডোলে খুব বড় খবর হতে পারেনি। বড় বড় খবরের ভিড়ে একদিনেই অনেক পেছনে চলে গেছে একটি শিশুর চিরতরে স্তব্ধ হওয়া, অন্যজনের বেঁচে থাকার লড়াই আর তাদের মা-বাবার সান্ত্বনার অযোগ্য দুঃখের কথা।
২৫ বছর আগেও ক্রিকেট বল ভেবে বোমা নিয়ে খেলতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছিল এক শিশু। স্টেটসম্যান পত্রিকায় খবরটি পড়ে শিল্পী কবীর সুমনের সংবেদনশীল মন খুব ধাক্কা খেয়েছিল। ঝটপট বসে পড়েছিলেন কাগজ-কলম আর গিটার নিয়ে। তারপর? চমৎকার একটি গান উপহার দিয়েছিলেন কবীর সুমন।
‘হাউ’জ দ্যাট’ শিরোনামের গানটির প্রথম দু লাইনে ছিল ভোটের নামে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতে শিশুদের জন্য পৃথিবীটাকে নরক বানিয়ে ফেলায় বড়দের প্রতি তীব্র কটাক্ষ। সুমন লিখেছিলেন, ‘‘বাহবা সাবাস বড়দের দল এই তো চাই /ছোটরা খেলবে আসুন আমরা বোমা বানাই।’’
শিশুর এমন মৃত্যুতে কবীর সুমন তো বটেই, এমনকি তার ভাষায় ক্রিকেট ব্যাটও সেদিন ভীষণ কষ্ট পেয়েছিল। তাই তিনি লিখেছিলেন,
‘‘...ভোটের সকালে লজ্জিত শুধু ক্রিকেট ব্যাট! ।।
দেখুন বড়রা, কাঠও কতটা লজ্জা পান…
লজ্জা কিসের বোমাতন্ত্রটা চালিয়ে যান।’’
আফরোজ আর ইব্রাহিমের পরিণতি বুঝিয়ে দিলো পশ্চিমবঙ্গে বোমাতন্ত্র এখনো দেদার চলছে।
সুমনের গানের গুরুত্ব এ সমাজে খুব কম বলে ২৫ বছর আগে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া অমিত নিশ্চয়ই আজ দেখছেন আবার ভোট এসেছে পশ্চিমবঙ্গে, আবার তার সেই বন্ধুটির মতো আরেক শিশুও মৃত্যুকে বরণ করেছে বোমাকে বল ভেবে খেলতে গিয়ে। অমিত হয়ত বারবার শুনছেন ‘হাউ’জ দ্যাট’-এর শেষে তাকে নিয়ে লেখা চারটি অনবদ্য লাইন,
‘‘দেড় বছরের অমিতের আছে ভাগ্য জোর
বেঁচে গেলি তুই, সামলে রাখিস জীবন তোর,
বড় হোস তুই যখন যেখানে যেমন চাস
গানের দোহাই বোমা আর ভোট এড়িয়ে যাস।।’’
সেদিনের দেড় বছরের শিশু অমিত এখন ছাব্বিশ পেরোনো তরুণ। বড় হয়েছেন বেশ। হয়ত নিজের প্রাণের মায়া আছে বলেই অমিত বোমা আর ভোট এড়িয়ে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টাও করছেন।
তবে কবীর সুমন ভোট এড়াতে পারছেন না।
তিনি একটি দলের জন্য ভোট চাচ্ছেন আর ২৫ বছর আগে নিজের লেখা গানটির কথা ভেবে হয়ত গোপনে লজ্জা পাচ্ছেন।
(জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে’য় সংবাদ ভাষ্যটি লেখেন আশীষ চক্রবর্ত্তী)
