স্বাস্থ্যের রোগ সারাবে কে

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২১, ১১:৪৬ পিএম

দেশে করোনাভাইরাস মহামারীর এক বছরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা ও দুর্নীতির কথা। মহামারীর জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় যথাযথ নেতৃত্ব দিতে না পারার অভিযোগ এনে দেশের শীর্ষ জনস্বাস্থ্যবিদ ও মহামারী বিশেষজ্ঞরা ইতিমধ্যেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে ‘অকার্যকর’ বলেও অভিহিত করেছেন। মহামারীর এই এক বছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে দুজন সচিবকে অপসারণ করা হয়েছে। গত বছরের ৪ জুন তৎকালীন স্বাস্থ্য সচিব আসাদুল ইসলামকে সরিয়ে দেওয়ার পর গত রবিবার সরিয়ে দেওয়া হলো তার স্থলাভিষিক্ত আবদুল মান্নানকেও। প্রশ্ন হলো, এই সচিব বদলের মধ্য দিয়ে কি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সুস্থ হয়ে উঠবে নাকি দেশে করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় সাফল্যের বদলে মন্ত্রণালয়টি দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতকে আরও বিতর্কিত করে তুলবে?

করোনা মহামারীর শুরুতেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একের পর এক অনিয়ম ও কেলেঙ্কারি প্রকাশ হতে থাকে। মাস্ক ও পিপিই বা ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী কেনায় দুর্নীতি, কভিড পরীক্ষার নামে জালিয়াতি, অনুমোদন বা লাইসেন্স ছাড়া হাসপাতাল পরিচালনা, যোগ্যতা না থাকলেও পাঁচটি হাসপাতালকে কভিড পরীক্ষা ও চিকিৎসার অনুমতি দেওয়া এবং পরে তা বাতিল করা; একের পর এক এসব ঘটনায় স্বাস্থ্য খাত নিয়ে সমালোচনা তুঙ্গে ওঠে। এ ছাড়া চিকিৎসক ও নার্সদের হোটেল বিল, লাইসেন্স নবায়নপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন, চিকিৎসকদের পদোন্নতি, গাড়ি ব্যবসায়ীকে স্বাস্থ্যের কাজ দেওয়াসহ নানা অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় সংবাদমাধ্যমে। কিন্তু দেশজুড়ে শত সমালোচনার পরও যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের টনক নড়েনি সেটা প্রমাণ হয়েছে পরবর্তী দশ-এগারো মাসেও করোনা মোকাবিলায় দেশের হাসপাতালগুলোতে অত্যাবশ্যক জরুরি কাজগুলো সম্পাদনে ব্যর্থতায়।

মহামারীর প্রথম ঢেউয়ের প্রবল আঘাতের মধ্যেই দেশের মানুষ জানতে পারে শ্বাসতন্ত্রের রোগ কভিড-১৯-এর চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলাসহ নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ। মানুষ এটাও জানতে পারে যে, দেশের বেশিরভাগ জেলা হাসপাতালেই সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্ট নেই বা যা আছে তা মোটেই যথেষ্ট নয়। করোনা রোগীদের নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহের জন্য বিভিন্ন হাসপাতালে লিকুইড অক্সিজেন ট্যাংক স্থাপন করতে গত বছরের ৫ মে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এরপর চলে গেছে প্রায় ১১ মাস। এখন আবার সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় অক্সিজেন সরবরাহের কাজে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। কিন্তু এই অবস্থায় জানা গেল সারা দেশে ৭৯টি হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্টের মধ্যে বিগত মার্চ মাস পর্যন্ত মাত্র ৩৮টিতে কাজ শেষ হয়েছে এবং অক্সিজেন সরবরাহ শুরু হয়েছে। সংক্রমণের এক বছর পরও নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারায় স্বাস্থ্য বিভাগের অযোগ্যতা ও অদক্ষতাকে দুষছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। তারা বলছেন, প্রতিটি জেলা হাসপাতালে অন্তত নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা থাকাটা আবশ্যক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত করোনা রোগীর ক্ষেত্রে অক্সিজেন সরবরাহের প্রয়োজন হতে পারে।

কেবল সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্টই নয়, জেলা পর্যায়ের সব সরকারি হাসপাতালগুলোতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ বাসানোর কাজ নিয়েও চরম দোদুল্যমানতা আর ব্যর্থতা দেখা গেছে। বারবার সিদ্ধান্ত পাল্টানো আর যথাযথভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের গাফিলতিতে আইসিইউ স্থাপন প্রকল্পও শেষ হয়নি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, এখন দেশের সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত ৩১টি জেলার মধ্যে ১৫টিতেই আইসিইউ নেই। অথচ ১০ মাস আগেই সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিট স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জেলা পর্যায়ে আইসিইউ ইউনিট তৈরি না হওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগের গাফিলতিই দায়ী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক বে-নজীর আহমেদ সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়ের অভাবেই স্বাস্থ্য খাতে সক্ষমতার ৫০ শতাংশ অপচয় হয়। নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ আর আইসিইউ স্থাপন নিশ্চিত করতে না পারার পেছনে যাদের গাফিলতি আছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা দেশে নতুন কিছু নয়। কিন্তু এই প্রাণঘাতী মহামারীর কালে দেশের মানুষ অন্তত ভিন্ন এক বাস্তবতা আশা করেছিল। মানুষ ভেবেছিল সরকার যেখানে করোনা মহামারীর হাত থেকে অর্থনীতি ও জীবিকা বাঁচাতে লাখো কোটি টাকার ওপরে বিশেষ প্রণোদনা দিচ্ছে, নানা ধরনের সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে এই অসিলায় হয়তো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করবে এবং স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের সংকটগুলোও দূর হবে। কিন্তু সেই আশায় গুড়েবালি! স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি নিয়ে আলোচনায় গাড়িচালক আবদুল মালেকের নাম আলোচিত হবে, আফজাল-রুবিনা দম্পতির চাঞ্চল্যকর কাহিনী ছড়িয়ে পড়বে, দুজন সচিব বদলাবে কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার দায় কেউ নেবে না! মহামারীকালে চরম দুর্যোগেও যদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিজেকে সারিয়ে তুলতে না পারে তাহলে দেশের মানুষকে বাঁচাবে কীভাবে? 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত