রাজধানীর দক্ষিণখানে আব্দুর রশীদ (৩৫) নামে এক ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তাকে এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে পরিচিত আমিনুল ইসলাম হান্নান ওরফে জাপানি হান্নান নিজের শর্টগান দিয়ে লোকজনের সামনেই গুলি করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। এমনকি ঘটনার সময় কয়েকজন পুলিশ সদস্যও ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বলে তথ্য মিলেছে।
গতকাল বুধবার সকালে দক্ষিণখানের আইনুশবাগ চাঁদনগর এলাকায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ লোকজন জাপানি হান্নানের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও বাসায় হামলা চালায়।
এদিকে রশীদ হত্যার পর এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ ও র্যাব সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
রশীদ হত্যাকান্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে হান্নানসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার অন্যদের মধ্যে রয়েছে হান্নানের ছেলে ইকরামুল ইসলাম জয় (২৬), তার ভাই শফিকুল ইসলাম ইমরান (৪১), তার চাচাতো ভাই আল আমিন প্রবীণ (৩৫), জুয়েল ইসলাম রিপন (৪১) ও খোরশেদ আলম (৫০)।
জানা গেছে, গ্রেপ্তার জাপানি হান্নান বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। তিনি বাংলাদেশ-জাপান মানবাধিকার সংস্থা নামে একটি সংগঠনের মহাসচিব। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুর পর অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচনের সময় তিনি ৪৮ নম্বর ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করেছিলেন।
স্থানীয়রা দেশ রূপান্তরকে জানান, হান্নানের দাবি করা চাঁদার টাকা না দিয়ে আব্দুর রশীদের এক আত্মীয় বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করে। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। তা ছাড়া এলাকার ময়লার টাকা ওঠানো ও রাস্তা নির্মাণ করা নিয়ে হান্নানের সঙ্গে আওয়ামী লীগের একটি গ্রুপের বিরোধ ছিল। এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন হান্নান। আর তাকে সব ধরনের সহায়তা করতেন দক্ষিণখান ইউনিয়নের সাবেক এক চেয়ারম্যানসহ থানা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা।
দক্ষিণখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শিকদার মোহাম্মদ শামীম দেশ রূপান্তরকে জানান, বেলা সাড়ে ১১টায় দুই পক্ষের মধ্যে গুলির ঘটনা ঘটে। জাপানি হান্নান নামে এক ব্যক্তির গুলিতে রশীদ নামে একজন মারা গেছেন বলে জানতে পেরেছি। হান্নানসহ সাতজনকে আটক করা হয়েছে। হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত দুটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তারপরও অতিরিক্ত পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন করা হয়েছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘চাঁদনগর কলেজ রোডে হান্নানের ‘জাপানি কটেজ’ নামে ৬তলা একটি বাড়ি রয়েছে। সেখানেই বসবাস করেন তিনি। বাড়ির রাস্তার বিপরীত পাশে আব্দুর রশীদের চাচাতো ভাই সুজনের মামাশ^শুর মো. বেলালের জমি রয়েছে। সেখানে বাড়ি করার জন্য গত মঙ্গলবার ট্রাকে করে বালি ফেলা হয়। হান্নান ওই বাড়ি করার আগে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। এই টাকা না দেওয়ায় রাতের আঁধারে হান্নানের লোকজন ওই বালি সরিয়ে ফেলে। তা ছাড়া হান্নানের বাড়ির সামনে দিয়ে একটি রাস্তা নির্মাণ করা হয়। ওই রাস্তাটি কিছুদিন আগে স্থানীয় সাংসদ উদ্বোধন করেন। এ নিয়েও হান্নানের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়। তা ছাড়া এলাকার বাসা-বাড়ি থেকে ময়লা ওঠানোর টাকা নিয়ে বিরোধ হয়। এসব নিয়ে গতকাল সকাল ৯টার দিকে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশও আসে ঘটনাস্থলে। এরপর বিমানবন্দর থানা ছাত্রলীগের সহসভাপতি সোহেল রেজা ও আব্দুর রশীদ বেলা ১১টার দিকে হান্নানের বাড়ির সামনে যান বিষয়টির সমাধান করতে। এ সময় সোহেল হান্নানকে ডাক দিলে বাসার নিচে থাকা হান্নান ফটকের ভেতর থেকে শর্টগান দিয়ে গুলি ছোড়েন। সোহেল দ্রুত পালাতে সক্ষম হলেও আব্দুর রশীদ গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। এ সময় স্থানীয়রা হান্নানের বাড়ির সামনে থাকা জিপে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং তার বাড়িতে হামলা চালায়।
ছাত্রলীগ নেতা সোহেল রেজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সকালে হান্নানের লোকজন আমার লোকদের মারপিট করে। খবর পেয়ে আমি দ্রুত ঘটনাস্থলে আসি। এ সময় পুলিশও উপস্থিত ছিল। আমার লোকদের কেন মারা হয়েছে? এ বিষয়ে কথা বলতে হান্নানের বাড়ির সামনে গিয়ে ডাক দিই। তখন আমার সঙ্গে আব্দুর রশীদ ছিল। আমার ডাক শুনে হান্নান বাসার ভেতর থেকে কোনো কিছু না বলেই গুলি ছোড়ে। আমি দৌড়ে দূরে সরে যাই কিন্তু আব্দুর রশীদ গুলিবিদ্ধ হয়।
ডিএমপির উত্তরা বিভাগের দক্ষিণখান জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) বিপ্লব গোস্বামী বলেন, ঘটনার পর উত্তেজিত জনতা হান্নানের গাড়ি ও বাড়িতে ভাঙচুর করে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রশীদ ও হান্নানের মধ্যে পূর্বশত্রুতা ছিল। সর্বশেষ বালু রাখাকে কেন্দ্র করে চাঁদা দাবি করেন হান্নান। চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় তাকে হান্নান শটগান দিয়ে তিন রাউন্ড গুলি করে হত্যা করে। এর আগে জাপানি হান্নান নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ফেইসবুক লাইভে এসে উত্তেজিত জনতার হামলা থেকে বাঁচতে পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের কাছে সহযোগিতা চান। ফেইসবুক লাইভে তিনি অভিযোগ করেন, ‘প্রতিপক্ষরা ক্ষতিসাধন করার জন্য তার বাড়ি ও গাড়িতে হামলা করেছে।’
ঘটনার পর সরেজমিনে জানা গেছে, দক্ষিণখান থানাধীন আশকোনায় ময়লার ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বেশ কিছুদিন ধরেই স্থানীয় দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছিল। এক পক্ষে ছিলেন সোহেল ও অন্য পক্ষে হান্নান। আব্দুর রশীদ সোহেলের আত্মীয়। এই বিরোধের মধ্যেই বালু ফেলায় চাঁদা দাবি করেন হান্নান। এর জের ধরেই গতকাল সকালে হান্নান ও সোহেল সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে।
নাম প্রকাশ না করে একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা দেশ রূপান্তরকে বলেন, হান্নান এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। এলাকায় রাস্তার নির্মাণকাজ উদ্বোধন, মসজিদে ওয়াজ মাহফিল করতে গেলেও হান্নানকে আমন্ত্রণ না করলে আয়োজকদের হত্যার হুমকি দিতেন। তাকে চাঁদা না দিয়ে কোনো নির্মাণকাজই করা যায় না ওই এলাকায়। কেউ বাড়ি নির্মাণ করতে গেলে এক থেকে দশ লাখ টাকা হান্নানকে চাঁদা দিতে হতো। এর আগেও বেশ কয়েকবার চাঁদা না পেয়ে প্রকাশ্যে গুলির ভয় দেখিয়েছে। হান্নানের ৬তলা বাড়ির নিচতলা ও ষষ্ঠ তলায় রয়েছে টর্চার সেল। তার বিরুদ্ধে থানায় অসংখ্য মামলা ও জিডি করেছে ভুক্তভোগীরা। ভুক্তভোগীদের একজন হান্ননের প্রতিবেশী মোজাম্মেল পাটোয়ারী। গতকাল দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, আমার কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা চেয়েছিল হান্নান। না দেওয়ায় আমার বাসার ভাড়াটিয়াদের বের করে দিয়েছে। আমাকে হান্নানের বাসার টর্চার সেলে নিয়ে মারপিট করেছে। এ বিষয়ে আমি থানায় জিডি ও মামলা করেছি, র্যাবের কাছে অভিযোগ করেছি কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। আব্দুর রশীদের মালিকানাধীন হাজি কোমর উদ্দিন টাওয়ারের ব্যবস্থাপক মো. সিদ্দিক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আব্দুর রশীদের বাবা আব্দুল মালেক বেশ কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। আব্দুর রশীদের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। পরিবার নিয়ে আশকোনা পানির পাম্পের পাশে থাকেন। হান্নানের বাসার পাশে তার অন্তত ৫০টি ঘর রয়েছে। সেগুলো ভাড়া দেওয়া আছে। মাঝেমধ্যে এই ঘর দেখতে আসতেন আব্দুর রশীদ। তিনি অভিযোগ করেন, হান্নান বিভিন্ন সময় ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করত। হুমকি-ধমকি দিত। নাম প্রকাশ না করে এক নারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, হান্নান আমার খালি জমিতে ময়লা ফেলেছে। এখন বলছে ভরাট করেছি, এক লাখ টাকা দিতে হবে।
