বিধিনিষেধে স্ববিরোধিতা দুর্ভোগে সাধারণ মানুষ

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২১, ০১:৩৬ এএম

করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ের উচ্চ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের দেওয়া কঠোর বিধিনিষেধের প্রথম দিন ছিল যেন বাস ধর্মঘট আর জনদুর্ভোগের দিন। রাজধানীসহ দেশব্যাপী বাস এবং দূরপাল্লার পরিবহন বাস, ট্রেন ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকা ছাড়া সবই ছিল। সীমিত আকারে বেসরকারি অফিস আদালত খোলা থাকার যে নির্দেশনা তার ফাঁকে মূলত বেসরকারি অফিসগুলো পুরোদমেই খোলা ছিল। অথচ এসব কর্মী-শ্রমিকের কর্মস্থলে যাওয়ার প্রধান বাহন পাবলিক পরিবহন (বাস, ট্রেন) ছিল বন্ধ। নিম্ন আয়ের এবং অফিসগামীরা চার-পাঁচগুণ ভাড়া দিয়েও সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছতে পারেননি।

আবার অন্য সবকিছু (খাবার হোটেল, কাঁচাবাজার) বিশেষ করে বইমেলা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত রেখে শপিং মল ও দোকানপাট বন্ধ রাখায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনাসহ বিভাগীয় ও সারা দেশের দোকান মালিক ও ব্যবসায়ীরা বিক্ষোভ করেছেন। করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের এ নির্দেশনাকে অস্পষ্ট, জনসম্পৃক্ততাবিহীন ও সমন্বয়হীন বলে আখ্যায়িত করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা। তারা বলেন, সরকারের বেশিরভাগ মন্ত্রী ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এটাকে লকডাউন বললেও মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলছেন এটা কঠোর বিধিনিষেধ। তাতে করে গত তিন দিনে জনগণের কাছে এটা স্পষ্ট হয়েছে, এখানে জনপ্রতিনিধিদের বা যারা এ কঠোর বিধিনিষেধগুলোর বাস্তবায়ন করবেন তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা সমন্বয় করা হয়নি।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একাধিক এমপি দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটা সম্পূর্ণ আমলাদের তৈরি নির্দেশনা। এটা একটি বৈশ্বিক দুর্যোগ। এখানে চেয়ারে বসে নির্দেশনা দিলেই বাস্তবায়ন হবে না। এখানে ১৭ কোটি মানুষ জড়িত। এর মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই খেটে খাওয়া। তাই বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নেওয়া দরকার।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর এবং জনপ্রতিনিধিরা বলেছেন, লকডাউন বা করোনা নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর বিধিনিষেধের সফল বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে কোনো ধরনের বৈঠক ছাড়াই এ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এমনকি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি। ফলে প্রথম দিনই ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ভেঙে পড়েছে স্বাস্থ্যবিধি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যা হওয়ার হয়েছে। এখন দ্রুত ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করে অন্ততপক্ষে ১৪ দিনের ‘লকডাউন’ ঘোষণার পরামর্শ দেন তারা। লকডাউন সফল করতে তারা এমপি, সিটি মেয়র, পৌর মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান। তারা বলেন, আংশিক কিছু খোলা রাখার সুযোগ নেই। তাই সবকিছু বন্ধ ঘোষণা করে নিম্ন আয়ের মানুষের খাবার নিশ্চিতের ব্যবস্থা করতে হবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. বে-নজির আহমেদ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা তো পরিপত্র জারি করে দিলাম আর হয়ে গেল এমন ব্যাপার নয়। বিধিনিষেধগুলোর মধ্যেই গলদ রয়েছে। বোঝা যায় এটা প্রশাসন থেকে হুট করে করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলছেন এটা কঠোর বিধিনিষেধ আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক বলছেন, “লকডাউন” আবার বেশিরভাগ মন্ত্রীও বলছেন “লকডাউন”। আবার বইমেলা খোলা, দোকানপাট বন্ধ। অফিস আংশিক খোলা, পরিবহন বন্ধ। কোনো শৃঙ্খলা নেই।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পোশাক মালিক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে ১৪ দিনের লকডাউন ঘোষণা করতে পারলে তাড়াতাড়ি সুফল পাওয়া যাবে। তারা তো অনেক বছর ধরে কোটি কোটি টাকা আয় করেছে। এক মাস শ্রমিকদের অ্যাকাউন্টে ১০ হাজার টাকা করে দিলে তো অনেক ঝুঁকি কমে। পুলিশ দিয়ে, প্রশাসন দিয়ে ভয় দেখিয়ে মানুষের পেটের ক্ষুধা তো দাবিয়ে রাখা যাবে না। তাই জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অন্যান্য সংগঠন বিশেষ করে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও আওয়ামী লীগের মতো বড় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে এবং প্রান্তিক জনগণের সমস্যাগুলোর সমাধানে এগিয়ে আসতে পারে। প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ কাজ। আর এখন যেভাবে প্রজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে, তাতে যে যার স্বার্থ অনুযায়ী কাজ করতে থাকবে।

জনস্বাস্থ্য গবেষক ও বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, উন্নত দেশের মতো পলিসি এ দেশে কাজ করে না। দেশের অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে যে, আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত যোগ্য পলিসিমেকার তৈরি করতে পারেনি, সেই পরিবেশও তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে গত ৫০ বছরে। আমাদের গবেষণা নেই।’

অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সরকার যেটা দিয়েছে সেটা লকডাউন নয়, করোনা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কিছু কর্মসূচি। এতে লকডাউনের কিছু নেই। এ কর্মসূচির মধ্যে রোগী শনাক্ত করে আইসোলেট করা, টেস্টের ব্যাপারে কিছু বলা নেই। সেসব থাকতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভাইরাসের সুপ্তিকাল ১২-১৪ দিন। কমপক্ষে দুই সপ্তাহ হলে ভালো হতো। আজকে (গতকাল) যা হয়েছে, তাতে সংক্রমণ কমার সুযোগ কম। পুরো লকডাউন ঘোষণা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোশতাক আহমেদ বলেছেন, ‘যা হয়েছে তা তো হয়েছেই। এখন ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করে সিদ্ধান্তনিতে হবে। আমাদের জনগণের আর্থসামাজিক দিক বিবেচনা করেই পরিকল্পনা নিতে হবে। এই সাত দিনের পরিস্থিতি দেখে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় কঠোর কর্মসূচি দিতে হবে।’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শর্মিলা হুদা বলেছেন, ‘এখন যেভাবে লকডাউন চলছে তাতে সংক্রমণ কমিয়ে আনার সম্ভাবনা নেই। লকডাউন মানে হচ্ছে নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে যেতে পারবে না। কিন্তু আমাদের এখানে সে বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। এখানে লকডাউনকে মানুষ ছুটি বা অবসর হিসেবে ধরে নিয়ে ঢাকার বাইরে যাচ্ছে।’ তাই সংক্রমণ পরিস্থিতি দেখে আগামী দুয়েক দিনের মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে আরও সুনির্দিষ্ট ঘোষণার পরামর্শ দেন তিনি।

পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশনের সাবেক চেয়ারপারসন ডা. ফাতেমা আশরাফ বলেন, ‘লকডাউনের আগে মানুষ ঢাকা ছেড়েছে। যার কারণে গ্রামাঞ্চলও এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এই সাত দিনের লকডাউনের মাধ্যমে কিছু বিষয় নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। লকডাউনের মাধ্যমে হয়তো সামাজিক অনুষ্ঠান বা ভিড় কমানোর মতো বিষয়গুলোতে কিছুটা লাগাম টানা যেতে পারে। তবে এটি দিয়ে সংক্রমণ পুরো নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।’ তার মতে, সংক্রমণ কমিয়ে আনতে হলে ব্যক্তি ও পারিবারিক পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। তা না হলে সংক্রমণ বাড়বে এবং হাসপাতালে স্থান সংকটও দেখা দিতে পারে বলে হুঁশিয়ার করেন তিনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র ডা. মোহাম্মদ রোবেদ আমিন গতকাল বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘মূলত সংক্রমণ কমিয়ে আনার জন্যই লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদি দেখা যায় সংক্রমণ কমে আসছে তাহলে আরও কমাতে লকডাউন বাড়ানো হতে পারে। আবার যদি পরিস্থিতি উল্টো হয় যেমন রোগী বাড়ে এবং হাসপাতালে জায়গা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না এমন পরিস্থিতি দাঁড়ায়, তাহলেও লকডাউন বাড়তে পারে।’

তিনি আরও বলেন, সংক্রমণ কমাতে হলে শুধু লকডাউনের মতো একটা পদ্ধতি দিয়ে কাজ হবে না। সে ক্ষেত্রে সব পদ্ধতিই অনুসরণ করতে হবে। লকডাউনের সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধিও মেনে চলতে হবে। পাশাপাশি করোনা সংক্রমণের পরীক্ষা করানো, কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং করা, আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইনের মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। সঙ্গে ভ্যাকসিন দেওয়া অব্যাহত রাখতে হবে। এসব বিষয় সমন্বিতভাবে নেওয়া সম্ভব হলে করোনা সংক্রমণ কমিয়ে আনা যাবে বলে মনে করেন তিনি।

গতকাল মানিকগঞ্জের সদর হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সার্কিট হাউজে ‘লকডাউন’ বাড়ানোর বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেছেন, ‘সংক্রমণের পরিস্থিতি দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

আর মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম জানিয়েছেন, চলমান ‘লকডাউন’ আর বাড়বে কি না পরিস্থিতি দেখে আগামী বৃহস্পতিবার (৮ এপ্রিল) সিদ্ধান্ত হবে। গতকাল ভার্চুয়াল মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সচিবালয়ে ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা জানান তিনি।

এদিকে গতকাল রাজধানী ঘুরে ও দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য থেকে জানা গেছে, প্রথম দিনের পরিস্থিতি ছিল একেবারেই বিশৃঙ্খল। যানবাহন না থাকলেও রাস্তায় মানুষের উপস্থিতি ছিল অন্য যেকোনো দিনের মতো। গন্তব্যে যেতে মোড়ে মোড়ে জটলা বেঁধে মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। অফিসগুলো খোলা রাখলেও তাদের কর্মীদের জন্য পরিবহনের ব্যবস্থা না রাখায় দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া গুনতে হয়েছে তাদের। আবার দোকান মালিকদের বিক্ষোভ ছিল দেশব্যাপী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত