আব্বাসের বহুজনবাদী রাজনীতি

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২১, ১১:১২ পিএম

পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার ফুরফুরা দরবার শরিফের পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকী। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে বর্তমানে তিনি সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তি। সব পরিচয় ছাপিয়ে পশ্চিম বাংলার মানুষের কাছে ভাইজান নামেই সমধিক পরিচিত হয়ে উঠেছেন। জাতপাত-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবার কাছে তিনি ‘ভাইজান’ বলেই পরিচিত। ভাইজান আব্বাস সিদ্দীকী একজন ধর্মীয় নেতা থেকে হয়ে উঠেছেন বহুজনবাদী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তার এই উত্থান কেবল ভারত নয় গোটা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতেই নতুন এক বার্তা দিচ্ছে। রাজনীতির গতানুগতিক সমীকরণ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। গত ২১ জানুয়ারি গঠন করেন ‘ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট’ (আইএসএফ) নামে একটি রাজনৈতিক দল।

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন সামনে রেখে নবগঠিত আইএসএফ বাম-কংগ্রেসের সঙ্গে মোর্চা তৈরি করেছেন এবং নির্বাচনের ৩২টি আসন সমঝোতা করে নিয়েছেন। বলে রাখা ভালো যে, আইএসএফ কোনো একক দল নয়। এটি একটি ফ্রন্ট। যেখানে আদিবাসী, দলিত, মতুয়া, হিন্দু, মুসলিম ও নিম্নবর্গের সব ধর্মের মানুষ যুক্ত হয়েছে। আইএসএফের সঙ্গে বামপন্থিদের কোনো জোট হয়নি। ভোট ভাগ হয়ে যাওয়া বন্ধ করতে নির্বাচন উপলক্ষে আসন সমঝোতা হয়েছে। এত সবকিছুর পেছনে রয়েছেন পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকী। ভারতের বিভিন্ন মিডিয়ায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি কলকাতার ব্রিগেডের ‘শান’ হিসেবে উল্লেখ করছে আব্বাস সিদ্দিকীকে। ব্রিগেডের জমায়াতের বড় একটা অংশ ছিল আইএসএফ কর্মী-সমর্থক। ব্রিগেড মঞ্চে প্রদত্ত তার বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠে আগামী দিনে আব্বাস সিদ্দিকীর রাজনৈতিক দিক ও গতি কেমন হতে পারে এবং তিনি কী হতে চাইছেন।

পীরজাদা আব্বাস সিদ্দীকী ধর্মতত্ত্বে উচ্চশিক্ষিত। ধর্মীয় জীবনযাপন করেন, নিয়মিত ধর্মীয় জলসা-মাহফিল করেন, তার ভক্ত ও মুরিদদের নানা বিষয়ে উপদেশ দেন। ২০১৫ সাল থেকে তিনি একটা অরাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তৈরি করে নানা সময় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বংশীয় সিলসিলায় একজন পীর। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য ধর্মগুরু কিংবা পীরদের মতো নন। তার বয়ান, জলসা-মাহফিল, ভক্ত ও মুরিদদের উপদেশ দান সবই প্রথাগত পীর-মুরিদির ধরন ও ধারণার চেয়ে ভিন্ন। তিনি জলসা-মাহফিলের তার ভক্ত ও মুরিদদের উদ্দেশে যে বক্তব্য দেন তাতে কেবল ‘পরকালের নাজাতের’ উপদেশই দেন না; তিনি সমকালীন সমাজ-পরিবেশ-রাজনীতি-অর্থনীতি নিয়ে এবং নিত্য ঘটমান নানা বিষয়ে উপদেশ দিয়ে থাকেন। তার বক্তব্যে উঠে আসে ভারতের বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের পিছিয়ে পড়া আদিবাসী, দলিত, মতুয়া, হিন্দু, মুসলিম ও নিম্নবিত্তের মানুষের কথা। তিনি মানুষের শিক্ষার কথা বলছেন, জীবিকার কথা বলছেন, চাকরির কথা বলছেন, চিকিৎসার কথা বলছেন তথা তার বক্তব্যে উঠে আসছে ‘মানুষের’ অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চিকিৎসা ও নাগরিক অধিকারের কথা। আব্বাস সিদ্দীকীর এই ‘মানুষ’ মূলত সংখ্যালঘিষ্ঠ সেসব ‘মানুষ’ যারা বিভক্তির রাজনীতির চাপে পড়ে বিভেদের শিকার হয়ে সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। তিনি এসব ‘মানুষ’কে নিজের অধিকার আদায়ের জন্য ঐক্যের ডাক দিয়ে তৈরি করেছেন আইএসএফ। দলের প্রধান হচ্ছেন শিমুল সরেন নামে একজন সাঁওতাল আদিবাসী। এই দলের হয়ে আব্বাস পিছিয়ে পড়া বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণ-জাতি-গোত্রের মানুষকে অধিকার আদায়ের জন্য ঐক্যের পথে আহ্বান করছেন আরেক বহুজনবাদী নিম্নবর্গের মানুষের অধিকার আদায়ের সর্বভারতীয় নেতা বাবা সাবেক আম্বেদকারের কথার উদ্ধৃতি দিয়ে ‘অধিকার কেউ দেয় না, ছিনিয়ে নিতে হয়।’

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার ভোটের প্রচারণার বাম-কংগ্রেস-আইএসএফের সংযুক্ত মোর্চার প্রচারণার প্রাণশক্তি এখন পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকী। তার বক্তব্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে শক্তি সঞ্চার করছে। প্রচারণায় আব্বাস সিদ্দিকীর বক্তব্য ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশেষত নিম্নবিত্তের মানুষের মধ্যে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। ব্রিগেডে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন কারও দয়া নয় ‘ভাগীদারি বুঝে নিতে’ এসেছেন। তার এই ভাগীদারির হিসাবের মধ্যে আছে গোটা পশ্চিমবঙ্গের নিম্নবর্গের মানুষের হিসাব। গত ২৪ জানুয়ারি তিনি অশোকনগরে আদিবাসীদের এক সমাবেশে আদিবাসী, মতুয়া, দলিত, নিম্নবর্গের হিন্দু ও মুসলিমদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আপনাদের অধিকার আদায়ের জন্য নেতা আপনাদেরই হতে হবে। আপনারা এগিয়ে আসুন ভাইজান আপনাদের পাশে থাকবেন।’ তার এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট যে তিনি আসলে কাদের ভাগীদারি চাচ্ছেন। ব্রিগেডের ভাষণে সিদ্দিকী স্পষ্টতই জানিয়েছেন তিনি নেতা হতে নয়, নেতা বানাতে এসেছেন। তিনি রাজনীতিতে কিংমেকার হতে চান। তার এই কিংমেকার হওয়ার স্বপ্ন তাদের নিয়ে যাদের ভাগীদারি তিনি বুঝে নিতে চাইছেন। যারা কেবল কলকাতা নয়, পুরো ভারতবর্ষেই সংখ্যাগুরু। ফলে পীরাজাদা আব্বাস সিদ্দিকী যে আগামী দিনে কেবল পশ্চিমবঙ্গ নয়, পুরো ভারতের রাজনীতিতেই বড় ‘ফ্যাক্টর’ হতে যাচ্ছেন সেটা স্পষ্ট।

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচনী প্রচারণায় আব্বাস সিদ্দিকী যে বক্তব্য রাখছেন তা রীতিমতো বিস্ময়ের উদ্রেক করছে। কারণ আমরা যে ধর্মীয় গুরু কিংবা আলেম-উলামা-পীরদের দেখি তারা মূলত আধ্যাত্মিক জগতের মানুষ। তাদের আচরণ, কথা বলা সবই হয়ে থাকে নিজস্ব ঘরানার। আব্বাস সিদ্দিকী পীর-মুরিদের প্রথাগত ধরন এবং আমাদের এই গতানুগতিক ধারণায় ছেদ ঘটিয়েছেন। তিনি মানুষের জন্য কথা বলছেন মানুষের ভাষায়। গত ২১ জানুয়ারির পর তিনি যতগুলো ভাষণ দিয়েছেন, নির্বাচনী প্রচারণায় গিয়েছেন, বক্তব্য রাখছেন কোথাও তাকে একবারের জন্যও পীরজাদা কিংবা ধর্মগুরু বলে মনে হচ্ছে না। বক্তব্যে সেই ধরনের কিছু বলছেন না। তার বক্তব্যের মূলে রয়েছে গরিব, অসহায়, কৃষক, শ্রমিক, খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের কথা। মানুষ তার বক্তব্য গিলে খাচ্ছেন। এমনকি আগে বিভিন্ন জলসা, ওয়াজ-মাহফিলে যে ধরনের বক্তব্য দিতেন এবং যেগুলো নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে তিনি সেগুলো থেকেও সরে এসেছেন এবং তার জন্য দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাইছেন। গত ১৩ মার্চ ভারতীয় টিভি চ্যানেল এবিপি আনন্দকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্টতই বলেছেন, ‘আগের আব্বাস সিদ্দিকী এবং ২০২১ সালের ২১ জানুয়ারির পরের আব্বাস সিদ্দিকী এক নয়।’

বাংলার বহুজনবাদী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন বরিশালের যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল। যিনি যোগেন মণ্ডল নামেই পরিচিত। যোগেন মণ্ডল জোট করেছিলেন মুসলিম লীগের সঙ্গে। কারণ বাংলায় কংগ্রেসের চেয়ে মুসলিম লীগ শক্তিশালী এবং মুসলিমরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। তিনি মনে করতেন বাংলার তফসিলি সম্প্রদায়ের ঐক্য তাদের সঙ্গেই হবে যাদের জমির সঙ্গে তাদের জমির আইল রয়েছে। তাই তিনি কংগ্রেসের বদলে জোট করেছিলেন মুসলিম লীগের সঙ্গে। বহুজনবাদী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল যেমন জমির আইল দিয়ে জোট ও ঐক্যের চিন্তা করেছেন, আব্বাস সিদ্দিকীও মনে করেন ঐক্যের প্রতীক ধর্ম নয়; ধর্মভিত্তিক রাজনীতিও কখনো হতে পারে না। তিনি দারিদ্র্য-বঞ্চনা মুক্তি, শিক্ষার অধিকার লাভ, বেকারের কর্মসংস্থান, অসুস্থের জন্য সঠিক চিকিৎসা, আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার আদায়ের লড়ায়ে ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়ের ভেদ মানছেন না। তার ঐক্যের প্রতীক ‘আমরা ভারতীয়, আমরা গর্বিত’, ‘ভিক্ষা নয়, অধিকার চাই’। জনসভা, নির্বাচনী প্রচারণা ও গণসংযোগে জনতাকে ওই সেøাগানের মাধ্যমেই ঐক্যের পথে ডাকছেন। ‘জয় শ্রী রাম’ কিংবা ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’ তার কাছে ঐক্যের প্রতীক নয়। বক্তব্যে তিনি বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ধর্ম ব্যবহার নীতির’ রাজনীতিকে মোকাবিলা করার ডাক দিচ্ছেন। ধর্মকে ব্যবহার করে মানুষের মধ্যে বিভাজনের বিরুদ্ধেও তার অবস্থান কঠোর। তিনি বক্তব্য শুরু করছেন নম্র-শূদ্রের অধিকার আদায়ের আজীবন লড়াকু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ভারতের সংবিধানের অন্যতম রচয়িতা বাবা সাবেক আম্বেদকারের উদ্ধৃতি দিয়ে। তাই প্রথাগত রাজনৈতিক ছকে ফেলে আব্বাস সিদ্দিকীকে মাপা ভুল হবে। ধর্ম-পরিচয় দিয়ে কিংবা পীরজাদা হিসেবে বিবেচনা করে ভাইজানের রাজনৈতিক সমীকরণ টানাও ভুল হবে।

ফুরফুরা শরীফের পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকী মাত্র আড়াই মাস হলো রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। এরই মধ্যে তিনি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। তার জনসভা ও নির্বাচনী প্রচারণা লোকারণ্যে পরিণত হচ্ছে। তিনি আদিবাসী, দলিত, নম্র-শূদ্র, মতুয়া, হিন্দু, মুসলিম ও নিম্নবর্গের সব মানুষের কাছে তিনি তাদের প্রিয় ভাইজানে পরিণত হয়েছেন। আব্বাস সিদ্দিকী যে লক্ষ্য সামনে রেখে, যে আদর্শ ও পদ্ধতিতে রাজনীতিতে এসেছেন এবং মানুষের কাছে যে প্রতিশ্রুতি তিনি করছেন যদি সেটা ‘ড্রামা’ না হয় আর তিনি যদি আদর্শচ্যুত না হন তাহলে আগামী দিনে কেবল পশ্চিমবঙ্গ নয় ভারতবর্ষের রাজনীতিতে তিনি কিংমেকার হয়ে উঠবেন। পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে সেটা দেখার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে এবং তিনি রাজনীতির কিংমেকার হতে পারবেন না কি কারও দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছেন সেটাও সময়ই বলে দেবে।

লেখক : সাংবাদিক

 sadikiu [email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত