প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বছর আগস্ট মাসেই চাল আমদানিতে নেমে পড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। খাদ্য মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে নামে পাঁচ মাস পর। এ সময়ের মধ্যে চালের দাম বেড়ে গেছে। সরকারের মজুদও কমছে দিন দিন। আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকার আমদানিতে সুবিধা করতে পারছে না। এ অবস্থায় সরকার ভরসা করছে ঝুঁকিপূর্ণ বোরোর ওপর।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বোরোর ওপর ভরসা রাখা কঠিন। কারণ গোলায় তোলার আগমুর্হূতেও এ ধান তলিয়ে যেতে পারে হাওরের আগাম বন্যায়। হাওরে ধান নষ্ট হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে চালের দামের ওপর। সেই ঝুঁকিপূর্ণ ধানেই ভরসা রাখতে হচ্ছে সরকারকে।
বোরোর ওপর ভরসা না রেখে উপায়ও নেই সরকারের সামনে। কারণ অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে চাল সংগ্রহে ব্যর্থ হয়ে খাদ্য অধিদপ্তর হাত বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে। নিজেরা চাল সংগ্রহের আগেই বেসরকারি খাতের আমদানি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বেড়ে যায়। আর সে কারণেই চুক্তিবদ্ধ সরবরাহকারীরা সরকারের গুদামে চাল সরবরাহ করতে পারছেন না। পর্যাপ্তসংখ্যক দরদাতার অভাবসহ নানা কারণে তিনটি দরপত্র বাতিল করে দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। এ অবস্থায় দ্রুত কমছে সরকারি চালের মজুদ। গত ১৮ মার্চ চালের মজুদ ছিল ৪ লাখ ৭৭ হাজার টন। গত বছর এ সময় যা ছিল ১৪ লাখ টনের বেশি। সরকারি হিসাবেই খুচরা বাজারে মোটা সিদ্ধ চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৮ টাকা দরে। আর সরু চালের দাম ৭০ টাকা। বোরো ধান ওঠার আগে চালের দাম কমার সম্ভাবনা দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা।
খাদ্য সচিব ড. নাজমানারা খানুম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চাল আমদানির চেষ্টা করছি। আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং জাহাজ না থাকার কারণে চাল আনতে দেরি হচ্ছে।’
প্রধানমন্ত্রী গত ৬ আগস্ট যখন চাল আমদানির অনুমতি দেন, তখন বিশ্ববাজারে চালের দাম ছিল কম। দেশেও মোটা চালের দাম নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল। আমন ধান তখনো কাটা শেষ হয়নি। ওই সময়ে আমদানি শুরু করলে দেশে পর্যায়ক্রমে চাল আসত। ধারাবাহিকভাবে চালের দাম বাড়ত না। এখন বাংলাদেশে একসঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি দুই খাতেই আমদানি শুরু হয়েছে। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে দ্রুত দাম বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রী আমদানির নির্দেশ দেওয়ার পরও সেই সময় আমদানি শুরু না করার কারণ জানতে চাইলে খাদ্য সচিব বলেন, ‘ওই সময় মাঠে আমন ছিল। আউশের বিষয়ও ছিল। ওই সময় চাল আমদানি করলে কৃষক ধানের ন্যায্য দাম পেত না। বিষয়গুলো বিবেচনা করেই চাল আমদানি করা হয়নি।’
এ অবস্থায় বোরোই কি একমাত্র ভরসা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বোরো ঝুঁকিপূর্ণ হলেও বোরোই ভরসার জায়গা। বোরো সংগ্রহ করতে পারলে ভালো। তা না হলে, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কেনা চাল দিয়ে নিরাপদ মজুদ গড়ে তুলতে হবে।’
সরকার চাল কেনার আগেই বেসরকারি খাতের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ায় চালের আন্তর্জাতিক বাজার দাম বেড়েছে বলে কি আপনি মনে করেন এ প্রশ্নের জবাবে ড. নাজমানারা বলেন, ‘আমি তা মনে করি না। কারণ আমরা চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছি অনেক আগে। বেসরকারি খাতে তো সেদিন উন্মুক্ত করা হলো।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বছর ৬ আগস্ট আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চাল আমদানির নির্দেশ দেন। কিন্তু খাদ্য মন্ত্রণালয় গত ডিসেম্বরে চাল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করে। পাঁচ মাস বসে থাকার কারণ জানতে চাইলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মূলত পরিসংখ্যানগত ঘাটতির জন্য এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। কৃষিসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছিলেন তৃণমূল পর্যাযে প্রচুর ধান মজুদ আছে। করোনার ভয়ে তারা ধান বাজারে বিক্রি করছে না। নতুন ধান ওঠার আগে কৃষকরা মজুদ করা পুরনো ধান ছেড়ে দেবেন। তখন বাজারে চালের দাম কমে আসবে। মূলত কৃষি কর্মকর্তাদের এ তথ্যের ওপর ভরসা করেই আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চাল আমদানি শুরু করতে দেরি হয়েছে।’
খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারি খাতে আসবে ১১ লাখ টন চাল। ইতিমধ্যে চুক্তি হয়েছে সাড়ে ৯ লাখ টনের। এসেছে মাত্র ১ লাখ ৯৫ হাজার টন। তিন টেন্ডার বাতিলের পর আরও তিনটি টেন্ডারের আওতায় দেড় লাখ টন আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। টনপ্রতি ৪১৬ ডলার দরে ৫০ হাজার টন চাল সরবরাহ করেছে পিকে এগ্রি। রিকা গ্লোবাল ৪১ হাজার টন চাল সরবরাহ করেছে ৪০৬ ডলারে। আরও ১১ হাজার টন ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। ৪২০ ডলার দরে আরও ৫০ হাজার টন সরবরাহের চুক্তি করে পিকে এগ্রি। ৬ হাজার ৩৯১ টন পাওয়া গেছে। আরও ৯ হাজার ৮৩ টন পথে রয়েছে। ইটিসি এগ্রো নিয়ে এসেছে ৪৮ হাজার টন চাল। এগ্রাকর্প গত ১৪ জানুয়ারি ৫০ হাজার টনের জন্য চুক্তি করলেও এখনো ৩০ হাজার টন সরবরাহ করতে পারেনি।
জি টু জি পদ্ধতিতে গত ৬ জানুয়ারি করা চুক্তির আওতায় ভারত থেকে দেড় লাখ টন আসার কথা থাকলেও এসেছে ২৩ হাজার টন চাল। বন্দরে ভাসমান আছে ৪ হাজার ৬৯০ টন। পথে আছে ৬ হাজার ৮৮৯ টন। ভারত থেকে আরও এক লাখ টন আনার জন্য গত ২৪ ফেব্রুয়ারি চুক্তি করা হয়। এ চাল এখনো পাওয়া যায়নি। ভারত থেকে আরও দেড় লাখ টন আনার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। মিয়ানমার থেকে জি টু জি পদ্ধতিতে এক লাখ টন আনার জন্য গত ৪ ফেব্রুয়ারি চুক্তি করা হয়েছে। ভিয়েতনাম থেকে ৫০ হাজার টন এবং থাইল্যান্ড থেকে দেড় লাখ টন আনার জন্য প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
টেন্ডারে আশানুরূপ সাড়া না পাওয়ার কারণ জানতে চাইলে খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক বাজার চড়ার কথা জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম টনপ্রতি ৪৫০ ডলারের কাছাকাছি। দেশেও খাদ্যশস্যের সংকট রয়েছে। সরকার মজুদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না করেই আমদানির বাজার উন্মুক্ত করে দেয়। বেসরকারি আমদানিকারকরা বাজারে যাওয়ার পর চালের দাম আরও বেড়েছে। এ কারণে সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ সরবরাহকারীরাও চাল দিতে পারছেন না। আর বেসরকারি আমদানিকারকরাও আমদানিতে নানা বাধার মুখে পড়ছেন। বেসরকারি আমদানিকারকরা মূলত ভারত থেকে সড়কপথে চাল আমদানি করে থাকেন। কিন্তু ভারতের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় চালের বদলে অন্যান্য সামগ্রী বোঝাইকৃত ট্রাক অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি কূটনৈতিক পর্যায়ে মীমাংসা করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বেসরকারিভাবে ৩২০ জন আমদানিকারককে চাল আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তারা ৮ লাখ ২৬ হাজার টন চাল আমদানির জন্য এলসি খুলেছেন। তাদের মাধ্যমে ৩ লাখ ৮০ হাজার টন চাল এসেছে।
কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বোরো ধানের আবাদ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হয়েছে। একই সঙ্গে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য এ বছর হাইব্রিড ধানের আবাদ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে ধানের উৎপাদন ভালো হবে। হাওরসহ সারা দেশের ধান সুষ্ঠুভাবে ঘরে তুলতে পারলে সমস্যা হবে না।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, এবার বোরোতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪৮ লাখ ৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে। আবাদ হয়েছে ৪৮ লাখ ৮৩ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে হাইব্রিড ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১১ লাখ ৪ হাজার ৬৩৩ হেক্টর জমিতে। আবাদ হয়েছে ১২ লাখ ১৩ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে। এ বছর বোরো ধানের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে বীজ সহায়তাবাবদ প্রায় ১৪৫ কোটি টাকার প্রণোদনা বিতরণ করা হয়েছে।
দেশে বছরে সাড়ে তিন কোটি টনের বেশি চাল উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে প্রায় দেড় কোটি টন চাল আসে আমন মৌসুম থেকে। গত বোরো মৌসুমে সরকার নির্ধারিত পরিমাণে ধান-চাল সংগ্রহ করতে না পারায় আমন মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে মোট সাড়ে আট লাখ টন খাদ্যশস্য সংগ্রহ করতে চেয়েছিল। এর মধ্যে দুই লাখ টন ধান এবং সাড়ে ছয় লাখ টন চাল কেনার লক্ষ্য ঠিক করেছিল। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। গত বোরো মৌসুমেও সরকার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি।
গত আমন মৌসুমে সিদ্ধ ও আতপ চাল সরবরাহে ব্যর্থ চালকল মালিকদের জামানত বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে। জামানত বাজেয়াপ্তের নির্দেশনা দিয়ে খাদ্য অধিদপ্তর থেকে আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
গত ১৫ মার্চ আমন সংগ্রহ অভিযান শেষ হয়। ছয় লাখ টন সিদ্ধ চালের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য চালকল মালিকদের সঙ্গে ১ লাখ ২৯ হাজার ১৯ টন সিদ্ধ চাল এবং ৫০ হাজার টন আতপ চালের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১৪ হাজার ৭১ টন আতপ চাল কেনার চুক্তি হয়। সম্পাদিত চুক্তির বিপরীতে গত ১৫ মার্চ পর্যন্ত ৬৮ হাজার ৯৯৭ টন সিদ্ধ চাল এবং ৪ হাজার ৮৫৯ টন আতপ চাল সংগৃহীত হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী ৬০ হাজার ২২ টন সিদ্ধ চাল এবং ৯ হাজার ২১২ টন আতপ চাল সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয় চালকল মালিকরা। এ পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ সংগ্রহের আওতায় সম্পাদিত চুক্তিশর্ত অনুযায়ী খেলাপি (সরবরাহে ব্যর্থ) সিদ্ধ ও আতপ চালকলের জামানত বাজেয়াপ্তের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের নির্দেশনা দিতে আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের জানানো হয়েছে।
