ইন্দো-প্যাসিফিক কূটনীতি ও বাংলাদেশ

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২১, ১১:০৪ পিএম

সাম্প্রতিক সময়ে ইন্দো-প্যাসিফিক সহযোগিতা নিয়ে বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো বেশ সক্রিয়। যদিও কূটনৈতিক মহলে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত সহযোগিতার আলোচনাটি খুব পুরনো নয়। মূলত ইন্দো-প্যাসিফিক এই শব্দটি সবার আগে ব্যবহার করেন ভারতীয় ঐতিহাসিক কলিদাস নাগ, ১৯৪১ সালে তার বিখ্যাত ইন্ডিয়া ও প্যাসিফিক ওয়ার্ল্ড বইতে। তিনি এর দ্বারা সংস্কৃতি ও সভ্যতার মেলবন্ধন ও সমুদ্রপথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতের যোগাযোগের ঐতিহ্য ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। অ্যাকাডেমিক মহলেও ইন্ডিয়া-প্যাসিফিক শব্দটি নতুন। ২০০৭ সালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ভারত ভ্রমণে আসেন তখন ভারতীয় পার্লামেন্টে তার বক্তৃতার সময় ইন্দো-প্যাসেফিক সহযোগিতার বিষয়টি ব্যবহার করেন মূলত জাপান ও ভারতের সম্পর্ক স্থাপনের জায়গা থেকে। যদিও পরে সার্বিকভাবে এর দ্বারা মূলত ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের সম্মিলন এবং এর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে সবার সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। 

সাম্প্রতিক সময়ে এশিয়া ও বিশ্বব্যাপী ক্ষমতার বলয়ে চীনের প্রবেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই কৌশলকে মোক্ষম বলে মনে করছে। বলা যেতে পারে, এটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের একটি জবাব। অনেকের মতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মঞ্চে চীনের আগ্রাসী ভূমিকা বন্ধের জন্য এখনই আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর যৌথ কৌশলগত ভূমিকা গ্রহণ করা দরকার।

অন্যদিকে ইন্দো-প্যাসিফিক শব্দটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে এশিয়া অঞ্চলের উত্থানকেই নির্দেশ করে। বর্তমান বিশ্বে চীন ও ভারত উভয়েরই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কৌশলগত গুরুত্ব আছে এবং এদের নিয়ে আগ্রহ আছে পশ্চিমা দেশগুলোর। এই আগ্রহের পেছনে মূল কারণ কী তাও সহজেই বোঝা যায়, যতটা ভারত বা চীনের স্বার্থ তার থেকে বেশি নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষা। এজন্য সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত জোট নিয়ে কূটনৈতিক অঙ্গনে বেশি সক্রিয় হতে দেখা যায়। যদিও ওবামা প্রশাসন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলের প্রথম দিকে আমেরিকার কাছে প্যাসিফিক অঞ্চল অতটা গুরুত্ব না পেলেও চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতা তাদের আবার এই কূটনীতির ময়দানে নিয়ে এসেছে এক্ষেত্রে তাদের প্রধান সহযোগী ভারত এবং অন্যদের মধ্যে জাপান ও অস্ট্রেলিয়া। এই চার দেশকে নিয়ে ইতিমধ্যে কোয়াড্রিল্যাটেরাল সিকিউরিটি ডায়লগ বা কোয়াড জোট গঠন করা হয়েছে। জাপান ও ভারতের নৈকট্যটা খুব সহজেই বোঝা যায়। উভয় দেশই চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক উত্থানে ভীত। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের সিংহাসন হারানোর ভয়। আর অস্ট্রেলিয়ার কাছে এটি নিজের কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের গুরুত্বকে আরও একটু বাড়িয়ে নেওয়া। যদিও কোয়াড জোটে এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশ যেমন দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো কিছুটা কম গুরুত্ব পেয়েছে তথাপি চীনকে একঘরে করে ফেলার প্রচেষ্টায় ইন্দো-প্যাসিফিক প্রচেষ্টায় ছোট ছোট দেশগুলোর কদর কিছুটা হলেও বেড়েছে। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় ইন্দো-প্যাসিফিক জোটের নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর এলাকায় নিজেদের অবস্থান যেভাবে বাড়াবে পাশাপাশি আশা করবে তার মিত্র দেশগুলো তার এই প্রচেষ্টায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিক। বর্তমানে আটলান্টিক অঞ্চলে তারা ন্যাটো জোটের মাধ্যমে যেটা করে থাকে। যদিও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ন্যাটো জোটের গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমবে বলেই মনে হয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে তার প্রশান্ত মহাসাগরের অঞ্চল হাওয়াই-ভিত্তিক সামরিক কমান্ডের নাম পরিবর্তন করে ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড হিসেবে পুনঃনামকরণ করেছে। নামকরণ পরিবর্তনের মাধ্যমে এই জোটের সামরিক আত্মপ্রকাশ আরও বেশি স্পষ্ট হলো। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারে চীন সমর্থিত সামরিক অভ্যুত্থ্যানের কারণে ইন্দো-প্যাসিফিক জোটের সামরিক কার্যক্রম ও গুরুত্ব আরও বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এই জোটের মাধ্যমে এশিয়ার এই অঞ্চলের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি অর্থনৈতিক কর্মকা- থেকে সামরিক দিকে বেশি মনোযোগ দিতে পারে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সামরিক উপস্থিতি আরও বেড়ে যেতে পারে। শুধু তাই নয়, এই অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘমেয়াদি ছায়া যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে, যেমনটা হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। ইসরাইলকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে যে সংঘাত টিকিয়ে রাখা হয়েছে দশকের পর দশক যার ভুক্তভোগী সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের জনগণ। সামগ্রিকভাবে ইন্দো-প্যাসেফিক জোটের কারণে এশিয়ার সার্বিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃবাণিজ্যিক সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বর্তমান বিশ্বে এশিয়া কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক জাগরণ এবং পারস্পরিক বাণিজ্যের মাধ্যমে এই অঞ্চলের জনগণ যে অর্থনেতিক সুফল পাওয়া শুরু করেছিল তা ব্যাহত হতে পারে এবং এর চূড়ান্ত ফলাফল হতে পারে এশিয়ার সম্ভাবনার অপমৃত্যু।

একথা আমাদের মনে রাখতে হবে, এশিয়ায় চীন ও ভারত উভয় দেশই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময়। এই দুই দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা- ও অর্থনৈতিক চাঞ্চল্যের সুফল শুধু দুই দেশের আড়াইশ কোটিরও বেশি জনগণ না অধিকন্তু এর সুফল কোনো না কোনোভাবে ভোগ করে এই অঞ্চলের সব মানুষ। এখানে উল্লেখ্য, কোয়াড দেশগুলোর তিনটি দেশই উন্নত বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত, শুধুমাত্র ভারত উন্নয়নশীল দেশের কাতারে, যার নিজের রয়েছে হাজারো আর্থ-সামাজিক সমস্যা। ভারতীয় বর্তমান জাতীয়তাবাদী নেতারা সম্ভবত এই বিষয়টি এখনো নিজেদের বিশ্লেষণে আনতে পারছে বলে মনে হয় না। আজ যে কৌশলগত জোট চীনকে বিরোধিতা করে কৌশল প্রণয়ন করছে তা ভবিষ্যতে যে ভারতকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হবে না তার নিশ্চয়তা বিশ্ব রাজনীতির কোনো রথি-মহারথিই দিতে পারবেন বলে মনে হয় না। আপাতদৃষ্টিতে এই জোটের মাধ্যমে ভারতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করা হলেও আসলে এটা এক ঢিলে দুই পাখি শিকারের মতো অবস্থা হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশের ইন্দো-প্যাসিফিক জোটের অংশ হওয়া উচিত কি না তা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাইডেন প্রশাসন আসার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন, সেখানে তাকে বাংলাদেশ এই জোটের অংশ হবে কি না তা নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। অন্যদিকে অনেকে ইন্দো-প্যাসিফিক জোটের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে মার্কিন কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা বলছেন। এটা সত্যি যে, এখন মার্কিন কোম্পানিগুলোর পক্ষে চীনে বিনিয়োগ ও ব্যবসা করা কিছুটা দুরূহ হয়েছে। বাণিজ্যের স্বার্থে তাদের নতুন গন্তব্যে যেতেই হবে সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারতের মতো জনবহুল দেশগুলো একটি ভালো বিকল্প। কিন্তু বাণিজ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যে রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে হবে তা নিয়ে এখনই প্রস্তুতির সময়। এখনই, কারণ বিষয়টি যে খুব সহসাই শেষ হচ্ছে বলে আপাতত মনে হচ্ছে না।

লেখক : উন্নয়নকর্মী

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত