বিধিনিষেধহীন ১২-১৩ এপ্রিল নিয়ে উদ্বেগ

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২১, ০২:১৫ এএম

করোনা নিয়ন্ত্রণে দেশে সরকার ঘোষিত এক সপ্তাহের বিধিনিষেধ চলছে। ৫ এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে। শেষ হবে ১১ এপ্রিল মধ্যরাত। এরই মধ্যে গতকাল সরকারের দুই মন্ত্রী ১৪ এপ্রিল থেকে দেশে এক সপ্তাহের সর্বাত্মক লকডাউনের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে চলমান বিধিনিষেধ ও সম্ভাব্য লকডাউন শুরুর মাঝের দুদিন, অর্থাৎ ১২ ও ১৩ এপ্রিল সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এই দুই দিন ঘিরে নানা ধরনের আলোচনা চলছে। নতুন লকডাউনের আগে এই দুদিনে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি ও ঊর্ধ্বগতি দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে সরকার মানুষের বাড়ি যাওয়া ঠেকাতে গণপরিবহন বন্ধ রাখবে; নাকি ১৪ জানুয়ারির লকডাউন কার্যকর করতে এবং প্রয়োজনে আরও বাড়াতে এসব মানুষকে বাড়ি যাওয়ার সুযোগ করে দেবে? এমনকি মাঝখানের দুই দিনের সংক্রমণঝুঁকি কমাতে চলমান বিধিনিষেধকেই সর্বাত্মক লকডাউনের সঙ্গে সমন্বয় করে নেবে? এমন নানা ধরনের আলোচনা চলছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এমনও হতো পারে এই দুদিন পরের লকডাউনের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে কিংবা ওই দুদিন গণপরিবহন বন্ধ রেখে সব খুলে দেওয়া হতে পারে। তবে এ ব্যাপারে ১১ এপ্রিলের আগেই আমরা সিদ্ধান্ত জানাব।

অবশ্য এই দুদিনের ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা দুই ধরনের পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, সরকারের উচিত চলমান বিধিনিষেধ আরও এক সপ্তাহ অব্যাহত রাখা। তাহলে সংক্রমণের পরিস্থিতি বোঝা যাবে এবং মাঝখানের দুদিনে সংক্রমণ বাড়ার ঝুঁকিও থাকবে না। তবে তারা এমনও বলেছেন, সরকার সর্বাত্মক লকডাউন সফল করার জন্য গার্মেন্টসসহ নিম্ন আয়ের মানুষদের চলে যেতে দিতে চায়। যাতে প্রয়োজন হলে পরবর্তী লকডাউন বাড়াতে পারে।

তবে এই দুদিন ঘরমুখো মানুষের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাচলের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, স্বাস্থ্যবিধি না মানলে এসব লোকজন সংক্রমণ বাড়াবে এবং তাদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় নতুন করে সংক্রমণ দেখা দেবে।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার এই দুদিন কেন খোলা রাখল, সেটা চিন্তার বিষয়। নিশ্চয় সরকারের কোনো পরিকল্পনা আছে। এমন হতে পারে এই দুইটা দিন সরকার পরবর্তী লকডাউনের কিছু প্রস্তুতির জন্য রেখেছে। আরেকটা হতে পারে, সরকার চাইছে যে লোকগুলোর বাড়িতে না গিয়ে উপায় নেই, তাদের জন্য সুযোগ করে দিতে। যেমন গার্মেন্টসকর্মীসহ নিম্ন আয়ের মানুষ, তাদের তো থাকা একটু কঠিন। ওই দুদিন প্রাথমিক লকডাউন থাকবে না। তখন আন্তঃজেলা বাস চালু থাকবে। সুতরাং সরকার চাইছে এরা গ্রামগঞ্জে চলে যাক। এমনও ভাবতে পারে, আগামী লকডাউন এক সপ্তাহ থেকে আবার বাড়াতে পারে। বাড়লে যেন এসব লোকজন কোনো সমস্যায় না পড়ে, সেটাও ভাবতে পারে সরকার।

তবে এই যাওয়ার মধ্য দিয়ে সংক্রমণ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে জানিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, যারা গ্রামে যাবে, তাদের কিছু কিছু সংক্রমণ নিয়ে যাবে। এ রকম পরিস্থিতিতে সংক্রমণের একটা ঊর্ধ্বগতি দেখা দেয়। ভালো হতো যাওয়ার সময় স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মানতে কিছু উদ্যোগ নিতে পারলে। যেমন বাসগুলোতে কঠোর নিয়ম মানা, মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব মানা যাবে না। এ সময় কড়াকড়ি আরোপ করা কঠিন। তবে মাস্ক পরতেই হবে। রাস্তার মাঝখানে রেস্টুরেন্টে খাওয়া যাবে না, সে জন্য রেস্টুরেন্টগুলো বন্ধ রাখতে হবে। এসব রেস্টুরেন্ট খোলা থাকবে শুধু বাথরুমের জন্য। এগুলো ব্যবস্থাপনার মধ্যে রাখতে হবে।

এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, যেসব লোক বাড়ি যাবে, তারা গ্রামে গিয়ে বাড়ি থেকে বের হতে পারবে না। যেহেতু তখন লকডাউন চলবে, তখন তারা যদি বাড়ি থেকে বের না হয়, তাহলে একধরনের কোয়ারেন্টাইন হবে। গ্রামগঞ্জ, বাজারঘাটনির্বিশেষে সব বন্ধ রাখতে হবে। সে জন্য ইউনিয়ন পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের কাজে লাগাতে হবে। এই প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করলে সংক্রমণ কমানোর সুফল পাওয়া কঠিন কিছু না।

অবশ্য এক লকডাউন থেকে পরবর্তী লকডাউন শুরুর মাঝখানের দুই দিনের ঝুঁকি কমাতে ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চলমান বিধিনিষেধ আরও এক সপ্তাহ চালানোর পরামর্শ দিয়েছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরামর্শক ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, মাঝখানের দুদিন বিরতি রাখার দরকার নেই। চলমান বিধিনিষেধ আরও এক সপ্তাহ, অর্থাৎ আগামী সোমবার পর্যন্ত অব্যাহত রাখা উচিত। সর্বাত্মক লকডাউন দিতে হলে সেটা সোমবারের পর মঙ্গলবার থেকেও করতে পারবে। এই দুই সপ্তাহ পার হওয়ার পর যদি দেখি সংক্রমণের মাত্রা স্থিতিশীল হলো বা কমল কি না, সেটা দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কারণ অন্তত দুই সপ্তাহ লাগে সংক্রমণের প্রভাব বুঝতে। তাহলে মাঝখানের দুদিনের ঝুঁকিও থাকে না।

ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, এক সপ্তাহের যে বিধিনিষেধ চলছে, সেখানে জনসমাগম, ইনডোর মিটিং, সামাজিক অনুষ্ঠান, কমিউনিটি সেন্টার সব বন্ধ আছে। গণপরিবহনেও নিয়ম মানা হচ্ছে, শপিং মল খোলা হলেও সেখানেও স্বাস্থ্যবিধি কিছুটা হলেও মানা হচ্ছে। নিয়ম মেনে বইমেলা হচ্ছে। লোকজন যাচ্ছে না। এটার একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এই সোমবারের পরের সোমবার। ১৪ এপ্রিল থেকে সর্বাত্মক লকডাউনের যে সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে, সেটা ভালো। সংক্রমণটা যদি একটা স্থিতিশীল পর্যায়ে যায়, সে ক্ষেত্রে সার্বিকভাবে সবকিছু বন্ধ করা না-ও লাগতে পারে। তবে যদি সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়তেই থাকে, তাহলে সর্বাত্মক লকডাউন শেষ পদ্ধতি।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, গত সোমবার থেকে যে বিধিনিষেধ চলছে, সেটার প্রভাব পড়তে দুই সপ্তাহ লাগবে। সংক্রমণ পরিস্থিতি বুঝতে দুই সপ্তাহ ও মৃত্যু পরিস্থিতি বুঝতে তিন সপ্তাহ লাগবে। কাজেই এখনকার বিধিনিষেধ যদি মেনে চলি তাহলে সর্বাত্মক লকডাউনে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। সরকার যে ১৮ দফা নির্দেশনা দিয়েছে, সেটা যদি কাজে না লাগে ও আমরা যদি মেনে না চলি এবং পরের সোমবার থেকে যদি দেখি কার্যকর না হয়, তাহলে সর্বাত্মক লকডাউন লাগবে। তবে আমি আশাবাদী সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে একটা ইতিবাচক প্রভাব এই পরের সোমবার দেখা যাবে। সর্বাত্মকভাবে লকডাউন না-ও লাগতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, গত বছরের ২৫ মার্চ থেকে সারা দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। এ সময় আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লাসহ সব ধরনের গণপরিবহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু সংক্রমণ বাড়তে থাকায় সে সময় সরকার ঈদের ছুটি অন্তর্ভুক্ত করে সাধারণ ছুটির মেয়াদ ৩০ মে পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয় এবং জনগণকে যে যেখানে আছে, সেখানে থেকেই ঈদ উদযাপনের পরামর্শ দেয়। ঘরমুখো মানুষের স্রোত আটকাতে ঈদের আগে ও পরে সাত দিন জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষের যাতায়াত আটকাতে ঘোষণা দিয়ে রাস্তায় নামে প্রশাসন। কিন্তু কোনোভাবেই মানুষকে আটকানো যায় না। সামাজিক দূরত্ব না মেনেই ঘরমুখো মানুষকে ফেরাতে একপর্যায়ে ফেরি বন্ধ করে দেওয়া হলেও পরে আবার চালু করা হয়। ফলে গত বছরের জুন-আগস্ট পর্যন্ত সংক্রমণ ব্যাপক হারে বেড়েছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত