ছিলেন বাসের টিকিট বিক্রেতা। বাবা টঙ্গী রেলস্টেশনের পাশে কাপড় সেলাইয়ের কাজ করতেন। চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট রেজাউল করিম পুবাইল আদর্শ কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ২০০৭ সালে টঙ্গী সরকারি কলেজে ডিগ্রিতে ভর্তি হওয়ার পর পড়ালেখার খরচ জোগাতে কাজ নেন বাসের টিকিট কাউন্টারে। পড়াশোনা চালিয়ে যেতে রেজাউলের এই সংগ্রাম নজর কেড়েছিল অনেকেরই। তবে তখন থেকেই মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন রেজাউল। টিকিট বিক্রির পাশাপাশি ফেনসিডিল বিক্রির কাজও শুরু করেন। হাতে মাদক বিক্রির নগদ কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা আসতে থাকলে ভাগ্যের চাকা ঘুরতে থাকে রেজাউলের। মাদকের টাকায় ৫-৬ বছরেই হয়ে যান কোটিপতি। টঙ্গীতে বাড়ি ও ফ্ল্যাট কিনে বসবাস করতে থাকেন রাজকীয় হালে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে গড়ে তুলেন সখ্য। আর অল্প সময়েই ওই নেতাদের প্রিয়ভাজন হয়ে যান রেজাউল। নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে হয়ে ওঠেন অপ্রতিরোধ্য। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢালতে থাকেন দলের নেতাদের পেছনে। নেতারাও তাকে কাছে টেনে নেন। এভাবেই বাগিয়ে নেন টঙ্গী সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদকের পদ। নিজের অপকর্ম ঢাকতে বাংলাদেশের সংবাদ২৪.কম নামে একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালও খুলে বসেন রেজাউল। সম্প্রতি মাদকের টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে এক নারী মাদক কারবারির সঙ্গে একটি ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার পর বেকায়দায় পড়ে যান রেজাউল।
রাজধানী সংলগ্ন শিল্পনগরী টঙ্গীর প্রায় সবাই চেনেন রেজাউল করিমকে। তিনি একাধারে টঙ্গী সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদকও। সে কারণে পুলিশের সঙ্গেও তার ছিল সুসম্পর্ক। আগে থেকেই ফুটপাত ও ঝুট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা নিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। রেজাউল টঙ্গীর মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণকারীদের মধ্যে অন্যতম বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। সম্প্রতি টঙ্গীর মরকুন এলাকার মাদক কারবারি সাঈদা বেগমের সঙ্গে রেজাউলের একটি ফোনালাপ প্রকাশ পাওয়ায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। এরপর নড়েচড়ে বসে পুলিশ। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার খন্দকার লুৎফুল কবিরের নির্দেশে পুলিশের একটি দল ছাত্রলীগ নেতা রেজাউল করিমের সঙ্গে মাদক কারবারি সাঈদা বেগমের ফোনালাপসহ তার মাদক কারবার নিয়ে অনুসন্ধানে নামে। পুলিশের অনুসন্ধানে ইয়াবা কারবারে রেজাউলের সম্পৃক্ততাও মেলে। এরই ধারাবাহিকতায় বহুল আলোচিত কোটিপতি ছাত্রলীগ নেতা রেজাউল করিমকে গত মঙ্গলবার রাত সোয়া ১টার দিকে মাদক ও চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে গতকাল বুধবার রেজাউলকে গাজীপুরের আদালতে হাজির করা হলে বিচারক শুনানি শেষে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (অপরাধ দক্ষিণ) ইলতুৎমিশ জানান, টঙ্গী পূর্ব থানার একটি মামলায় রিমান্ডে থাকা আসামি জাকির হোসেনের (২৫) স্বীকারোক্তি অনুযায়ী টঙ্গী পূর্ব থানার হিমারদীঘি আমতলী কেরানীরটেক এলাকায় জাকিরের বাসার আলমারি থেকে পাঁচশ’ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত জাকির হোসেন পুলিশকে জানান, ছাত্রলীগ নেতা রেজাউল করিমের সরবরাহ করা ইয়াবা তিনি দীর্ঘদিন ধরে কেনাবেচা করে আসছেন। ইয়াবা বিক্রির লভ্যাংশ তারা আনুপাতিক হারে ভাগ করে নিতেন।
স্থানীয়রা জানান, ছাত্রলীগ নেতা রেজাউল কক্সবাজার থেকে মাদক এনে টঙ্গীর বিভিন্ন কারবারিদের হাতে পৌঁছে দিতেন। সম্প্রতি সাজ্জাদুল ইসলাম মনির নামে এক ব্যবসায়ীর কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন ছাত্রলীগের এই নেতা। ভুক্তভোগীর স্ত্রী শিল্পী আক্তার এ ঘটনায় বাদী হয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানায় অভিযোগ জমা দেন। সেই মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে রেজাউলকে।
স্থানীয়রা আরও জানান, ছাত্রলীগ নেতা রেজাউলের মূল কারবারই হলো ইয়াবা। কক্সবাজার থেকে ইয়াবা এনে টঙ্গীর বিভিন্ন খুচরা কারবারিদের হাতে পৌঁছে দিতেন রেজাউল। চাঁদাবাজিতেও নাম উঠে এসেছে এই ছাত্রলীগ নেতার। টঙ্গীর ব্যাংকের মাঠ বস্তি ও কেরানীরটেক বস্তি এলাকার মাদক কারবারের অন্যতম হোতা সাঈদা বেগম ইয়াবাসহ ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনাকে ঘিরেই রেজাউলের মাদক সম্পৃক্ততার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। জামিনে থাকা সাঈদার সঙ্গে রেজাউলের ফোনালাপে সাঈদার কথাতে স্পষ্ট হয়েছে যে, রেজাউলের মাধ্যমে কক্সবাজার থেকে এক লাখ পিস ইয়াবা এনে টঙ্গীতে সরবরাহ করা হয়। ওই এক লাখ ইয়াবা বেহাত হওয়ার জন্য সাঈদাকেই দায়ী করেন রেজাউল। এ নিয়ে দুজনের কথোপকথনে পুরো চিত্র উঠে আসে। সেই ফোনালাপটি সম্প্রতি প্রকাশ হয়ে যায়। আর রেজাউল ও সাঈদার কথোপকথনের বিস্তারিত প্রকাশিত হওয়ার পরই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন।
ছাত্রলীগ নেতা রেজাউলের বিষয়ে জানতে চাইলে টঙ্গী কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি কাজী মঞ্জুরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, তাদের কমিটি অনেক আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। একসঙ্গে রাজনীতি করলেও রেজাউলের মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন।
স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতারা জানান, পাঁচ বছর আগে বিয়ে করেন রেজাউল। তার একটি মেয়ে রয়েছে। ছাত্রত্ব নেই অনেক দিন। তবু ছাত্রলীগের পদে আছেন। ২০১৬ সালে রেজাউল ছাত্রলীগের পদ পাওয়ার পর ফেনসিডিলের কারবার ছেড়ে দিয়ে শুরু করেন ইয়াবার কারবার। টেকনাফ ও কক্সবাজার থেকে নিজের পরিচয় দিয়ে ও নিজের গাড়ি দিয়েও তিনি ইয়াবা নিয়ে আসতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রেজাউলের রাজনৈতিক সতীর্থরা বলছেন, ছাত্রলীগের টঙ্গী কলেজের সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদক হওয়ার সুবাদে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক রয়েছে।
