মসজিদে নববির খুতবা

আত্মপর্যালোচনায় বাড়ে ইবাদতের আগ্রহ

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২১, ১২:১৬ এএম

গত শুক্রবার মদিনার মসজিদে নববিতে জুমার ইমামতি করেন শায়খ ড. আলী বিন আবদুর রহমান হুজায়ফি। জুমাপূর্ব খুতবায় তিনি কোরআনের মর্যাদা, আত্মপর্যালোচনার গুরুত্ব, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উপায় এবং ইবাদতে আগ্রহ সৃষ্টির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ খুতবা দেন। খুতবার চুম্বুকাংশ অনুবাদ করেছেন-মুহাম্মদ আতিকুর রহমান আল্লাহভীতি অবলম্বন এবং তার সন্তুষ্টিমূলক আমল বেশি বেশি করাই রমজানের শিক্ষা। এর মাধ্যমে মুত্তাকিরা সফল হয় এবং অপরাধীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আত্মপর্যালোচনা করা, ইবাদতে উদ্যমী হওয়া, বেশি করে সৎকাজ করা, যে সব সৎ আমলের সুযোগ আল্লাহ দিয়েছেন তা পালন এবং সৎ আমলসমূহকে বিনষ্টকারী যাবতীয় বিষয় থেকে বিরত থাকাতেই রয়েছে ইহকালীন ও পরকালীন জীবনের প্রকৃত সফলতা ও সুখ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করে এবং কুপ্রবৃত্তি হতে নিজেকে বিরত রাখে; জান্নাতই হবে তার আবাস।’ সুরা আন নাযিয়াত : ৪০-৪১

কোরআনে কারিমে আরও ইরশাদ হচ্ছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসুলের আনুগত্য করো। আর তোমরা তোমাদের আমলসমূহ বিনষ্ট করো না।’ সুরা মুহাম্মদ : ৩৩

উল্লিখিত আয়াত ছাড়াও আল্লাহ বলছেন, ‘প্রত্যেকের চিন্তা করে দেখা উচিত আগামীকালের জন্য সে কী অগ্রিম পাঠিয়েছে’। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘চূড়ান্ত হিসাবের সম্মুখীন হওয়ার আগে তোমরা নিজেরা নিজেদের হিসাব গ্রহণ করো, আর চিন্তা করে দেখো যে, পুনরুত্থান দিবস এবং রবের সামনে সমবেত হওয়ার সময়ের জন্য কী কী সৎ আমল করেছো।’

সাহাবি হজরত শাদ্দাদ বিন আউস (রা.) হতে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের জন্য আমল করে। আর নির্বোধ ও অক্ষম সেই ব্যক্তি যে নিজের নফসকে প্রবৃত্তির অনুকূলে পরিচালিত করে আর আল্লাহর কাছে বৃথা আশা পোষণ করে।’ তিরমিজি

নফসকে নিয়ন্ত্রণ ও আত্মপর্যালোচনা করতে হবে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কর্মের গোনাহ থেকে তওবা, আমল বিনষ্টকারী বস্তুসমূহ বর্জন করে সৎ আমল সম্পাদন এবং বেশি বেশি কল্যাণমূলক কাজের মাধ্যমে। পক্ষান্তরে প্রবৃত্তির অনুসরণ, অবৈধ কৃতকর্ম, সৎকাজ পরিত্যাগ এবং সৎ আমল বিনষ্টকারী বিষয়ে জড়িত হওয়ায় রয়েছে প্রভূত ক্ষতি। বস্তুত কোনো ব্যক্তির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে এমন কিছু করছে যার কারণে তার নেক আমলের সওয়াব কমছে।

রাত, দিন ও বছরসমূহ দ্রুত অতিবাহিত হচ্ছে, যে দিনটি গত হচ্ছে তা আর কখনো ফিরে আসবে না। জীবন ও আয়ু তো কয়েকটি দিন ও রাতের সমন্বয় মাত্র। সুতরাং আয়ু ফুরানো এবং কর্মচঞ্চলতার অবসান ঘটার আগে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এখন রমজান মাস চলছে, এ মাসে আল্লাহ মানুষের জন্য কল্যাণের সব দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, ভালো কাজের উপকরণসমূহ সহজ করে দিয়েছেন। অতএব রহমতের দরজা দিয়ে তাতে প্রবেশ করুন এবং ধ্বংসাত্মক ও ক্ষতিকর পন্থাসমূহ পরিহার করুন। ইমান ও কোরআনের নেয়ামতকে সম্মান করুন। যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রোজা পালন করে, সে ইমানের সুবাস ও কোরআনের বরকত লাভ করে। কোরআনওয়ালা ব্যক্তি তারাই, যারা তার ওপর আমল করে। আর যে কোরআনের ওপর আমল করে না, সে কোরআনওয়ালা হতে পারে না যদিও সে কোরআনের হাফেজ কিংবা অনেক বড় আলেম হয়। সুতরাং বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করুন এবং উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন। এর মাধ্যমে মন্দ কাজের ইচ্ছা কমে, ভালো কাজের আগ্রহ জন্মায় এবং মনে শয়তানের প্রভাব খর্ব হয়।

কোরআনে কারিমে যা এসেছে তাই মহাসত্য ও বাস্তবসম্মত। কোরআন হচ্ছে এই উম্মতের শক্তি, অস্তিত্ব ও মর্যাদা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই এ কোরআন এমন একটি পথ দেখায় যা সবচেয়ে সরল-সুদৃঢ় এবং সৎকর্মশীল মুমিনদের সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার।’ সুরা বনী ইসরায়েল : ৯

রমজানে নফসের হিসাব গ্রহণ করুন, যেন কিয়ামতের দিন আপনার হিসাব সহজ হয়। আত্মার পরিশুদ্ধি অর্জিত হয় এবং কিয়ামতের দিন কল্যাণকর প্রতিদান মেলে। আপনি আপনার আত্মাকে জিজ্ঞেস করুন, যেভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সেভাবে নামাজ আদায় করছে কি? রোজার পাশাপাশি জাকাত আদায় করছে কি? গোনাহ থেকে আল্লাহর কাছে তওবা করেছে কি? সুদ, ঘুষ, হারাম লেনদেন ও উপার্জন থেকে তওবা করেছে কি? আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রেখেছে কি? পিতা-মাতার সেবাযতœ ও খোঁজখবর নিয়েছে কি? মানুষকে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করেছে কি? হেদায়াতপ্রাপ্তদের মতো হওয়ার জন্য নবীর আদর্শ গ্রহণের চেষ্টা করেছে কি? অভাবগ্রস্তদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে কি? আপনি রোজা, কিন্তু আপনার চোখ কান জিহ্বা ও অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো কি হারাম থেকে রোজা রাখছে? পরনিন্দা, মিথ্যা ইত্যাদি কি বন্ধ হয়েছে?

আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো এবং সঠিক কথা বলো। তাহলে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের কাজগুলোকে সংশোধন করে দেবেন এবং তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।’ সুরা আহজাব : ৭০-৭১

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত