হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ব্যানার সামনে রেখে সক্রিয় আছে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ হুজি, জেএমবি ও আনসার আল-ইসলামের বেশ কয়েকজন মুসলমান জঙ্গি। এমনকি তারা হেফাজতের মিছিল-মিটিংয়েও নিয়মিত অংশ নিতেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। ২০১৩ সালে মতিঝিল শাপলা চত্বর ঘেরাওয়ে অংশ নিয়েছিলেন কয়েকজন জঙ্গি নেতা। গত মাসের শেষ সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হেফাজতের তা-বেও ওইসব জঙ্গি সম্পৃক্ত ছিলেন বলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর তদন্তে উঠে এসেছে। ইতিমধ্যে হেফাজতের ব্যানারে সক্রিয় অন্তত ২৫ জঙ্গির সন্ধান পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো। তাদের পরিচয়ও সংগ্রহ করা হয়েছে। সম্প্রতি পুলিশ ও র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া হেফাজতের শীর্ষ নেতারাও জঙ্গিদের বিষয়ে তথ্য দিয়েছে। জঙ্গিদের সম্পৃক্ত থাকার বিষয়ে একটি প্রতিবেদন পুলিশ সদর দপ্তর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সরকারের হাই-কমান্ডের কাছে পাঠিয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, গ্রেপ্তারকৃত হেফাজত নেতাদের কাছ থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তথ্যগুলো আমরা যাচাই-বাছাই করছি। জঙ্গিদের বিষয়ে তিনি বলেন, তেজগাঁও ডিভিশনের পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে নেতারা জানিয়েছে হেফাজতের ব্যানারে জঙ্গি আছে। তাছাড়া ওই ডিভিশনের ডিসি হারুন অর রশীদের মাধ্যমে আমরা তা জানতে পারি। এ বিষয়ে হেফাজত নেতা মামনুলসহ অন্য নেতাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
ডিএমপির তেজগাঁও ডিভিশনের উপ-পুলিশ কমিশনার হারুন-অর-রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, হেফাজতের ব্যানারে জেএমবি, হুজি ও আনসার আল-ইসলামের নেতাকর্মী সক্রিয় থাকার তথ্য পেয়েছি। হেফাজত নেতা মামুনুলও ওইসব জঙ্গিদের বিষয়ে তথ্য দিয়েছে। মামুনুল জঙ্গিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত বলে আমরা জেনেছি। তিনি আরও বলেন, হেফাজতের ব্যানারে যেসব জঙ্গি সক্রিয় ছিল তাদের তালিকা করা হচ্ছে। তাদের ধরতে শিগগির অভিযান চালানো হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, হেফাজতের তা-বের ঘটনায় ১৬টি মামলার তদন্ত করছি। তদন্তে আমরাও জঙ্গিদের বিষয়ে তথ্য পাচ্ছি। হেফাজতের ব্যানারে জেএমবি, হুজি ও আনসার আল-ইসলামের একাধিক সদস্য সক্রিয় থাকতে পারে। তারপরও আমরা গভীরে গিয়ে তদন্ত করছি। এমনকি চট্টগ্রামে লালখান বাজারে হেফাজতের একটি মামলার বিষয়ে তদন্ত করে নিশ্চিত হয়েছিলাম হুজির এক শীর্ষ জঙ্গিও ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত। বিষয়টি পুলিশের শীর্ষ কর্তাদের অবহিত করা হয়েছিল।
২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ হঠাৎ আলোচনায় চলে আসে। ওই বছরের ১৩ মে রাজধানীর শাপলা চত্বর ঘেরাওয়ের নামে তারা আন্দোলনের ডাক দেয়। ওইদিন তারা প্রায় সারা দেশেই তা-ব চালায়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হেফাজতের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। কিন্তু মামলাগুলো তেমন কোনো তদন্ত থাক দূরের কথা অগ্রগতিও হয়নি। হুলিয়া নিয়ে হেফাজতের নেতাকর্মীরা দফায় দফায় মিছিল-মিটিং করে সারা দেশে। আর এই সুযোগে হেফাজতের কিছু নেতার মাধ্যমে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের কিছু সদস্য ঢুকে পড়ে বলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা নিশ্চিত হয়েছে। এতদিন ধরেই হেফাজতের ব্যানারে থেকেই জঙ্গিরা মিছিল-সমাবেশে অংশ নিয়েছিল। সর্বশেষ ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে হেফাজতের বিক্ষোভের নামে বেশি তা-ব চালানো হয় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া। পুলিশ তদন্ত করে নিশ্চিত হয়েছেÑহেফাজতের ব্যানারে থেকে জেএমবি, হুজি ও আনসার আল-ইসলামের সদস্যরাও তা-বলীলার সঙ্গেও জড়িত। বিশেষ করে ঢাকার বায়তুল মোকাররম ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় বেশি সক্রিয় ছিল তারা।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত জোট সরকারের আমলে জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে শাহাদত-ই-আল হিকমা, হরকাতুল জিহাদ (হুজি), জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) ও জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি) নিষিদ্ধ করা হয়। নিষিদ্ধ করার পরও হুজি ও জেএমবির কার্যক্রম চলতে থাকে। এখনো হুজি ও জেএমবির কার্যক্রম রয়েছে। ২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর হিযবুত তাহরীরকে নিষিদ্ধ করে সরকার। ২০১৫ সালের ২৫ মে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমকে নিষিদ্ধ করা হয়। ২০১৭ সালের ৫ মার্চ নিষিদ্ধ করা হয় আনসার আল-ইসলামকে। তিনি আরও বলেন, ওইসব সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার পরও সদস্যরা নানাভাবে তৎপর আছে। তাদের সঙ্গে ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান ফেরত জঙ্গিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ আছে। হেফাজতের ব্যানারে অনেক জঙ্গি সক্রিয় আছে। তারা নিয়মিত মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিত। ইতিমধ্যে ২৫ জনের নাম পাওয়া গেছে। তারমধ্যে কয়েকজন বিদেশি আছেন। যারা সক্রিয় আছেন তারা হলেনÑহুজি নেতা মুফতি হারুন ইজহার, আব্দুল হালিম বোখারী, মাওলানা লোকমান হোসেন, মাওলানা জয়নাল আবেদীন, মাওলানা মীর আনিস, মাওলানা মীর ইদ্রিস, হারুন বিন আজহার, আলী হাসান, গোলাম রাব্বানী, শাহাদৎ হোসেন, আব্দুল হাই, মোহাম্মদ জুবায়ের, হাবিবুর রহমান, শাহ-আলম, হুসাইন আহমেদ, আবু বক্কর, পাকিস্তানের ওলিউর রহমান, পাকিস্তানের নুরুল ইসলাম, ভারতের জাহাঙ্গীর আলম, আবদুল আজিজ, আফগানিস্তানে আবদুল জাহিদ প্রমুখ। তিনি বলেন, তাদের সঙ্গে হেফাজত নেতা মামুনুল হকের ভালো সম্পর্ক আছে বলে তার কাছ থেকেও আমরা তথ্য পেয়েছি। তবে তথ্যেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তাদের ধরতে অভিযান চালানো হচ্ছে।
কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, হেফাজতের অনেক নেতা আছেন তারা বিভিন্ন সময়ে নানা সংগঠনে সক্রিয় ছিল আমরা তথ্য পেয়েছি। ওই সংগঠনগুলো হচ্ছেÑ আহলে হাদিস আন্দোলন বাংলাদেশ, জামাত-আস-সাদাত, শাহাদত-ই-নবুয়ত, জামাত-আস-সাদাত জামিউতুল ফালাহ, ইসলামিক সলিডারিটি ফ্রন্ট, মুসলিম মিল্লাত, আল হারাত-আল-ইসলামিয়া, ওয়ার্ল্ড ইসলামিক ফ্রন্ট, তৌহিদী জনতা, আল খিদমত, হিজবুল মাহদি, হিজবুল্লাহ ইসলামী সমাজ, দাওয়াতি কাফেল আল ইসলাম মার্টেনস ব্রিগেড, সত্যবাদ, জমিয়ত আহলে হাদিস আন্দোলন, তাজির বাংলাদেশ, হায়াতুর ইলাহা, ফোরকান মুভমেন্ট, জামিউতুল এহজিয়া এরতাজ, আনজুমানে তালামিজ ইসলামিয়া, কলেমার জামাত, সাহাবা পরিষদ, কাতেল বাহিনী, মুজাহিদিন-ই-তাজিম, এশার বাহিনী, আল ফাহাদ, হরকাতুল মুজাহিদীন, জাদিদ আল কায়দা ও জাদিদ আল সাবাব প্রমুখ। এসব সংগঠনের বর্তমানের অবস্থা সম্পর্কে আমরা নতুন করে খোঁজখবর নিচ্ছি।
ডিএমপির ডিবির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, হেফাজতের শীর্ষনেতা আজিজুল ইসলামাবাদী, ইহতেশামুল হক সাথী, মাওলানা জুবায়ের আহমদ, মুফতি ইলিয়াস হামিদী, মুফতি শরীফ উল্লাহ, মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দি, মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী, জুনায়েদ আল হাবিব, মাওলানা জালাল উদ্দিন আহমেদ, মাওলানা মামুনুল হক, মুফতি বশির উল্লাহ ও ড. আহমেদ আব্দুল কাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কয়েক দফা রিমান্ডে নেওয়া হয়। তারাও জঙ্গিদের বিষয়ে নানা রকমের তথ্য দিয়েছে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, হুজিসহ অন্য জঙ্গিরা জুনায়েদ বাবুনগরীকে পছন্দ করতেন না। মামুনুলকেই বেশি পছন্দ করতেন তারা। এমনকি জঙ্গিদের মধ্যে কাউকে কাউকে হেফাজতের শীর্ষ পদেও বসানোর তোড়জোড় করা হয়েছিল।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, হেফাজত নেতাদের কাছ থেকে নানা রকমের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। আজ থেকে মামুনুলকে সাত দিনের রিমান্ডে আনা হয়েছে। আশা করি সামনের জিজ্ঞাসাবাদগুলোতে হেফাজত নেতাদের কাছ থেকে আরও তথ্য পাওয়া যাবে।
