দেখতে দেখতে আমরা রমজান মাসের মাঝামাঝি সময়ে উপনীত হয়েছি। আজ পনেরতম তারাবি। আজকের তারাবিতে আঠারতম পারা অর্থাৎ সুরা মুমিনুন, সুরা আন নুর এবং সুরা ফুরকানের ২০ আয়াত পর্যন্ত তেলাওয়াত করা হবে। সুরা মুমিনুন কোরআনে কারিমের তেইশতম সুরা। মক্কায় অবতীর্ণ হওয়া এ সুরার আয়াত সংখ্যা ১১৮। এ সুরার ১-১১ আয়াতে মুমিনদের পরিচয় ও গুণাবলি উল্লেখ করে বলা হয়েছে, একজন সফল মুমিনের এই সাতটি গুণ থাকবে। গুণগুলো হলো
১. তারা ধীরস্থীরভাবে শুধু আল্লাহর ভয়কে মনে স্থান দিয়ে একনিষ্ঠতার সঙ্গে নামাজ পড়ে। নামাজে অহেতুক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নড়াচড়া করে না, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ অত্যন্ত বিনয় ও নম্রতার সঙ্গে আদায় করে।
২. তারা অসার ক্রিয়াকলাপ থেকে দূরে থাকে, যাতে দুনিয়া ও আখেরাতের কোনো উপকার নেই। অসার ক্রিয়াকলাপ বলা হয় এমন সব কথা ও কাজকে, যাতে কোনো কল্যাণ ও উপকারিতা নেই। সফলকাম মুমিনরা এরূপ কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকে। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ কোরআনের অন্যত্র বলেন, ‘তারা যখন অসার বাক্য শ্রবণ করে তখন তারা তা উপেক্ষা করে চলে।’ সুরা কাসাস : ৫৫
সুরা ফুরকানে আরও বলা হয়েছে, ‘মুমিনরা অনর্থক ও বেহুদা কোনো কিছুর মুখোমুখি হলে ভদ্রভাবে এড়িয়ে যায়, তাতে জড়িত হয় না এবং কোনো বিবাদে লিপ্ত হয় না।’ যদি অসার ও অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকা প্রশংসনীয় কাজ হয়, তাহলে হারাম কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকা কত বেশি প্রশংসনীয় তা সহজেই অনুমেয়।
৩. তারা জাকাত আদায় করে। এখানে জাকাত বলতে সম্পদের জাকাতকে বোঝানো হয়েছে বলে অধিকাংশ তাফসিরবিদরা মনে করেন। অনেকে সম্পদের জাকাতের পাশাপাশি নফস পরিশুদ্ধির কথাও বলেছেন। নফসকে শিরক, বিদআত থেকে মুক্ত রাখা, কোনো পাপ কাজে না জড়ানো। সর্বদা আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করা। এ অর্থে কোরআনে কারিমে এসেছে, ‘যে নিজেকে শুদ্ধ করে, সেই সফলকাম হয় এবং যে নিজেকে কলুষিত করে, সে ব্যর্থ হয়।’ সুরা শামস : ৯-১০
৪. তারা নিজেদের বিবাহিত সঙ্গী ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে যৌনাচারে লিপ্ত হয় না। অর্থাৎ যে কেউ নিজ স্ত্রী ও দাসী ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে যৌন চাহিদা নিবারণ করবে তারাই সীমালঙ্ঘনকারী। কোরআনের সুরা ফুরকানের ৬৮ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে, ‘আর ব্যভিচার করে না। যে এগুলো করে, সে শাস্তি ভোগ করবে।’ অতএব বিষয়টি সম্পর্কে সতর্ক হওয়া উচিত। যে মুমিন আখেরাতের সফলতা কামনা করে সে কখনো এমন কাজে জড়িত হতে পারে না।
৫. তারা আমানত রক্ষা করে। আমানত রক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অধিকাংশ মানুষের এ ক্ষেত্রে পদস্খলন ঘটে। আমানতের গুরুত্ব নিয়ে নবী করিম (সা.) বলেন, ‘তুমি আমানত আদায় করে দাও যে তোমার কাছে আমানত রেখেছে, যে খেয়ানত করেছে তার সঙ্গে খেয়ানত করো না।’ তিরমিজি : ১২৬৪
৬. তারা অঙ্গীকার রক্ষা করে অর্থাৎ প্রতিশ্রুতি পালন করে। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রতিশ্রুতি রক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক সময়ই দেখা যায়, মানুষ প্রতিশ্রুতি দিয়ে রক্ষা করে না। ব্যক্তিগত লেনদেন থেকে শুরু করে যেকোনো প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের উদাসীনতা ইসলাম সমর্থন করে না। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রতিশ্রুতি পালনের গুরুত্ব অপরিসীম। এমনকি তা ভঙ্গ করা মুনাফিকদের আলামত বলা হয়েছে অনেক হাদিসে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা কোরআনে কারিমে বলেন, ‘প্রতিশ্রুতি পালন করো, নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।’ সুরা বনি ইসরাঈল : ৩৪
৭. তারা নামাজ আদায়ের বিষয়ে সর্বোচ্চ যতœবান থাকে। ‘নামাজে যতœবান থাকে’ অর্থাৎ সর্বদা নামাজের রুকন-আরকান, শর্ত ও উত্তম ওয়াক্তে নামাজ আদায় করে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বলা হলো কোন আমল আল্লাহতায়ালার কাছে সবচেয়ে উত্তম? তিনি বললেন, সময়মতো নামাজ আদায় করা। অন্য বর্ণনায় এসেছে প্রথম ওয়াক্তে। সহিহ বোখারি : ৭৫৩৪
এখানে দ্বিতীয়বার নামাজের কথা বলা হয়েছে, যাতে করে মানুষ নামাজকে গুরুত্ব দেয়। কোরআনে কারিমে এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হচ্ছে, ‘তোমরা নামাজসমূহের প্রতি যতœবান হও। বিশেষ করে (যত্নবান হও) মধ্যম নামাজের প্রতি। আর আল্লাহর সামনে বিনীতভাবে দাঁড়াও।’ সুরা বাকারা : ২৩৮
অতএব প্রতিটি ব্যক্তি যারা নিজেদের ইমানদার বলে দাবি করে এবং আখেরাতে সফলতা কামনা করে তাদের উচিত, এ সব বৈশিষ্ট্য নিজেদের জীবনে গ্রহণ করা।
এ আয়াতে আরও বলা হয়েছে, উপরোক্ত গুণে গুণান্বিত মুমিনরা জান্নাতুল ফিরদাউসের উত্তরাধিকারী হবে এবং তারা সেখানে অনন্তকাল থাকবে। জান্নাতুল ফিরদাউস অন্যান্য জান্নাত থেকে উত্তম ও আরশের নিচে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখন তোমরা আল্লাহর কাছে জান্নাত চাইবে, তখন জান্নাতুল ফিরদাউস চাইবে। কারণ তা সর্বোত্তম ও সবার ঊর্ধ্বে। তার ওপর আল্লাহর আরশ, সেখান থেকেই জান্নাতের নহরসমূহ প্রবাহিত হয়।’ সহিহ বোখারি : ২৭৯০