ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক আজ আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেন, ‘আমরা দুই দেশ একবিংশ শতকের গুরত্বপূর্ণ সময়কালে নিজেদের লক্ষ্যপূরণ করব। ভারত ও বাংলাদেশ উন্নতি ও বন্ধুত্বের পথে বিশ্বকে পথপ্রদর্শন করতে থাকবে। আজ দুই দেশের স্বাভাবিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়েছে। উভয় দেশই নিজেদের বিকাশ, নিজেদের প্রগতির চেয়ে সমগ্র বিশ্বের উন্নতি দেখতে চায়।’ উভয় দেশই পৃথিবীতে অস্থিরতা, সন্ত্রাস এবং অশান্তির পরিবর্তে স্থিতিশীলতা, বন্ধুত্ব এবং শান্তি চায়।
গতকাল শনিবার গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার ওড়াকান্দি ঠাকুরবাড়িতে মতুয়া নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে নরেন্দ্র মোদি এসব কথা বলেন। এদিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে টুঙ্গিপাড়া থেকে হেলিকপ্টারযোগে ওড়াকান্দি ঠাকুরবাড়ি পৌঁছান মোদি।
প্রায় ৩২ মিনিটের বক্তব্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ভারত ও বাংলাদেশ আত্মিক সম্পর্কের তীর্থক্ষেত্র। আমাদের সম্পর্ক মানুষের সঙ্গে মানুষের, মনের সঙ্গে মনের। আমি আজ এখানে এসে তেমনটাই অনুভব করছি। ভারতে থাকা মতুয়া সম্প্রদায়ের হাজার হাজার লাখ লাখ ভাই-বোনেরা ওড়াকান্দি এসে যেমন অনুভব করেন। আমি ঠিক আজ তেমনটাই অনুভব করছি। আমি আজ এখানে এসেছি সে কারণে আমি তাদের পক্ষ থেকেও এই পুণ্যভূমির চরণ স্পর্শ করেছি।’
নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘এই দিনের এই পবিত্র মুহূর্তের প্রতীক্ষা আমার বহু দিনের, বহু বছর ধরে ছিল। ২০১৫ সালে আমি যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবার বাংলাদেশে আসি তখনই আমি এখানে আসার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলাম। আমার সেই প্রত্যাশা, সেই কামনা আজ পূর্ণ হলো।’ তিনি বলেন, ‘আমি নিয়মিতভাবে শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের অনুগামীদের থেকে ভালোবাসা ও স্নেহ পেয়েছি। তার পরিবারের সদস্যদের ঘনিষ্ঠতা পেয়েছি। আজ আমি ঠাকুরবাড়ির এই দর্শন লাভের জন্য হরিচাঁদ ঠাকুরের আশীর্বাদের প্রভাব রয়েছে বলেই মনে করি।’
মোদি বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের ঠাকুরনগরে আমি যখন গিয়েছিলাম সেখানে আমার মতুয়া ভাই-বোনেরা আমাকে নিজেদের পরিবারের সদস্যদের মতো ভালোবেসেছেন। বিশেষ করে বড় মার স্নেহ, মায়ের মতো আশীর্বাদ সেটি আমার জীবনের জন্য এক অমূল্য সময় ছিল। পশ্চিমবঙ্গের ঠাকুরনগর থেকে বাংলাদেশের ঠাকুরবাড়ি পর্যন্ত একই রকমের শ্রদ্ধা রয়েছে। একই রকমের আস্থা রয়েছে। আর একই রকমের অনুভূতি রয়েছে।’
নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘আমি বাংলাদেশের জাতীয় অনুষ্ঠানে ভারতের ১৩০ কোটি ভাই-বোনের পক্ষ থেকে আপনাদের জন্য শুভেচ্ছা নিয়ে এসেছি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্ণ হওয়ায় আপনাদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। এখানে আসার আগে আমি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি সৌধে গিয়েছিলাম। সেখানে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেছি। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব উনার ভিশন আর বাংলাদেশের লোকেদের ওপর উনার বিশ্বাস এক উদাহরণ স্বরূপ।’
হরিচাঁদ ঠাকুর সম্পর্কে মোদি বলেন, আমরা মানবতার যেই ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি, সেই মূল্যবোধের জন্য শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর সংগ্রাম করেছেন, নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। নির্যাতিত, নিপীড়িত, দলিত, অবহেলিত সমাজ যা কিছু পেয়েছে তা শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের মতো কল্পবৃক্ষেরই ফল।’
এ সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান, খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, ভারতের বনগাঁয়ের এমপি সান্তনু ঠাকুরসহ ঠাকুর পরিবারের সদস্য ও মতুয়া নেতারা।
এদিন দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে টুঙ্গিপাড়া থেকে হেলিকপ্টারযোগে ওড়াকান্দি ঠাকুরবাড়ি পৌঁছান নরেন্দ্র মোদি। দুপুর ১২টা ৩৯ মিনিটে হরিচাঁদ ও গুরুচাঁদ ঠাকুরের মন্দিরে পূজা-অর্চনা করেন তিনি। পরে ঠাকুর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মতবিনিময় করেন। দুপুর ১টা ৫৫ মিনিটে ওড়াকান্দি থেকে হেলিকপ্টারে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন তিনি।
এরআগে, সকাল ১১টা ৩৯ মিনিটে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি সৌধের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী। পরে তিনি বঙ্গবন্ধুর আত্মার শান্তি কামনা করে প্রার্থনা করেন এবং বঙ্গবন্ধু ভবনের পাশে একটি বকুল ফলের চারা রোপণ করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নরেন্দ্র মোদিকে সঙ্গে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সমাধি সৌধ কমপ্লেক্সের বিভিন্ন স্থাপনা ঘুরিয়ে দেখান। বঙ্গবন্ধুর সমাধি সৌধ পরিদর্শনের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী পরিদর্শন বইতে মন্তব্য লিখে স্বাক্ষর করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর ছোট বোন শেখ রেহানাসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তার আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেদ্র মোদিকে অভ্যর্থনা জানাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল ১০টা ১০ মিনিটে টুঙ্গিপাড়া বঙ্গবন্ধু সমাধি সৌধ কমপ্লেক্সে পৌঁছান। দুপুর ১টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টুঙ্গিপাড়া থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।
সাতক্ষীরার ঐতিহাসিক যশোরেশ্বরী কালীমাতা মন্দিরে মোদি : সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ঐতিহাসিক যশোরেশ্বরী কালীমাতা মন্দিরে পূজা-অর্চনা করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গতকাল সকাল ৯টা ৫৮ মিনিটে হেলিকপ্টারযোগে ঈশ্বরীপুরে পৌঁছান মোদি। এ সময় তার পরনে ছিল খদ্দরের পাঞ্জাবি, সাদা পাজামা ও গলায় উত্তরীয়। মন্দির প্রাঙ্গণে ঢাক-ঢোল, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনি দিয়ে সম্পূর্ণ সনাতনী রীতিতে স্বাগত জানানো হয় ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে লালপাড়ের সাদা শাড়ি পরে স্থানীয় তরুণীরা নরেন্দ্র মোদিকে অভ্যর্থনা জানান। এরপর তিনি যশোরেশ্বরী কালীমাতা মন্দিরে প্রবেশ করেন এবং কালীমাতার মাথায় মুকুট পরান। সতিদেবীকে বিভিন্ন বস্ত্রসহ নানা ধরনের সাজশয্যায় সুসজ্জিত করেন। এরপর একে একে দেবীর গলায় জবা ফুলের মালা পরিয়ে আরাধনা শুরু করেন। প্রার্থনায় অংশ নিয়ে তিনি দেবী সতির প্রতি শ্রদ্ধা ভক্তি ভালোবাসার প্রকাশ ঘটান। দেবীর পদতলে মাথানত শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শেষে মন্দিরের চারধার প্রদক্ষিণ করেন। এরপর মন্দিরের পুরোহিত দিলীপ মুখার্জী ২০ মিনিট ৫৬ সেকেন্ডের প্রার্থনাপর্ব পরিচালনা করেন।
গত শুক্রবার বাংলাদেশের ৫০তম স্বাধীনতা দিবসের দিন সকালে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বিশেষ ফ্লাইটে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান। দুই দিনের সফর শেষে গতকাল রাতে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন।
(প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন গোপালগঞ্জ ও সাতক্ষীরা প্রতিনিধি)
