মামুনুল ২০০৫ সালে ৪০ দিন পাকিস্তানে ছিলেন

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২১, ০৫:২৯ এএম

হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগরের সাধারণ সম্পাদক মামুনুল হক ২০০৫ সালে ৪০ দিন পাকিস্তানে ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। সেখান থেকে উগ্রবাদী মতাদর্শ নিয়ে দেশে ফেরেন তিনি। তিনি রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে পাকিস্তানের একটি রাজনৈতিক দলকে মডেল হিসেবে নেন। উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করেন। ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের ‘আবেগ দিয়ে প্রতারণা’ করে হেফাজতে ইসলামকে ক্ষমতা দখলের সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার চেষ্টা করেন মামুনুল। এজন্য কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার পাঁয়তারা করেন এবং সরকার উৎখাতের জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। তার লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক বড় পদবি ও ক্ষমতা দখল করা।

গতকাল রবিবার নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হারুন-অর-রশীদ। তিনি মামুনুলকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে বলেন, মামুনুল তার ভগ্নিপতি নিয়ামত উল্লাহর মাধ্যমে পাকিস্তানি জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেন। পাকিস্তানি জঙ্গিগোষ্ঠী, গ্রেনেড হামলার আসামি এবং জামায়াতের শীর্ষ দুই নেতার সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের ব্যবহার করে সরকার উৎখাতের ছক আঁকেন তিনি।

গত ১৮ এপ্রিল মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা থেকে মামুনুল হককে গ্রেপ্তার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেপ্তারের পরদিন মোহাম্মদপুর থানায় ২০২০ সালে করা মোবাইল ও মানিব্যাগ চুরি ও মারধরের হুকুমের মামলায় আসামি হিসেবে মামুনুলকে সাত দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ।

হারুন বলেন, মামুনুলের কাছে কাতার, দুবাই, পাকিস্তান থেকে নিয়মিত টাকা আসত। ভারতের অযোধ্যায় ভেঙে দেওয়া বাবরি মসজিদ আন্দোলনের নামেও টাকা আনতেন। এতে ধর্মীয় আবেগ কাজে লাগানো যাবে, অন্যদিকে ভারতবিদ্বেষীরাও বেশি করে সম্পৃক্ত হবেন বলে ধারণা ছিল তার। এভাবেও তিনি পেয়েছেন কোটি কোটি টাকা। মামুনুল হকের একটি মোবাইল জব্দ করা হলে সেখান থেকে এসব তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ডিসি হারুন।

তিনি বলেন, ‘মামুনুল হকের আপন ভগ্নিপতি মুফতি নিয়ামত উল্লাহ ১৫-২০ বছর পাকিস্তানে ছিলেন। সেখান থেকে এসে জামিয়া রাহমানিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরুর পর তার সঙ্গে মামুনুলের বোনের বিয়ে হয়। এই নিয়ামতের সঙ্গে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার অন্যতম আসামি মাওলানা তাজউদ্দিনের বন্ধুত্ব ছিল।’

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর নিয়ামত উল্লাহকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তার করেছিল। কিন্তু মামুনুল হকের বাবা শায়খুল হাদিস আজিজুল হক ছিলেন চারদলীয় জোটের নেতা। তিনিই বিএনপি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে নিয়ামতকে ছাড়িয়ে এনেছিলেন। ২০০৫ সালের দিকে তার সঙ্গে মামুনুলও ৪০ দিন পাকিস্তানে ছিলেন। সেখানকার একটি ধর্মীয় সংগঠনকে তারা মডেল হিসেবে গ্রহণ করে তা বাংলাদেশের মওদুদীবাদী (জামায়াত), হানাফি, দেওবন্দি, কওমি সব মতাদর্শের মুসলিমদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ শুরু করেন। তবে পাকিস্তানের কোন জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে মামুনুলের যোগাযোগ ছিল, সে প্রশ্নের জবাব দেননি ডিসি হারুন।

মামুনুল হকের আপন ভায়রা কামরুল ইসলাম আনসারী জামায়াতের বড় নেতা। তার মাধ্যমে জামায়াতের সঙ্গেও গোপন আঁতাত রাখেন মামুনুল। বিদেশ থেকে আনা টাকা তিনি দেশের মসজিদ ও কওমি মাদ্রাসাগুলোতে ছাত্রদের মাঝে উগ্রবাদ ছড়াতে খরচ করেছেন বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি বলেছেন, ওয়াজের নাম করে মামুনুল এসব উগ্রবাদ ছড়ানোর কাজ চালিয়েছেন।

আহমদ আবদুল কাদের রিমান্ডে : হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির আহমদ আবদুল কাদেরকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ। ধর্মভিত্তিক সংগঠনটির এ নেতা বিএনপি-জামায়াত জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি। জামায়াত নেতাদের সঙ্গে মতানৈক্যের কারণে তাকে ছাত্রশিবিরের সভাপতি পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপর তিনি খেলাফত মজলিস গঠন করেন। শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মেয়ের বাসা থেকে কাদেরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গতকাল দুপুরে তাকে আদালতে হাজির করে শাপলা চত্বরে সহিংসতার মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ১০ দিনের জন্য রিমান্ডের আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের জোনাল টিমের পরিদর্শক মো. তাজুল ইসলাম। রিমান্ড প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিল শাপলা চত্বরে হেফাজতের সহিংসতা আসামি আবদুল কাদের। গত মাসের শেষদিকে মোদিবিরোধী আন্দোলনে তাণ্ডব মামলার আসামিও তিনি। দুটি মামলায় হয়েছে রাজধানীর পল্টন থানায়। আদালতে তার জামিন নামঞ্জুর করে ঢাকা মহানগর হাকিম মোহাম্মদ জসিম এ আদেশ দেন।

আদালতের পল্টন থানার নিবন্ধন শাখার কর্মকর্তা এসআই জাহিদুল ইসলাম জানান, অপর মামলাটিতেও কাদেরকে পুনরায় রিমান্ডে নেওয়া হতে পারে।

ঝর্ণার বাবা ডিবি হেফাজতে : মামুনুল হকের কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী জান্নাত আরা ঝর্ণার বাবা ওলিয়ার রহমানকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকার ডিবি পুলিশের একটি দল ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা থানা থেকে তাকে নিয়ে ঢাকায় আসে।

ওলিয়ার রহমান আলফাডাঙ্গা উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি ছিলেন। গত ২১ এপ্রিল বিকেলে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় তাকে বহিষ্কার করা হয়।

আলফাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ওলিয়ার রহমানকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়নি। হয়তো ডিএমপির ডিবি পুলিশ তাদের মামলার তদন্তের স্বার্থে তার সঙ্গে কথা বলবে। তিনি আরও বলেন, এর আগে শুক্রবার রাতে কামারগ্রামের বাড়ি থেকে আমরা তাকে থানায় নিয়ে আসি। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ডিবির একটি দল ওলিয়ার রহমানকে ঢাকায় নিয়ে যায়।

ওলিয়ার রহমানের স্ত্রী শিরিনা বেগম সাংবাদিকদের জানান, ওসি ও থানার লোকজন এসে তার স্বামীকে নিয়ে গেছেন। কী কারণে নিয়ে গেছেন জানেন না বলেও জানান তিনি।।

প্রসঙ্গত, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ এলাকার একটি রিসোর্টে গত ৩ এপ্রিল মামুনুল হককে এক নারীসহ স্থানীয় জনতার হাতে অবরুদ্ধ হন। ওই নারীর নাম জান্নাত আরা ঝর্ণা। তখন হেফাজত নেতা মামুনুল হক তাকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি করেন। এর আগে ডিবি পুলিশ ঝর্ণার প্রথম স্বামী ও ছেলেকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পরে ছেড়ে দেয় বলে ঝর্ণার প্রথম স্বামী হাফেজ শহীদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানান।

মামুনুলের বিরুদ্ধে আরও ২ মামলা : হেফাজত নেতা মামুনুল হকের বিরুদ্ধে আরও দুটি মামলা হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) সৈয়দ নুরুল ইসলাম বলেন, পল্টন থানায় হওয়া এ দুই মামলায় বায়তুল মোকাররমে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং অন্তর্ঘাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। আমরা মামলার তদন্ত শুরু করেছি।

আওয়ামী লীগ নেতা আবাব আহমেদ রিজভী ও রুমন শেখের করা মামলা দুটিতে হেফাজতের আরও তিনজন যুগ্ম মহাসচিবকে আসামি করা হয়েছে। তারা হলেনÑ লোকমান হাকিম, জুনায়েদ আল হাবিব ও নাসির উদ্দিন মনির।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত