ফিলিস্তিনের জন্য চাই বৈশ্বিক সংহতি

আপডেট : ১৭ মে ২০২১, ১১:৫৯ পিএম

বিশ্ব সম্প্রদায়ের অদ্ভুত নীরবতার মধ্যেই এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত আছে। ইসরায়েলের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর হামলায় ফিলিস্তিনের সাধারণ নারী-পুরুষ ও শিশুরা নিহত হচ্ছে। চলমান হামলায় ইতিমধ্যেই দুই শতাধিক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে অর্ধশতাধিকই শিশু। গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের আগ্রাসনের খবর ও ছবি বহির্বিশ্বে সম্প্রচার রুদ্ধ করে দিতে শনিবার ইসরায়েলি বাহিনী বার্তা সংস্থা এপি ও কাতারভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আলজাজিরা-সহ সাতটি গণমাধ্যমের কার্যালয় থাকা ১২ তলা একটি ভবন গুঁড়িয়ে দেয়। গণমাধ্যমের মুখ বন্ধ করার পাশাপাশি ফেইসবুক, টুইটার, জুমসহ অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতেও নিয়ন্ত্রণ চলছে ইসরায়েলি স্বার্থের অনুকূলে। ফিলিস্তিনে বিগত কয়েক বছরের মধ্যে এমন ভয়াবহ হামলা আর ঘটেনি। নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ দেখেও এমন নীরবতাও দেখা যায়নি আন্তর্জাতিক পরিম-লে।     

ইসরায়েলের এই আগ্রাসী হামলা আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবাধিকারের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন; অথচ আন্তর্জাতিক সমাজের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেই। স্মরণ করা যেতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস সরিয়ে নেওয়ার পরও বড় কোনো সংঘর্ষ হয়নি। গাজায় এর আগে ইসরায়েল সর্বশেষ বড় হামলা চালিয়েছিল ২০১৪ সালে। ৫০ দিনব্যাপী সেই হামলায় ২২৫১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছিলেন। যাদের তিন চতুর্থাংশ ছিল বেসামরিক। অন্যদিকে ইসরায়েলের ৬৭ জন সৈন্য এবং ৬ জন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হয়েছিল। সেবারের হামলার এক বছর পর জাতিসংঘ এক প্রতিবেদনে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন উভয়পক্ষেই যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনে। কিন্তু এটা জানা কথা, যে জাতিসংঘ এমন ঘোরতর আগ্রাসনের পরও নিরাপত্তা পরিষদ থেকে একটি নিন্দাপ্রস্তাব বা বিবৃতি পর্যন্ত দিতে পারে না, তাদের পক্ষে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার আশা করা বাতুলতা মাত্র।

ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকট ঘিরে বিগত এক দশকের ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ইউরোপীয় দেশগুলোসহ পশ্চিম ও প্রাচ্যের যে দেশগুলো অতীতে ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে সরব এবং সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে তারাও এখন প্রায় নিশ্চুপ। এখন পর্যন্ত কোনো সমন্বিত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ফিলিস্তিন ইস্যুতে মঙ্গলবার বৈঠক করার কথা। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতি আটকে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতায়। চীন সংঘর্ষ থামাতে আন্তর্জাতিক মহলকে সহযোগিতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে, সম্প্রতি চারটি শক্তিশালী আরব দেশের ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপন ফিলিস্তিনিদের আরও একঘরে করে দিয়েছে। এক্ষেত্রে যেন কোনো দায় নেই ইসলামি সম্মেলন সংস্থা বা ওআইসি’রও। আবার আরব দেশগুলোর জোট আরব লিগও এ বিষয়ে সোচ্চার নয়। কায়রোভিত্তিক ২২টি দেশের এ জোট সংঘাত থামাতে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বানেই যেন দায়িত্ব পালন শেষ করছে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে ইসরায়েল প্রশ্নে ভিন্ন কোনো ভূমিকা নেওয়ার অবকাশ যে নেই সেটা খালি চোখেই বোঝা যায়। দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের ডানপন্থি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারকে সমর্থন দিয়ে প্রকারান্তরে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের আরও প্রান্তিক, আরও অধিকারহীন করে তোলার কাজই করছে যুক্তরাষ্ট্র। ইহুদি বসতি স্থাপন আরও বেগবান করার পাশাপাশি ইসরায়েলে এমন সব আইন পাস করা হচ্ছে যাতে ইসরায়েলে ইহুদি ও ফিলিস্তিনের নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য কাঠামোগতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সবই সম্ভাব্য দ্বি-রাষ্ট্রিক সমাধানের বিপক্ষে যায়। এই পরিস্থিতি বলছে, ঐতিহাসিকভাবে ওই ভূখ-ে ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম জাতির অধিকারের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার বদলে দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলের একচেটিয়া দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠারই প্রক্রিয়া চলছে। অবশ্য এক্ষেত্রে পবিত্র তীর্থ যিশুর জন্মস্থান বেথলেহেমের ওপর খ্রিস্টানদের নিয়ন্ত্রণ ও অধিকার প্রতিষ্ঠাকে ব্যতিক্রমী হিসেবে বিশেষ বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে, পশ্চিমতীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলের দখলদারি ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে। গাজার ছিটমহলে ইসরায়েলের অমানবিক অবরোধ ২০ লাখ ফিলিস্তিনির জীবনকে নরক বানিয়ে তুলেছে। যে গাজার ৭০ শতাংশ যুবকই বেকার, সেখানে ফিলিস্তিনিদের ঐতিহাসিক মুক্তিসংগ্রামের গতিপথ পাল্টে দেওয়া কঠিন নয়। ফিলিস্তিনি মুক্তিসংগ্রামে সাম্প্রতিককালে পিএলও ও ফাতাহর অবস্থান বিবেচনা করলে ফিলিস্তিনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটটিও স্পষ্ট হবে।

বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবেই ফিলিস্তিনিদের মুক্তিসংগ্রামে সমর্থন দিয়ে আসছে। গাজায় ইসরায়েলের চলমান হামলার নিন্দা জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহমুদ। এক টুইটে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘ইসরায়েল কি সব আন্তর্জাতিক আইনের ঊর্ধ্বে?’ অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক মুসলিম দেশ যখন ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছে, তখনো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও দ্বিরাষ্ট্রিক সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক ও মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্ব সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধ সমর্থন ও সংহতি প্রতিষ্ঠা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত