দুদিনের মধ্যে টিকা না এলে প্রথম ডোজ বন্ধ

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২১, ০২:০৫ এএম

ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে সময়মতো চুক্তির টিকা না আসায় দেশে করোনার টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া বন্ধ হতে যাচ্ছে। বর্তমানে টিকার যে মজুদ আছে, সেটা দ্বিতীয় ডোজ হিসেবে দেওয়া হবে। তবে প্রথম ডোজ বন্ধ করার বিষয়টি নির্ভর করছে টিকা সরবরাহের ওপর। আগামী দু-এক দিনের মধ্যে টিকা না এলে প্রথম ডোজ বন্ধ করে ৮ এপ্রিল থেকে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়া শুরু হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে টিকার সরবরাহের ব্যাপারে নিশ্চিত কিছু জানা যাচ্ছে না। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান দেশের বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস এ ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না। সুতরাং যাদের প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে, তাদের দ্বিতীয় ডোজের ব্যাপারে অনিশ্চয়তা রাখতে চায় না সরকার। সে জন্য বর্তমানে টিকার যে মজুদ আছে, সেটা দ্বিতীয় ডোজ হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই টিকা দিয়েই ৮ এপ্রিল থেকে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়া শুরু করা হবে। এর মধ্যে টিকা চলে এলে প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ দুটোই চলতে থাকবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা অবশ্য দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, দু-এক দিনের মধ্যে টিকা না এলে ৫ এপ্রিল থেকে প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হবে। এ রকম একটা সিদ্ধান্ত আছে। ৮ এপ্রিল থেকে দ্বিতীয় ডোজ টিকা শুরু হবে।

অবশ্য প্রথম ডোজ বন্ধ হওয়ার ব্যাপারে নির্দিষ্ট তারিখের কথা না জানালেও টিকা না এলে প্রথম ডোজ বন্ধ হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে কতটুকু টিকা আছে, সেটা আমরা জানি। কতটুকু পাব, পাব না, এটা অনিশ্চিত। কারণ টিকা দিচ্ছে না। আমরা আশায় বসে আছি। এখন আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে প্রথম ডোজ নাকি দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। যাদের প্রথম ডোজ দিয়েছি, তাদের দ্বিতীয় ডোজ দেওয়াটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যারা প্রথম ডোজ পেয়েছে, আট সপ্তাহের মধ্যে তারা দ্বিতীয় ডোজ না পেলে টিকার কার্যকারিতা থাকবে না। সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া না হলে তাকে আবার প্রথম ডোজ দিতে হবে। সে জন্য আমাদের দ্বিতীয় ডোজ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয় ডোজ নিশ্চিত করতে হলে এবং এর মধ্যে যদি টিকা না আসে, তাহলে তো স্বাভাবিকভাবেই প্রথম ডোজ বন্ধ হয়ে যাবে। সেভাবে ব্যবস্থা করা আছে। যদি টিকা আসে, তাহলে প্রথম ডোজ বন্ধ হবে না। আর টিকা না এলে আমাদের প্ল্যান-বিতে যেতে হবে।

দ্বিতীয় ডোজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। কিছু লোক তো আগে দিয়েছে। তাদের দেওয়া শুরু হয়েছে, জানান মন্ত্রী।

সে ক্ষেত্রে কবে নাগাদ টিকা আসতে পারে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, বেক্সিমকোর সঙ্গে রোজ কথা হচ্ছে। তারা জানিয়েছে, টিকা আসবে। তবে কবে আসবে, সেই সময় ফ্রেমটা তাদের হাতে নেই বলে জানিয়েছে।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রথম ডোজ বন্ধ না করার চেষ্টা করব আমরা। কিন্তু টিকা না এলে কোথা থেকে দেব? তবে টিকা না এলে প্রথম ডোজ দিতে পারব না। কারণ যারা প্রথম ডোজ নিয়েছেন, তাদের দ্বিতীয় ডোজ টিকা নিশ্চিত করতে হবে। যারা প্রথম ডোজ নিয়েছেন, তাদের যদি দ্বিতীয় ডোজ না দিই, মব যদি প্রথম ডোজে দিয়ে ফেলি, তাহলে লাভ হবে না। এটা সবাইকে বুঝতে হবে। টিকা না এলে সরকার টিকা দিতে পারবে না, এটাই স্বাভাবিক।

টিকা আছে ৪৭ লাখ : এ পর্যন্ত দেশে টিকা এসেছে ১ কোটি ২ লাখ। গতকাল পর্যন্ত ৫৪ লাখ ৫২ হাজার ৬৩৪ জনকে টিকা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মজুদ আছে ৪৭ লাখ ৪৭ হাজার ৩৬৬ ডোজ।

গত নভেম্বরে সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে তিন কোটি ‘কভিশিল্ড’ টিকা কিনতে চুক্তি করে বাংলাদেশ। চুক্তি অনুযায়ী প্রতি মাসে ৫০ লাখ করে টিকা আসার কথা। গত জানুয়ারির শেষে টিকার প্রথম চালান হাতে পাওয়ার পর গত ৭ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে গণটিকাদান শুরু হয়। প্রায় দেড় মাসে ৫০ লাখের বেশি মানুষকে টিকা দেওয়া হয়েছে, যা মোট জনসংখ্যার ৩ শতাংশের মতো।

নভেম্বরের চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ করে ছয় মাসে তিন কোটি ডোজ টিকা পাওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের। কিন্তু বিপুল চাহিদা আর বিশ^জুড়ে টিকার সরবরাহ সংকটের মধ্যে ফেব্রুয়ারির চালানে বাংলাদেশ ২০ লাখ ডোজ পেয়েছে। এর পরের চালান ২৬ মার্চ বা তার পর আসতে পারে বলে এর আগে জানিয়েছিলেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আবদুল মান্নান। কিন্তু এই টিকা কবে আসবে, এখন সে ব্যাপারে নিশ্চিত করে বলতে পারছে না কেউ।

ভারত সরকারের উপহার হিসেবে ১২ লাখ করোনার টিকা বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছে। দেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে উপহার হিসেবে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের উৎপাদিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার করোনার টিকা ‘কভিশিল্ড’ উপহার দিল ভারত। এর আগে ২১ জানুয়ারি উপহার হিসেবে আরও ২০ লাখ টিকা দিয়েছিল ভারত।

টিকা ব্যবস্থাপনায় উদ্বেগ : গত সপ্তাহে সেরাম ইনস্টিটিউটের টিকা রপ্তানি স্থগিতের খবরে এর বিতরণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ দেখা দিয়েছে বাংলাদেশে। সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী প্রতি মাসে ৫০ লাখ করে ছয় মাসে তিন কোটি টিকা সরকারের কাছে পৌঁছে দেবে দেশের বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস। প্রথম চালানের ৫০ লাখ টিকা জানুয়ারির শেষে সময়মতো দেশে এসে পৌঁছায়। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে দ্বিতীয় চালানের ৫০ লাখের মধ্যে মাত্র ২০ লাখ এসেছে। বাকি টিকা মার্চের প্রথম সপ্তাহে এবং মার্চের শেষের দিকে তৃতীয় চালানের ৫০ লাখ টিকা এসে পৌঁছানোর কথা থাকলেও তা এখনো আসেনি। অর্থাৎ চুক্তি অনুযায়ী মার্চের মধ্যে ৮০ লাখ টিকা পাওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় চালানের ৫০ লাখের মধ্যে এসেছে ২০ লাখ। সেই চালানের বাকি ৩০ লাখ ও মার্চের তৃতীয় চালানের ৫০ লাখ এখনো আসেনি। কবে আসবে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছে না কেউ।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ রোবেদ আমিন বলেন, টিকা রপ্তানি স্থগিত হলে বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচিতে কিছু সমস্যা তৈরি হবে। সে ক্ষেত্রে টিকা বিতরণ ব্যবস্থাপনায় কিছুটা পরিবর্তন আনতে হবে। কারণ সেরাম থেকে কেনা টিকা পাওয়ার ব্যাপারে কিছু ঝামেলা হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী মার্চের মধ্যে ৮০ লাখ টিকা পাওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় চালানের ৫০ লাখের মধ্যে এসেছে ২০ লাখ। সেই চালানের বাকি ৩০ লাখ ও মার্চের তৃতীয় চালানের ৫০ লাখ এখনো আসেনি। এমনও হতে পারে প্রথম ডোজ দেওয়া বন্ধ রেখে ৮ এপ্রিল থেকে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া শুরু হতে পারে। তবে চুক্তির টিকা আসার ব্যাপারে টিকা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড আনুষ্ঠানিকভাবে এখন পর্যন্ত সরকারকে কিছু জানায়নি।

টিকাগ্রহীতা আরও কমেছে : দেশে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়লেও টিকাগ্রহীতার সংখ্যা কমছে। গত ৭ ফেব্রুয়ারি গণটিকা শুরুর পর গতকাল শনিবার দ্বিতীয় সর্বনিম্ন মানুষ করোনাভাইরাসের টিকা নিয়েছেন। এদিন টিকা নিয়েছেন ৩৯ হজার ৮৪৩ জন। এর চেয়ে কম টিকাগ্রহীতা ছিলেন গত ৭ ফেব্রুয়ারি ৩১ হাজার ১৬০ জন। দেশে এখন পর্যন্ত ৬৮ লাখ ৮৪ হাজার ৮২৮ জন টিকার জন্য নিবন্ধন করেছেন। প্রথম ডোজের টিকা নিয়েছেন ৫৪ লাখ ৫২ হাজার ৬৩৪ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ৩৩ লাখ ৮৬ হাজার ৩৫৩ ও নারী ২০ লাখ ৬৬ হাজার ২৮১ জন। তবে গতকাল সরকারি ছুটি থাকায় তিনটি টিকাদান কেন্দ্র বন্ধ ছিল।

এখন পর্যন্ত টিকাগ্রহীতাদের মধ্যে সামান্য পাশর্^প্রতিক্রিয়ার তথ্য জানিয়েছেন ৯৩৭ জন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় পাশর্^প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে মাত্র একজনের। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক এমআইএস ও লাইন ডিরেক্টর এইচআইএস অ্যান্ড ই-হেলথ অধ্যাপক ডা. মিজানুর রহমান স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

দেশে গত ৭ ফেব্রুয়ারি গণটিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম দিকে টিকাগ্রহীতার সংখ্যা এক লাখের নিচে থাকলেও দ্বিতীয় দিনের পর থেকে তা বাড়তে থাকে। ১৫ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গড়ে দৈনিক টিকা নিয়েছেন ২ লাখের বেশি মানুষ। ২৩ ফেব্রুয়ারির পর থেকে টিকাগ্রহীতার এ সংখ্যা কিছুটা কমতে শুরু করে। ২৩ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গড়ে দেড় লাখের কিছু বেশি মানুষ টিকা নিয়েছেন। এরপর গত ২৭ তারিখ থেকে এই সংখ্যা আরও কমতে থাকে। চলতি মাসে টিকা গ্রহণের সংখ্যা এক লাখের নিচে নেমে আসে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত