ব্যাংকার মোর্শেদের পরিবারের সংবাদ সম্মেলন

হুইপপুত্র শারুনকে দোষারোপ প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার দাবি

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২১, ০২:৩৬ এএম

চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত ব্যাংকার আবদুল মোর্শেদ চৌধুরীর মৃত্যুর জন্য শারুন চৌধুরী ও তার সহযোগীদের দায়ী করে বিচার দাবি করেছে তার পরিবার। গতকাল মোর্শেদ চৌধুরীর স্ত্রী ইসরাত জাহান চৌধুরী ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিচার দাবি করেন।

তিনি বলেন, ‘শারুন চৌধুরী ফোন করে আমার স্বামীকে র‌্যাডিসন হোটেলে দেখা করতে যেতে বলে। আমার স্বামী এতে রাজি না হলে সে বলে “তাহলে আমি আসছি।” এরপর আমাদের বাসায় পারভেজ আর জাবেদ এসে যখন হামলা চালায়, তখন শারুন ও বাচ্চু ছিল। তারা গাড়িতে বসেছিল। শারুন অব্যাহতভাবে হুমকি দিচ্ছে। আবার তার নাম করে পারভেজ হুমকি দেয়। আমার স্বামীর মৃত্যুর পরও আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমরা অজানা আতঙ্কে দিন পার করছি। অথচ আমরা কার কাছে নিরাপত্তা পাব। আমাদের নিরাপত্তা কে দেবে? তিনি বলেন, এ ঘটনার সঠিক তদন্ত হলে এবং প্রকৃত আসামিদের ধরা হলে তদন্তে বেরিয়ে আসবে আমার স্বামীর মৃত্যুর জন্য কারা দায়ী এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত।’

ইশরাত জাহান চৌধুরী গতকাল স্বামীর মৃত্যুর জন্য শারুন চৌধুরী, চিটাগাং চেম্বারের সাবেক পরিচালক জাবেদ ইকবাল, তার ভাই পারভেজ ইকবাল, নাইমউদ্দিন সাকিব, যুবলীগ নেতা শহীদুল হক চৌধুরী রাসেল ও সাবেক ছাত্রনেতা আরশাদুল আলম বাচ্চুকে দায়ী করে তাদের বিচার দাবি করেন।

ইশরাত বলেন, মোর্শেদ ব্যবসার জন্য ২৫ কোটি টাকা নিলেও লভ্যাংশসহ ৩৫ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। এরপরও চক্রটি জোরপূর্বক অলিখিত চেক ও স্ট্যাম্পে সই নিয়ে আরও ১২ কোটি টাকা দাবি করে। তারা টাকার জন্য নানাভাবে হুমকি দেয় এবং ফ্ল্যাটে হামলা চালায়। অব্যাহত চাপে অতিষ্ঠ হয়ে মোর্শেদ পরিবার নিয়ে দেশত্যাগ করতে চায়। পরিবারের সবার পাসপোর্ট কেড়ে নেয় চক্রটি। পুলিশের কাছে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার হয়নি। উল্টো পুলিশের সমঝোতায় অব্যাহত চাপ আরও বাড়ে। চার বছর ধরে এমন চাপে দিশেহারা হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় মোর্শেদ। ঘটনায় মামলার পরও পুলিশ প্রভাবশালীদের গ্রেপ্তার করছে না।

সংবাদ সম্মেলনে মোর্শেদ চৌধুরীর বৃদ্ধা মা নূর নাহার বেগম ও শিশুকন্যা মোবাশ্বিরা জাহান চৌধুরী জুম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এ মৃত্যুর বিচার দাবি করেছেন।

মোর্শেদ চৌধুরীর স্ত্রী ইশরাত জাহান চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমার স্বামীর আত্মহত্যার আড়াই সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও কোনো এক অদৃশ্য কারণে সম্পূর্ণ তথ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও অপরাধী ও অভিযুক্তরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। অথচ তারা বিভিন্নভাবে আমাকে ও পরিবারকে চাপের মুখে রেখেছে। আমি যেকোনো মুহূর্তে শারুন চৌধুরী গংদের দ্বারা জীবন ও সম্পদহানির আশঙ্কা করছি।’

ইশরাত জানান, গত ৮ এপ্রিল তিনি চারজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও সাত-আটজনকে আসামি করে মামলা করেন। চারজন হলেন চিটাগাং চেম্বারের সাবেক পরিচালক জাবেদ ইকবাল, তার ভাই পারভেজ ইকবাল এবং নাঈম উদ্দিন সাকিব ও যুবলীগ নেতা শহীদুল হক চৌধুরী রাসেল। ইশরাত চৌধুরী বলেন, ‘শারুন চৌধুরী আমার স্বামী মোর্শেদ চৌধুরীকে একদিন ফোন করে র‌্যাডিসন হোটেলে দেখা করতে বলে। আমার স্বামী তাতে আপত্তি করে বলেছিল “আপনার সঙ্গে তো আমার কোনো ব্যবসায়িক লেনদেন নেই তাহলে কেন দেখা করতে বলছেন।” তখন শারুন চৌধুরী রাগান্বিত হয়ে আমার স্বামীকে হুমকি দিয়ে বলে, “লেনদেন নেই, এখন হবে। আপনি না আসলে আপনি কোথায় আছেন বলেন, আমি সেখানে আসছি।”’ তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘২০১৯ সালের মে মাসে শারুন চৌধুরী আরও ১০-১২ জন যুবককে সঙ্গে করে আমাদের বাসায় গিয়েছিল। পারভেজ ও জাবেদ ওপরে উঠে দরজা ভাঙে। নিচে গাড়িতে বসেছিল শারুন ও বাচ্চু। নিচের লোকজন দারোয়ানকে বলেছে গাড়িতে শারুন-বাচ্চু বসে আছেন। তারা যেন কথা না বলে। বাসায় হামলা হয়েছিল শারুন চৌধুরীর নির্দেশেই।’

সংবাদ সম্মেলনে ইশরাত প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘আমার স্বামী মোর্শেদ চৌধুরীর আত্মহত্যার নেপথ্যে থাকা শারুন চৌধুরীকে বাঁচাতেই কি আসামিদের ধরা হচ্ছে না? আমি বিচারের দাবি নিয়ে এই কভিড মহামারীর মধ্যেও চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছি। আমি অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’

সংবাদ সম্মেলনে মোর্শেদ চৌধুরীর মা নুর নাহার বলেন, ‘আমি আমার চার ছেলেমেয়েকে বড় কষ্ট করে মানুষ করেছি। আমার দুই ছেলের সুখী ও সাজানো পরিবার ছিল। ওদের কারণে আমার ছেলেটা মরে গেল। আরেক ছেলেও মানসিক কষ্টে রয়েছে। আমি আমার ছেলের মৃত্যু জন্য যারা দায়ী তাদের বিচার চাই।’

মোর্শেদের শিশুকন্যা মোবাশ্বিরা জাহান চৌধুরী জুম বলে, ‘আমার পাপা ছিল আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। আমার পাপাকে ভয়াবহ মানসিক নির্যাতন করা হয়েছিল। যার কারণে আমার পাপা আত্মহত্যা করেছে। আমি এর বিচার চাই। এ বিচারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাই।’

প্রসঙ্গত, শারুন চৌধুরীসহ আসামিদের অব্যাহত চাপ, হুমকি ও হামলার কারণে নিরুপায় হয়ে ব্যাংকার আবদুল মোর্শেদ চৌধুরী গত ৭ এপ্রিল আত্মহত্যা করেন। বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রামে তোলপাড় চলছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত