হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচিতে ‘হামলা’ চালিয়ে ‘মানুষ হত্যা’র প্রতিবাদে পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল মঙ্গলবার সারা দেশে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে বিএনপি। এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গাজীপুর, নওগাঁ, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে দলটির নেতাকর্মীদের। এ সময় আহত হয়েছেন শতাধিক নেতাকর্মী। এছাড়া গ্রেপ্তার হয়েছেন অনেকে। তবে ঠাকুরগাঁও, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ, বরিশাল ও ফরিদপুরে শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করেছে বিএনপি।
এদিকে গতকাল বিকেলে রাজধানী ঢাকার গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করে বলেন, নওগাঁয় বিএনপির শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ গুলি চালিয়ে ৫০ জনের বেশি নেতাকর্মীকে আহত করেছে। পুলিশের গুলিতে নওগাঁ জেলা মহিলা দল নেত্রী কহিনুর ইসলাম মিলি গুরুতর আহত হয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
বিস্তারিত আমাদের ঢাকা কার্যালয়ের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে :
গাজীপুরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ : কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল বিকেল ৩টার দিকে গাজীপুর মহানগর বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আবদুস সালাম শামীমের নেতৃত্বে একটি মিছিল শহরের আজিম উদ্দিন কলেজ এলাকা থেকে শুরু হয়ে রাজবাড়ী রোডের দলীয় কার্যালয়ের দিকে যাচ্ছিল। মিছিলটি মাধববাড়ির সামনে পৌঁছালে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় নেতাকর্মীরা বাধা উপেক্ষা করে এগিয়ে গেলে পুলিশ তাদের লাঠিপেটা করে। একপর্যায়ে পুলিশ শটগানের গুলি ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে কমপক্ষে ১০ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে গুরুতর অবস্থায় মহানগর সদর থানা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রাজু আহমেদ, যুবদল কর্মী সাইদুল মাহমুদ, মহানগর সদর থানা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেড মাহবুব, টঙ্গী পূর্ব থানা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রিফাত রশিদকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
গাজীপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি হাসান উদ্দিন সরকার বলেন, নেতাকর্মীরা জেলা শহরে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছিলেন। একটি মিছিল নিয়ে বিএনপি অফিসের দিকে যাওয়ার সময় পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ করে এবং শটগানের গুলি ছোড়ে।
গাজীপুর মেট্রোপলিটনের সদর থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিএনপি নেতাকর্মীরা মিছিল করার সময় রাজবাড়ী রোডে চলাচলরত যানবাহন ভাঙচুর করছিল। যানবাহন ভাঙচুর করতে বাধা সৃষ্টি করলে তারা আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠে। এ সময় লাঠিচার্জ করে তাদের ছাত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়।’
নাটোরে পুলিশের ধাওয়া : সকালে শহরের আলাইপুরে জেলা বিএনপির অস্থায়ী কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশের চেষ্টা করে জেলা বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ সময় নাটোর সদর থানা ও গোয়েন্দা পুলিশের বিপুলসংখ্যক সদস্য জেলা বিএনপি কার্যালয় অবরুদ্ধ রাখে এবং সমাবেশ করতে বাধা দেয়। বিএনপি নেতাকর্মীরা বাধা উপেক্ষা করে সমাবেশের চেষ্টা করলে বিএনপি নেতা ফয়সাল আলম আবুল বেপারি ও জেলা ছাত্রদল সভাপতি কামরুল ইসলামকে পুলিশ আটক করে গাড়িতে তোলে। এ সময় জেলা বিএনপির সদস্য সচিব রহিম নেওয়াজকেও আটকের চেষ্টা করা হয়। পরে বিএনপি নেতাকর্মীরা পুলিশের কাছ থেকে আটক দুই নেতাকে ছাড়িয়ে নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। এ সময় অন্য বিএনপি নেতাকর্মীদের ধাওয়া করে এলাকা ছাড়া করে পুলিশ।
নওগাঁয় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ : গতকাল দুপুর ১২টার দিকে নওগাঁ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে দলীয় র্কাযালয়ের সামনে থেকে নেতাকর্মীরা মিছিল বের করার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে দু’পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে পুলিশ লাঠিপেটা শুরু করলে বিএনপির নেতাকর্মীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পর বিএনপি নেতাকর্মীরা আবারও জড়ো হয়ে দলীয় কার্যালয়ের পূর্ব দিক থেকে পুলিশদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। একপর্যায়ে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিয়ার শেল, রাবার বুলটে ও ফাঁকা গুলি ছোড়ে।
নওগাঁ জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম ধলু সাংবাদিকদের বলেন, ‘কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে দুপুরে কেডির মোড়ে মিছিল বের করি আমরা। এ সময় পুলিশ বাধা দেয় এবং আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর লাঠিচার্জ শুরু করে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে রাবার বুলেট ছোড়ে পুলিশ। ফাঁকা গুলিও করে। এতে বিএনপির অন্তত ১০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।’
জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রকিবুল আক্তার সাংবাদিকদের বলেন, ‘অনুমতি ছাড়াই বিএনপির ৫০০ নেতাকর্মী মিছিল বের করার চেষ্টা করে। এ সময় বিএনপির নেতাকর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। এতে পুলিশের ৫ সদস্য আহত হয়েছে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করে।’
কিশোরগঞ্জে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া : গতকাল দুপুর ১২টার দিকে বিএনপি নেতাকর্মীরা শহরের পুরান থানা ও একরামপুর এলাকায় রাস্তায় টায়ারে আগুন দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি এবং দোকানপাটে হামলা চালায়। এসময় পুলিশ তাদের ধাওয়া দিলে বিক্ষোভকারীরা রেললাইনে অবস্থান নিয়ে পুলিশের ওপর অনবরত পাথর নিক্ষেপ করতে থাকে। পুলিশও পাল্টা জবাব দিতে বিপুলসংখ্যক সাউন্ড গ্রেনেড ও শটগানের গুলি ছোড়ে। এভাবে দুই ঘণ্টাব্যাপী ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলে। এ সময় চারজনকে আটক করে পুলিশ।
কিশোরগঞ্জ মডেল থানার ওসি আবু বাক্কার সিদ্দিক বলেন, ‘বিক্ষোভের নামে তারা জনগণের দোকানপাট ভাঙচুর করেছে। এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’
ময়মনসিংহে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি : কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল বিক্ষোভ মিছিল বের করে মহানগর বিএনপি। এ সময় পুলিশ বাধা দিলে রাস্তায় বসে পড়ে সমাবেশ করে মহানগর বিএনপি নেতাকর্মীরা। সমাবেশ শেষে ফেরার পথে নগরীর বাগানবাড়ী এলাকায় পুলিশের সাথে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। এতে আহত হন মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবু ওয়াহাব আকন্দ ও মহানগর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক তানভীর আহমেদ রবিন। এ সময় পুলিশ বিএনপি ও যুবদল-ছাত্রদলের ৮ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে।
কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি ফিরোজ তালুকদার বলেন, ‘বিএনপির নেতাকর্মীরা মিছিল শেষে বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়।’
মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবু ওয়াহাব আকন্দ বলেন, ‘সমাবেশ শেষ করে বাসায় ফেরার পথে বাগানবাড়ী সড়কে পুলিশ আমাদের চারদিক থেকে ঘিরে ধরলে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে।’
টাঙ্গাইলে পুলিশের বাধা : গতকাল সকালে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফরহাদ ইকবালের নেতৃত্বে টাঙ্গাইল প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে বিক্ষোভ বের হলে পুলিশ তাতে বাধা দেয়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে নেতাকর্মীদের ধস্তাধস্তি হয়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ এসে তাদের ধাওয়া করলে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
