হেফাজত ইসলাম, বাংলাদেশের একাধিক শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তার করার পর নতুন করে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। যে-কোনো ধরনের নাশকতারোধে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিশেষ করে সংগঠনের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হককে গ্রেপ্তারের পর আরও তৎপর হয়ে উঠেছে পুলিশ। ইতিমধ্যে চট্টগ্রামসহ দেশব্যাপী কওমি মাদ্রাসা এলাকায় পুলিশকে আরও কঠোর অবস্থানে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সারা দেশে থানা, ফাঁড়ি, তদন্ত কেন্দ্রের নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার করার পরিকল্পনা নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গতকাল পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সারা দেশের রেঞ্জ ও এসপি অফিসসহ পুলিশের সবকটি ইউনিট প্রধানকে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে। বার্তায় বলা হয়েছে, ডিসি, এসপি, জেলা জজের কার্যালয়সহ সকল স্থাপনার নিরাপত্তার নতুন ছক করতে হবে। নিরাপত্তা পরিকল্পনা কার্যকর করতে অতিরিক্ত ফোর্স কিংবা অস্ত্র ও গুলি চালানোর প্রয়োজন হলে তার চাহিদাপত্র দিতে হবে। ভারী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিলেও কোনোভাবেই হুটহাট গুলি করতে পারবে না। এমনকি ৮-১০ জন সদস্য ছাড়া টহল দিতে বারণ করা হয়েছে পুলিশের বার্তায়। একাধিক জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) গতকাল দেশ রূপান্তরকে সতর্ক অবস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, গতকাল সকালে সব জেলার এসপি ও রেঞ্জের ডিআইজিকে স্ব-স্ব জেলার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত সতর্ক অবস্থানে থাকতে বলা হয়েছে। কেউ যাতে কোনোভাবেই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে না পারে এবং মানুষ ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি না করতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বিনষ্টকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পুলিশকে এভাবেই কঠোর মনোভাবে থাকতে হবে। তাছাড়া তালিকাভুক্ত দেশের সবকটি মাদ্রাসাকে সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় রাখতে বলা হয়েছে। মাদ্রাসা থেকে কোনো মিছিল-মিটিং যাতে করতে না পারে সেইদিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রয়োজনে ছদ্মবেশে পুলিশ সদস্যদের মাদ্রাসায় অবস্থান করতে হবে। কেউ নাশকতা বা বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা করলে আগাম তথ্য দিতে হবে পুলিশের হাইকমান্ডকে।
জেলা পুলিশের একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেশ রূপান্তরকে জানান, আমরা ডিসি-এসপি-ইএনওর কার্যালয়সহ সরকারি স্থাপনার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করছি। যেসব জায়গায় নিরাপত্তা ঘাটতি রয়েছে, সেসব জায়গায় নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত ফোর্স দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে টহল বাড়ানো হয়েছে। থানা ফাঁড়ির নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চেক করছেন। তিনি আরও বলেন, আমরা স্থানীয়দের বোঝাচ্ছিআপনাদের নিরাপত্তার জন্যই থানা ও ফাঁড়ি করা হয়েছে। সেই থানা ফাঁড়ির ক্ষতি যারা করতে চায় তারা আসলে আপনাদের (স্থানীয় জনগণের) ক্ষতি করতে চায়। আমরা চেষ্টা করছি বুঝিয়ে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করতে। যাতে করে বাইরের কেউ থানায় আক্রমণ করলে স্থানীয় জনতাই তার প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় স্থানীয়দের সহযোগিতা নিচ্ছি। থানাগুলোতে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া থানা এলাকার মাদ্রাসা ও মসজিদগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের সব কওমি মাদ্রাসায় তালিকা এবং অবস্থানের ম্যাপ তৈরি করছে পুলিশ। কওমি মাদ্রাসা ও হেফাজতে ইসলামের ব্যাপারে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। স্থানীয়দের সঙ্গে পুলিশের সুসম্পর্ক তৈরি করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে জেলা পুলিশ সোস্যাল মিডিয়া মনিটর জোরদার করেছে। সোস্যাল মিডিয়াতে উসকানি দিয়ে এবং গুজব ছড়িয়ে থানা ফাঁড়িসহ বিভিন্ন সরকারি ও ধর্মীয় স্থাপনায় হামলার ঘটনা হওয়ায় সোস্যাল মিডিয়া উসকানি ও গুজব শনাক্ত করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডিএমপির আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সব সময় সতর্কভাবে দায়িত্ব পালন করছে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। মাওলানা মামুনুল হককে গ্রেপ্তারের ঘটনায় পুলিশ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। কেউ কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করলে কঠোরভাবে দমন করা হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এ বিষয়ে ঢাকা রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক হাবিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, শুধু ঢাকা বিভাগীয় নয় রাজধানীসহ দেশব্যাপী কোনো ধরনের নাশকতা যাতে কোনো অপশক্তি করতে না পারেসেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মামুনুল হকের গ্রেপ্তারের পর যাতে নতুন করে হেফাজতিরা কোনো ধরনের ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত না হতে পারে সেজন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ আদান-প্রদান করা হচ্ছে। একই কথা বলেছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়র হোসেন। তিনি বলেন, হেফাজতকে আর কোনো তা-ব চালাতে দেওয়া হবে না। তাদের কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে। তারা দেশের সম্পদ নষ্ট করছে। নাশকতাকারীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা গত ২৬ থেকে ২৮ মার্চ তিন দিনে শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেই ৫৮টি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করেছে। ভাঙচুর করা হয়েছে দুটি মন্দির। প্রেস ক্লাব ও স্থানীয় সরকারদলীয় নেতাদের বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও আগুন লাগানো হয়েছে। পুলিশ সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে সংগ্রহ করা ভিডিও ও ছবি থেকে হামলাকারীদের শনাক্ত করা হচ্ছে। নাশকতার বিভিন্ন অভিযোগে এই জেলাতে গতকাল পর্যন্ত তিনশ’র বেশি জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এছাড়া চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ সারা দেশে শতাধিক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সম্প্রতি হেফাজতের নেতাকর্মীরা হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দিয়ে ব্যাপক ক্ষতি করেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, গতকাল সকালে সব এসপি ও রেঞ্জের ডিআইজিকে স্ব-স্ব জেলার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত সতর্ক অবস্থানে থাকতে বলা হয়েছে। কেউ যাতে কোনোভাবেই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে না পারে, মানুষ ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি না করতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বিনষ্টকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ২০১৩ সালে হেফাজতের তা-বের মামলায় যেসব আসামি পলাতক রয়েছেন তাদের অচিরেই গ্রেপ্তার করা হবে। ডিএমপির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, ডিএমপির থানাগুলোতে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া থানা এলাকার মাদ্রাসা ও মসজিদগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলোতে যাতে কেউ জড়ো হতে না পারে সে বিষয়ে আমাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর আগে রবিবার দুপুরে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া মাদ্রাসা থেকে হেফাজত নেতা মামুনুল হককে গ্রেপ্তার করা হয়।
