খুলনার পাথরঘাটার বাসিন্দা প্রবাসী মোস্তফা জামান। গত চার বছর ধরে তিনি সৌদি আরবের রিয়াদে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। গত ২০ জানুয়ারি ছুটিতে দেশে ফেরেন। তার ১৭ এপ্রিল ফ্লাইট ও ১৮ এপ্রিল ভিসার মেয়াদ শেষ হবে। এর মধ্যে ‘লকডাউনের’ কারণে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যায়। এই খবর শুনে তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। তিনি জানান, হঠাৎ খবর পান আগামীকাল (আজ) থেকে ফ্লাইট চলাচল শুরু হবে। রাতেই ঢাকায় আসতে রওনা দেন। বাস না থাকায় মোটরসাইকেল, ট্যাক্সি, ট্রাকে করে এসেছেন। তবে পথে পুলিশ তাকে আসতে সহায়তা করেছে। কিন্তু আজ (শুক্রবার) এয়ারলাইন্সের অফিস বন্ধ থাকায় কিছুই জানতে পারছেন না। সৌদি আরব থেকে বলা হয়েছে সেখানে নিয়ম বদলে গেছে। শনিবার রাত ২টায় তার ফ্লাইট।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আট হাজার টাকায় গাড়ি ভাড়া করে ছুটে এসেছেন এক সিঙ্গাপুর প্রবাসী জুলহাস মিয়া। তিনি জানান, আজ শনিবার তার ফ্লাইট। ‘লকডাউনের’ কারণে ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় তিনি করোনার নমুনাও পরীক্ষা করেননি। আগামীকাল ফ্লাইট কনফার্ম জানতে পারলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে করোনা পরীক্ষা করিয়ে নেবেন। কিন্তু এখানে এসে দেখেন অফিস বন্ধ। এখন উপায় কী তা বুঝতে পারছেন না। হঠাৎ বিশেষ ফ্লাইট ঘোষণা দেওয়ায় এই দুজনের মতোই কয়েক হাজার প্রবাসী পড়েছেন বিপাকে।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, আন্তর্জাতিক রুটে সব সিডিউল ফ্লাইট চার দিন বন্ধ থাকার পর আজ শনিবার থেকে চালু হচ্ছে বিশেষ ফ্লাইট। আটকে পড়া প্রবাসীদের কর্মস্থলে পৌঁছে দিতে এই ফ্লাইট চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে। আজ থেকেই রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ছাড়াও ইউএস বাংলা, সাউদিয়া এয়ারলাইন্স, এমিরেটস এয়ারলাইন্স, কাতার এয়ার, সিঙ্গাপুর এয়ারওয়েজ, ওমান এয়ারসহ আরও কয়েকটি এয়ারলাইন্স ঢাকা থেকে ফ্লাইট পরিচালনা করবে। এসব ফ্লাইটে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) কার্ডধারীরাই অগ্রাধিকার পাাবেন বলে জানা গেছে। অনেক যাত্রীই বৃহস্পতিবার রাত থেকেই ঢাকায় আসতে শুরু করেছেন। যাদের আজ এবং আগামীকালের ফ্লাইট ছিল তারা এখন কিছুটা বিপাকে পড়েছেন। তবে এই বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আটকে পড়া যাত্রীদের যাদের বিএমইটি কার্ড আছে, তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে সবাইকে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এছাড়া স্বল্প সময়ের টিকিটধারীদের রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে সাউদিয়ার অফিসে শুক্রবার ভিড় জমাতে দেখা যায়। তারা করোনা পরীক্ষার সনদ সংগ্রহ ও টিকিট হালনাগাদ করতেই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম মফিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রবাসী কর্মীদের বিষয়টি মাথায় রেখে শনিবার থেকে পাঁচটি দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার ও সিঙ্গাপুরে শতাধিক বিশেষ ফ্লাইটের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রবাসী কর্মীরা ওইসব ফ্লাইটে তাদের কর্মস্থলে যেতে পারবেন। এবং এসব দেশে যদি কোনো বাংলাদেশি আটকে থাকেন আর তারা যদি দেশে ফিরতে চান, তাহলে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করে ফেরা যাবে। তবে এই ক্ষেত্রে তাদের কভিড নেগেটিভ সনদ থাকতে হবে এবং দেশে ফেরার পর ১৪ দিনের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে থাকার শর্ত মানতে হবে। তিনি আরও বলেন, সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিশেষ ফ্লাইট শুধু ঢাকা থেকেই পরিচালনা করা হবে। চট্টগ্রাম থেকে এসব দেশে যেতে যারা টিকিট কেটেছিলেন, তাদের বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কানেকটিং ফ্লাইটে ঢাকায় আনা যাবে। প্রবাসী কর্মীদের জন্য বিশেষ ফ্লাইটের টিকিটের দাম সহনীয় রাখতে বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং চার্জ সাধারণ ফ্লাইটের মতোই রাখতে বলা হয়েছে। বিদেশফেরত যাত্রীদের ১৪ দিনের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে রাজধানীর দিয়াবাড়ি, চট্টগ্রাম ও সিলেটে পর্যাপ্ত প্রস্তুতিও রাখতে বলা হয়েছে।
যেসব গন্তব্যে যাবে বিমান : বেবিবচক ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে, ৫টি দেশে গমনেচ্ছু প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মীদের মধ্যে যাদের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় কর্তৃক ইস্যুকৃত বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স রয়েছে, তাদের বিদেশ গমনে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তবে এসব দেশের ক্ষেত্রে যাদের ভিজিট ভিসা আছে, কিন্তু বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স নেই, তারা অগ্রাধিকার পাবে না। ভিজিট ভিসা নিয়ে যেসব বাংলাদেশি কাজের উদ্দেশ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত যাবেন তারা বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে যেতে পারবেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, বিগত তিন দিন ধরে যেসব যাত্রী টিকিট কেনার পরও ‘লকডাউনের’ কারণে বিদেশ যেতে পারেননি, তাদের বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ন্যাশনাল ক্যারিয়ারের অতিরিক্ত বিশেষ ফ্লাইটের মাধ্যমে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।
যারা অগ্রাধিকার পাবেন : হঠাৎ ফ্লাইট ঘোষণায় আটকে পড়া প্রবাসীরা কিছুটা বিভ্রান্তিতে পড়েন। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র, বেবিচক ও এয়ারলাইন্স সূত্র জানিয়েছেটিকিট কাটা সত্ত্বেও লকডাউনের কারণে যারা কর্মস্থলে যোগ দিতে যেতে পারেননি, সেসব প্রবাসী কর্মীকে বিশেষ ফ্লাইটে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আন্তঃমন্ত্রণালয় এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স রয়েছে যেসব প্রবাসী কর্মীর তাদের এই পাঁচ দেশে যেতে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। যাদের এই কার্ড নেই, তারা অগ্রাধিকার পাবেন না। অবশ্য ভিসা বা আকামার মেয়াদের ওপর ভিত্তি করেও প্রবাসী কর্মীদের বিদেশ যেতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পতাকাবাহী এয়ারলাইন্সগুলোকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
যেসব রুটে ফ্লাইট চলাচল করবে : বিশেষ ফ্লাইটের অনুমোদনের পর আজ সকাল ৬টা থেকে আটটি আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট ঘোষণা করেছে বিমান। সৌদি আরবের রিয়াদ, দাম্মাম ও জেদ্দা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ও আবুধাবি, ওমানের মাস্কাট, কাতারের দোহা এবং সিংগাপুরে বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে। শনিবারের পরের নিয়মিত ফ্লাইটে যাদের টিকিট কাটা ছিল তাদের নির্ধারিত সময়ের ছয় ঘণ্টা আগে বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। শনিবার ভোরে সৌদি আরবের রিয়াদগামী বিশেষ ফ্লাইট বিজি ৫০৩৯ ভোর ৪টার পরিবর্তে ওই দিন সকাল সোয়া ৬টায় ছাড়বে।
বিমানবন্দরে পৌঁছতে যা লাগবে : হঠাৎ ফ্লাইট ঘোষণার পর বিমানবন্দরে আসার পথে বিদেশগামী কর্মীদের পাসপোর্ট, ভ্যালিড ভিসা, টিকিট, বিএমইটি কার্ড অথবা নিরাপত্তা এজেন্সি কর্তৃক ইস্যুকৃত পাস সঙ্গে রাখতে হবে। যথাযথ ডকুমেন্ট প্রদর্শন করতে পারলে পুলিশ কর্তৃপক্ষ দেশের বিভিন্ন পয়েন্টে ডকুমেন্টধারীদের অভ্যন্তরীণ চলাচলে যথাযথ সহযোগিতা প্রদান করবে। এছাড়াও ‘লকডাউন’ চলাকালে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার ও সিঙ্গাপুর ব্যতীত অন্যান্য দেশে যারা জরুরি প্রয়োজনে যেতে ইচ্ছুক তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র সাপেক্ষে ট্রানজিট-প্যাসেঞ্জার হিসেবে বিশেষ ফ্লাইটে ভ্রমণ করতে হবে। বর্তমান করোনা পরিস্থিতির মধ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিরা জরুরি প্রয়োজনে ১৪ দিনের বাধ্যতামূলক প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের শর্তে দেশে আসতে পারবেন। এক্ষেত্রে প্রত্যেক যাত্রীকে কভিড নেগেটিভ সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলকভাবে প্রদর্শন করতে হবে। দেশে ফিরতে চাওয়া প্রবাসী কর্মীদের তালিকা প্রস্তুত করবে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলো। বিদেশ থেকে ফেরত যাত্রীদের ১৪ দিনের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিতের জন্য সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ দিয়াবাড়ি, চট্টগ্রাম ও সিলেটে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে রাখবে। ৫টি দেশ থেকে যেসব যাত্রী দেশে আসবেন, তাদের বোর্ডিংয়ের আগেই কোয়ারেন্টাইনের জন্য নির্দিষ্ট হোটেলে বুকিং নিশ্চিত করতে হবে।
চার গন্তব্যে ইউএস বাংলা : দেশের বেসরকারি সবচেয়ে বৃহৎ এয়ারলাইন্স ইউএস বাংলা চারটি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করছে আজই। দুবাই, মাস্কাট, দোহা ও সিঙ্গাপুরে এসব ফ্লাইট পরিচালনা করবে এয়ারলাইন্সটি। সংস্থাটির জেনারেল ম্যানেজার কামরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানান, ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে বেবিচক নির্দেশিত সব ধরনের নির্দেশনা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা হবে। স্বাস্থ্য সতর্কতার অংশ হিসেবে সব ফ্লাইট পরিচালিত হবে ঢাকা থেকে। সব নির্দেশনা মেনে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স সপ্তাহে ঢাকা থেকে দুবাইয়ে ৯টি ফ্লাইট, ঢাকা থেকে মাস্কাটে ৭টি ফ্লাইট, ঢাকা থেকে দোহায় ৪টি ফ্লাইট এবং ঢাকা থেকে সিঙ্গাপুরে ১টি ফ্লাইট পরিচালনা করবে। সরকারের নির্দেশনায় সব আন্তর্জাতিক রুটের যাত্রীদের ভ্রমণের ৭২ ঘণ্টা আগে কভিড ১৯ এর নেগেটিভ সার্টিফিকেট সংগ্রহ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাডা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গন্তব্য থেকে যেসব যাত্রী দেশে আসবেন তাদের প্রত্যেককেই সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী নিজ খরচে প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা হোটেলে কোয়ারেন্টাইনে থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিটি রুটেই ইউএস-বাংলা এয়ারলইন্স ১৬৪ আসনের বোয়িং ৭৩৭-৮০০ এয়ারক্রাফট দিয়ে পরিচালিত হবে।
হঠাৎ ঘোষণায় বিপাকে : এদিকে বৃহস্পতিবার রাতেই বিভিন্ন ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়ায় শনিবার থেকে বিশেষ ফ্লাইট চালুর সংবাদ শুনে ‘লকডাউনের’ মধ্যেও নানান উপায়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকায় ছুটে এসেছেন। তবে ফ্লাইট নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় তাদের অনেকে করোনার নমুনা পরীক্ষা করাননি। তারা জানান, ফ্লাইট কনফার্ম হলে তারা বেসরকারি ল্যাবরেটরিতে জরুরিভাবে নমুনা পরীক্ষা করিয়ে নেবেন। কিন্তু তারা এয়ারলাইন্সের কাউকে পাচ্ছেন না। গতকাল সোনারগাঁও হোটেলে গিয়ে দেখা যায়, সাউদিয়া এয়ারের টিকিট আপডেট করতে ভিড় জমিয়েছেন বেশ কজন। তারা জানিয়েছেন, ‘লকডাউনের’ কারণে অনেকে ফ্লাইট মিস করতে পারেন। যাদের ফ্লাইট আগামীকাল বা পরশু হবে তারা ঢাকায় আসার চেষ্টা করছেন। অনেকে গাড়ি না পেয়ে কান্নাকাটি করছেন।
এই বিষয়ে বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাড়ি থেকে আসতে রাস্তায় পুলিশ যানবাহন আটকালে পাসপোর্ট দেখালে ছেড়ে দেবে। আমরা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে রেখেছি।’
