মিতু হত্যা মামলা

রিমান্ড শেষে কারাগারে বাবুল আক্তার, দেননি জবানবন্দি

আপডেট : ১৮ মে ২০২১, ০৩:৩৩ এএম

চট্টগ্রামে চাঞ্চল্যকর মাহমুদা আক্তার মিতু হত্যা মামলায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি তার স্বামী ও সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার। গতকাল পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে বাবুল আক্তারকে বিচারকের খাস কামরায় হাজির করা হলে তিনি জবানবন্দি দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন বলে জানিয়েছেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে রিমান্ডেও তিনি স্ত্রী হত্যার কারণ সম্পর্কিত সব প্রশ্নই এড়িয়ে গেছেন। তবে এবার তিনি মুসাকে সোর্স হিসেবে স্বীকার করেছেন।

পাঁচ বছর আগে চট্টগ্রামে খুন হন মাহমুদা আক্তার মিতু। গত মঙ্গলবার এই ঘটনায় আগের মামলার বাদী বাবুল আক্তারকে প্রধান আসামি করে নতুন একটি মামলা করেন মাহমুদার বাবা মোশাররফ হোসেন। সেই মামলায় ১২ মে বাবুল আক্তারকে রিমান্ডে নেয় পিবিআই। আজ পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে বাবুল আক্তারকে আদালতে নেওয়া হয়। স্বীকারোক্তি দিতে রাজি না হলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়। এরপর বাবুল আক্তারকে নেওয়া হয় চট্টগ্রামে কেন্দ্রীয় কারাগারে।

পাঁচ বছর আগে চট্টগ্রামে মিতু হত্যাকান্ডের পরপরই ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ফুটেজ দেখে পুলিশ যাদের চিহ্নিত করেছিল, তাদের মধ্যে একজন বাবুলের ‘সোর্স’ মুসা। যদিও হত্যাকান্ডের পর পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল আক্তার মুসাকে চেনেন না বলে জানান। এবার পিবিআইয়ের রিমান্ডে মুসার বিষয়ে সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তার কোনো তথ্য দিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা বলেন, ‘মিতু হত্যার আসামি কামরুল ইসলাম শিকদার মুসাকে অবশেষে নিজের ‘সোর্স’ ছিলেন বলে স্বীকার করেছেন তিনি (বাবুল আক্তার)।’

তবে মুসাকে পাঁচ বছর পর বাবুল আক্তার তার সোর্স হিসেবে স্বীকার করলেও মিতু হত্যার আগে ও পরে তার সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে এড়িয়ে গেছেন। এ ছাড়া রিমান্ডে জবানবন্দি দিতে রাজি হলেও পরে আদালতে জবানবন্দি দিতে অস্বীকৃতি জানান বাবুল।

গতকাল সকালে বাবুলকে আদালতে নিয়ে আসে পিবিআই। আদালতপাড়াজুড়ে আলোচ্য বিষয় ছিল মিতু হত্যার মামলার প্রধান আসামি বাবুল জবানবন্দি দেবেন। দুপুরে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার জাহানের খাস কামরায় তাকে হাজির করে পিবিআই। তবে সেখানে তিনি তিন ঘণ্টার মতো অবস্থান করলেও স্ত্রীকে হত্যার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি। 

নাম প্রকাশ না কারার শর্তে পিবিআইর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘রিমান্ডে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হয়েছিল বাবুল আক্তার। এজন্য তাকে বিচারকের খাস কামরায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ তিনি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে বিচারক পিবিআইয়ের আবেদনে বাবুল আক্তারকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।’

পরে বিচারকের খাস কামরা থেকে কড়া পুলিশ প্রহরায় বাবুল আক্তারকে বের করা হয়। কালো পাঞ্জাবি পরিহিত সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তাকে তখন বিমর্ষ দেখা যায়। সেখানে তিনি কিছু বলতে চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু চারদিকে পুলিশি ঘেরাওয়ের মধ্যে সে সুযোগ তিনি পাননি। প্রিজন ভ্যানে করে বেলা ২টা ৪৫ মিনিটে আদালত থেকে বাবুল আক্তারকে নিয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের উদ্দেশ্যে।

সিএমপির সহকারী কমিশনার (প্রসিকিউশন) কাজী সাহাবুদ্দিন আহমদ বলেন, ‘তাকে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে বলা হলেও তিনি তা দিতে অস্বীকৃতি জানান। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছে।’ ফের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পিবিআইয়ের পক্ষ থেকেও নতুন করে কোনো রিমান্ড আবেদন করা হয়নি।’

অপরদিকে বাবুল আক্তারের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আরিফুর রহমান আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাকে বাবুল আক্তারের সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া হয়নি। তিনি তিন ঘণ্টা ভেতরে ছিলেন। জবানবন্দি দিয়েছেন কিনা, তা আমি জানি না। আজ নতুন করে রিমান্ডের আবেদন করা হয়নি। তিনি যদি জবানবন্দি দিয়ে না থাকেন তাহলে আমরা পরবর্তীতে তার জামিনের আবেদন করব।’

জিজ্ঞাসাবাদে যেমন ছিলেন বাবুল আক্তার : পিবিআইয়ের তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন পাঁচ দিনের রিমান্ডে প্রথম তিন দিন বাবুল আক্তার কোনো বিষয়ে মুখ খোলেননি। এরপর তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন, আবার অনেক প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়েছেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সন্তোষ কুমার চাকমা বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদে তিনি (বাবুল আক্তার) বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন, আবার কিছু এড়িয়েও গেছেন। তবে মামলার তদন্তের স্বার্থে সবকিছু বলা যাবে না।’

পিবিআইয়ের আরেকটি সূত্র নিশ্চিত করেছে বাবুল আক্তার জিজ্ঞাসাবাদের সময় যে কয়েকটি কথা বলেছেন তার মধ্যে ‘সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি চিন্তিত’ এ বিষয়টি ছিল। কিন্তু ‘মিতু হত্যার কারণ সম্পর্কিত’ সব ধরনের প্রশ্নই তিনি এড়িয়ে গেছেন।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে চট্টগ্রামের ওআর নিজাম রোডে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার পথে গুলি ও ছুরিকাঘাতে খুন হন মিতু। এ ঘটনায় তার স্বামী বাবুল আক্তার বাদী হয়ে পাঁচলাইশ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। হত্যাকান্ডে অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে আটক হন এহতেশামুল হক ভোলা ও তার সহযোগী মো. মনির।  গ্রেপ্তার আনোয়ার ও মোতালেব মিতু হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন। তাদের স্বীকারোক্তিতে এ হত্যার পরিকল্পনাকারী হিসেবে বাবুল আক্তারের সোর্স হিসেবে পরিচিত মুসার নাম আসে। এরপর হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল সরবরাহের অভিযোগে ১ জুলাই মুসার ভাই সাইদুল আলম শিকদার ওরফে সাক্কু ও শাহজাহান নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ৫ জুলাই ভোরে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ঠান্ডাছড়িতে নুরুল ইসলাম রাশেদ ও নুরুন্নবী নামে দুজন পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। একপর্যায়ে ওই বছর ৬ সেপ্টেম্বর বাবুল আক্তারকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত