সরকার থেকে লাঠির বাড়ি ছাড়া আর কিছু পাই নাই। আমার পেটের ক্ষুধা আমাকে ঘর থেকে বের করে আর পুলিশ বাইর হয় লাঠি নিয়ে। আইজকা ১৫ তারিখ ভাড়ার জন্য চাপ দিতেছে বাড়িওয়ালা, কয়, হান্ডি-পাতিল নিয়া বাইর হন, এই সুখে আছি।’ বলছিলেন দূরপাল্লার পরিবহনচালক লিটন। শুধু লিটন নন, পরিবহন সংশ্লিষ্টদের অনেকেই মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। পকেটে টাকা নাই। বাসায় নাই চাল। কাজের ব্যস্ততা নাই। লকডাউনে দেশের সব গণপরিবহন বন্ধ থাকায় অসহায় অলস সময় পার করছেন পরিবহন শ্রমিকরা। দূরপাল্লা আর সিটি সার্ভিস সবারই এক দশা। গাড়ির চাকা ঘুরলেই ঘুরে তাদের জীবনের চাকা। প্রতিদিনের উপার্জনের টাকা দিয়েই চলত পুরো সংসার। গত বছরও করোনা পরিবহন সংশ্লিষ্টদের জীবনে ভয়ানক অভিজ্ঞতা নিয়ে হাজির হয়েছিল। ধারদেনা করে কোনোমতে সে যন্ত্রণায় বেঁচে গেলেও এবারের সমস্যা আরও তীব্র। গতবারের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই এবার আবারও এই সংকটে।
গতকাল শনিবার রাজধানীর বাস টার্মিনালগুলোতে গিয়ে কথা হয়পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে। প্রত্যেকেরই একই অবস্থা। তারা বলছেন, করোনাকে ভয় পেয়ে মারা যাব না; অর্ধাহারেই মারা যাব। করোনাভাইরাসের কঠোর সংক্রমণ ঠেকাতে ‘লকডাউন’ ঘোষণা করে গত ৫ থেকে ১১ এপ্রিল সাত দিন পর্যন্ত দেশজুড়ে সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। পরে ১৩ সিটি করপোরেশেন এলাকায় ৫০ শতাংশ সিট খালি রেখে বর্ধিত বাড়ায় বাস চালিয়েছে। ১৪ এপ্রিল থেকে সর্বাত্মক লকডাউন থাকায় বন্ধ সব গণপরিবহন।
গতকাল বেলা ১১টা। রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনাল। টার্মিনালজুড়ে নীরবতা। হাঁকডাক নেই। কয়েকশ গাড়ি শুধু দাঁড়িয়ে। গণপরিবহন শ্রমিকদেরও নেই কোনো ব্যস্ততা। উপস্থিতিও খুব একটা নেই। মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে বসে অলস সময় কাটাচ্ছেন পরিবহনচালক লিটন। করুণ সুরেই তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসলে পরিবহনের সঙ্গে আমরা যারা জড়িত তাদের সবাই গাড়ির চাকা ঘুরলে চলতে পারে। নাইলে না। একটা গাড়ি দিয়ে শুধু ড্রাইভার না, মহাজন চলে, মিস্ত্রি চলে, তাগো পরিবার চলে । না হইলেও ৩০ থেকে ৩৫ জন জড়িত। আমরা সবাই দিন আনি দিন খাই। একদিন আনলে খাইতে পারি। নাইলে না।’ গতবার লকডাউনে টার্মিনালের নেতাদের কাছ থেকে সহায়তা পেয়েছেন বলে জানান এই চালক। প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা উপার্জন ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন ১৫ দিন ধইরা এক টাকাও রোজগার নাই। ধারদেনা করে চলতেছি। আর পাঁচ দিন যদি বন্ধ থাকে তাহলে আমাদের তো কেউ ধারদেনাও দিব না। আমি কাজই করতে পারতেছি না। কে আমাকে ধার দিবে। কীভাবে মরতে চাইতেছি করোনার ভয়ে না ক্ষুধার জ¦ালায় সেই হিসেব করছি।’
এনা পরিবহনের চালক নেপাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে যে লকডাউন গেছে হেই সময়ে সরকার কোনো দিনও পরিবহন সেক্টরে জয়েন করে নাই। যখন লাইসেন্স করতে যাই তখন লাইসেন্সের বয়স শেষ। যদি লাগে ৩ হাজার ৫০০, সেখানে টাকা লাগবে ৬ হাজার। ইউনিয়ন শ্রমিক নেতারা মাঝেমধ্যেই সহায়তা করছেন। আজ পর্যন্ত ৫ টাকা কেউই দিল না। যখন আবার ধর্মঘট হবে তখন আবার হরতাল ধর্মঘটে গাড়ি চালাইতে হইব। কিন্তু আমাগো পেটের খোঁজ কেউ নিল না। তাড়াতাড়ি শ্রমিকরা গাড়ি চালাও সেইকালে কোনো ধর্মঘট নাই। বোম খাওনের কালে আমরা আছি, গাড়ি ভাঙলে আমরা আছি। সরকার কোনোদিন আমাগো কোনো খোঁজ নেয় নাই। খালি ভোটার আইডি কার্ড দেও এটা দেও বিকাশে টাকা দিবে কিন্তু কোনো টাকাই পাইলাম না। আগের ধাক্কা কিলিয়ার না হইতেই আবার লকডাউন আইলো।’
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে তো সরকার সাহায্য করবে। আমরা তো আমাদের মতো চেষ্টা করছি। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে আমরা শ্রমিকদের সাহায্য করছি। এখনো আমরা চেষ্টা করছি। কাল (আজ) মহাখালী বাস টার্মিনালে ১ হাজার ২০০ শ্রমিককে চাল-ডালসহ বিভিন্নরকম খাদ্য সহায়তা করা হবে।’
রাজধানীর বসিলায় চায়ের দোকানে বসে আলাপ করছেন প্রজাপতি পরিবহনের চালক চান মিয়া মাহাবুব। নিজের গাড়ির পাশেই বসে রয়েছেন। চিন্তার ছাপ তার চোখেমুখে। নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সকালে বাইর হইছি। বাসায় চাউল নাই। চাউল লইয়া যাইতে কইছে। কেমনে যে নিমু এখনো জানি না।’ তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কাজ করলে আমরা ভালো খাই। গাড়ি চললে ভালো খাইতে পারি। গাড়ি চালাইলে পয়সা আসে; বউ-বাচ্চা নিয়া ভালো একটা মাছ কিইনা নেতে পারি কাজ হইলে। যেদিন গাড়ি চালাইছি সেদিন কিছু টাকা বেতন পাইছি। মানুষ পাইতো তাগো দিছি। টাইমটা বাজছে, এমন টাইম ১০ তারিখ ঘর ভাড়া দিতে হয়। ১৩ তারিখ ঘর ভাড়া দিছি। এখন পকেটে এক টাকা নাই। লকডাউনে যে দেশের বাড়ি চলে যামু তার ওয়ে নাই, যাইতে হবে কাটা লাইনে চলে। তারপর একটা লোক যাইতে গেলে তিন হাজার টাকা লাগে। তা পামু কই?’
