মাদারীপুরের শিবচরে পদ্মা নদীতে দুটি নৌযানের সংঘর্ষে ২৬ জন নিহত হয়েছেন। গতকাল সোমবার সকালে বাংলাবাজার-শিমুলিয়া নৌরুটের কাঁঠালবাড়ী ঘাট সংলগ্ন এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। তীর নোঙর করে থাকা বাল্কহেডে (বালু টানা কার্গো) বেপরোয়া গতির একটি যাত্রীবাহী স্পিডবোট ধাক্কা দিলে প্রাণহানির এ ঘটনা ঘটে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে। নিহতদের মধ্যে তিন শিশু ও দুই নারী রয়েছেন। তারা সবাই স্পিডবোটটির যাত্রী ছিলেন।
এই দুর্ঘটনায় আহত ৪ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন দুর্ঘটনাকবলিত স্পিডবোটের চালক শাহ আলম। তাকে আটক করেছে পুলিশ। এছাড়া দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে ছয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে মাদারীপুর জেলা প্রশাসন।জানা গেছে, গতকাল সকাল পৌনে ৭টার দিকে অন্তত ৩২ জন যাত্রী নিয়ে একটি স্পিডবোট মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাট থেকে শিবচরের বাংলাবাজারের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। সাড়ে ৭টার দিকে বাংলাবাজার ঘাটে নোঙর করা বালুবোঝাই শিফান শায়হান নামে বালু ভর্তি বাল্কহেডে পেছন থেকে ধাক্কা দেয় স্পিডবোটটি। এতে স্পিডবোটটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। এ সময় স্পিডবোটে থাকা সব যাত্রী পানিতে পড়ে যান। পরে নদী থেকে একে একে ২৪ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। আর ৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে আরও দুজনের মৃত্যু হয়। ফায়ার সার্ভিস ও নৌপুলিশ সদস্যরা নিহতদের লাশ উদ্ধার করে কাঁঠালবাড়ীর ইয়াছিন মাদবরকান্দি গ্রামের দোতারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রাখেন। খবর পেয়ে নিহতদের স্বজনরা একে একে সেখানে হাজির হয়ে মরদেহ শনাক্ত করেন।
গতকালের নৌ-দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ২৫ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। তারা হলেন- খুলনার তেরখাদার বারুখালির মনির মিয়া (৩৮), হেনা বেগম (৩৬), সুমী আক্তার (৫) ও রুমি আক্তার (৩), ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার চরডাঙা গ্রামের আরজু শেখ (৫০), ইয়ামিন সরদার (২), মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার সাগর ব্যাপারী (৪০), কুমিল্লার দাউদকান্দির কাউসার আহম্মেদ (৪০), রুহুল আমিন (৩৫), মাদারীপুরের রাজৈরের তাহের মীর (৪২), কুমিল্লার তিতাসের জিয়াউর রহমান (৩৫), মাদারীপুরের শিবচরের হালান মোল্লা (৩৮), শাহাদাত হোসেন মোল্লা (২৯), বরিশালের তেদুরিয়ার আনোয়ার চৌকিদার (৫০), মাদারীপুরের রায়েরকান্দির মাওলানা আব্দুল আহাদ (৩০), চাঁদপুরের উত্তর মতলবের মো. দেলোয়ার হোসেন (৪৫), নড়াইলের লোহাগড়া রাজাপুরের জুবায়ের মোল্লা (৩৫), মুন্সীগঞ্জ সদরের সাগর শেখ (৪১), বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের সায়দুল হোসেন (২৭), রিয়াজ হোসেন (৩৩), ঢাকার পীরেরবাগের খেরশেদ আলম (৪৫), ঝালকাঠির নলছিটির এস এম নাসির উদ্দীন (৪৫), বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের মো. সাইফুল ইসলাম (৩৫), পিরোজপুরের চরখামার মো. বাপ্পি (২৮) এবং পিরোজপুরের ভা-ারিয়ার জনি অধিকারী (২৬)।
দুর্ঘটনাস্থলের পাশের বাসিন্দা পারভিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই ‘লকডাউনের’ মধ্যে কীভাবে স্পিডবোট চালু হয়েছে। অবশ্যই ওপারের পুলিশ টাকা খেয়ে স্পিডবোট ছেড়েছে, তাই আজ এতগুলো প্রাণ গেল।’
শিবচর মডেল থানার ওসি মো. মিরাজ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিহতদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে তাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে।’
উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া ফরিদপুর ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক মো. নজরুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে আসি। ঘটনাস্থলে এসে জানতে পারি যে কাঁঠালবাড়ী ঘাটে নদীতে নোঙর করে রাখা একটি বাল্কহেডের সঙ্গে শিমুলিয়া থেকে যাত্রী বোঝাই একটি স্পিডবোট পেছন দিক থেকে ধাক্কা দিলে স্পিডবোটটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়।’
দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে ছয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে মাদারীপুর জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা এই ঘটনা খতিয়ে দেখার জন্য স্থানীয় সরকারের উপ-পরিচালকে আহ্বায়ক করে ৬ সদস্যের কমিটি করেছি। তাদের ১১ দিনের মধ্যে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।’
নিহতদের বেশিরভাগেরই মাথায় আঘাত ছিল : নিহতদের বেশিরভাগেরই মাথায় আঘাত রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় উদ্ধারকারী ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। ধারণা করা হচ্ছে মাথায় আঘাতের কারণেই মৃতের সংখ্যা বেড়েছে।
স্থানীয় জাহাঙ্গীর নামে এক ডুবুরি বলেন, ‘স্পিডবোটটি দ্রুতগতিতে এসে বাল্কহেডের সঙ্গে ধাক্কা খায়, ফলে যাত্রীরা মাথায় আঘাত পেয়ে মারা গেছেন।’
আব্দুল করিম নামের স্থানীয় এক যুবক বলেন, ‘নদীর পাড়ে নোঙর করে রাখা বালুবাহী বাল্কহেডের সঙ্গে স্পিডবোটটির ধাক্কা লাগার কথা নয়। সম্ভবত চালকের চোখে ঘুম ছিল। এ কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।’
শিবচর থানার ওসি মিরাজ হোসেন বলেন, ‘নিহতদের অনেকেই মাথায় আঘাত ছিল।’
দাফন-কাফনের জন্য ২০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ : নিহতদের দাফন-কাফনের জন্য প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে দিয়েছে মাদারীপুর জেলা প্রশসান।
মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন বলেন, ‘দুর্ঘটনা এলাকা পরিদর্শন করেছি। যারা দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি। মর্মান্তিক নৌ-দুর্ঘটনায় যাদের মৃত্যু হয়েছে তাদের প্রত্যেক পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হবে।’
