মিল্লাত হোসেন চাকরির জন্য ৩ লাখ ৫ হাজার টাকা ঘুষ দিয়েছেন। শ্রম মন্ত্রণালয়ের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের অফিস সহায়ক পদের জন্য তিনি এ টাকা দিয়েছিলেন। আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে স্বল্পকালীন এ চাকরির শর্ত জেনে এবং বুঝেই তিনি এ টাকা তুলে দিয়েছিলেন।
সাইদুর রহমান দিয়েছিলেন ৩ লাখ টাকা। পোস্টিং পেয়েছিলেন কলকাখানা অধিদপ্তরের হেড অফিসেই। চাকরির মেয়াদ বাড়বেÑ এ আশায় তিনি টাকা দিয়েছিলেন।
শুধু মিল্লাত হোসেন বা সাইদুর রহমানই নন, এভাবে টাকা দিয়ে চাকরি নিয়েছিলেন ১৬২ জন। তাদের প্রত্যেকেই ২ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিয়েছেন। গড়ে ৩ লাখ টাকা করে হলেও তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে ৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এ টাকা আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে জনবল সরবরাহের জন্য নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান যমুনা স্টার সেভ গার্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের হাত ঘুরে অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছানোর অভিযোগ উঠেছে।
নিয়োগপত্র অনুযায়ী ১৬২ জন কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করতেই পারে শ্রম ও কর্মস্থান মন্ত্রণালয়। কিন্তু তাদের নবায়নেরও সুযোগ আছে। নবায়ন না করে বাদ দেওয়া হয়েছে। কিছুদিন পর এসব পদে আবার লোক নিয়োগ করতে হবে। লোক নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হলেই আর্থিক লেনদেনেরও সুযোগ সৃষ্টি হয়। চাকরিচ্যুত কর্মচারীরা অভিযোগ করেছেন, তাদের টাকার বিনিময়ে চাকরি দেওয়া হয়েছে। আবার নতুন করে যাদের নিয়োগ দেওয়া হবে তাদের কাছ থেকেও টাকা নেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আউটসোর্সিংয়ের নবায়ন ও নতুন নিয়োগের এ জায়গা থেকে দুর্নীতি দূর করার নির্দেশ দিয়েছেন।
২০১৮ সালে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে ১৬২ জন জনবল সরবরাহের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। জনবল সরবরাহের কার্যাদেশ পায় যমুনা স্টার সেভ গার্ড সার্ভিসেস লিমিটেড। সংস্থার সরবরাহকৃত জনবল পদায়ন করা হয় অধিদপ্তরের বিভিন্ন অফিসে। দুজনের পোস্টিং দেওয়া হয় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়েও। তিন বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণ দেখিয়ে গত ৫ মার্চ যমুনা স্টার সেভ গার্ড সার্ভিসেসের সঙ্গে চুক্তির অবসান করার নির্দেশ দেয় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। নির্দেশ পেয়ে অধিদপ্তর ১৬২ জনকে ৫ মার্চ সকালে অফিসে যাওয়ার পর জানিয়ে দেয়, ‘তোমাদের চাকরি নেই। কাল থেকে আর আসতে হবে না।’
চাকরিচ্যুত সাইদুর রহমান বলেন, ‘মহামারীর এ সময়ে চাকরিচ্যুতির কথা শুনে আমাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। চাকরির জন্য আমরা কোথায় যাই, কার কাছে যাইÑ ঠাওর করতে পারছিলাম না। এমন নয় যে, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের জনবল দরকার নেই। তাদেরও আমাদের দরকার, আমাদেরও চাকরির দরকার। তাই আমরা অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শকের কাছেই যাই। তিনি আশ^াস দেন একটা কিছু করার। কিন্তু এখানে বাদ সাধে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। তারা অনড়, পুরনো চুক্তি তারা আর নবায়ন করবে না। তারা নতুন করে জনবল সরবরাহের চুক্তি করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটা কেমন পদ্ধতি? তাদের জনবল লাগবে, আমাদেরও চাকরি লাগবে। তাহলে আমাদের বাদ দেবে কেন? আমাদের তিন বছরের অভিজ্ঞতা আছে। যাদের নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হবে তাদের তো এ অভিজ্ঞতা নেই। তাহলে কিসের আশায় আমাদের বাদ দেওয়া হলো?’
গাজীপুরের উপমহাপরিদর্শকের কার্যালয়ের মিল্লাত হোসেন বলেন, ‘আমরা জানি আউটসোর্সিং চাকরির কোনো নিশ্চয়তা নেই। তারপরও টাকা দিয়েছি। কী করব? বয়স চলে যাচ্ছে, চাকরি পাচ্ছি না। উপায় না থাকায় এ অজায়গায়ই টাকা ঢেলেছি। অন্য উপায় থাকলে কি আর এখানে টাকা ঢালতাম। আউটসোর্সিং কোনো চাকরিই না। কারণ এখানে বোনাস নেই, পেনশন নেই, গ্র্যাচুইটি নেই। সরকার এটা কী পদ্ধতি আবিষ্কার করল। সরকারের তো মানবিক হওয়া চাই। আপনারা ঈদে সবাই বোনাস পান, আউটসোর্সিংওয়ালাদের কিছুই নেই। এত কিছু জেনেও টাকা দিয়েছি শুধু চাকরির আশায়। এখন সরকার নতুন করে চুক্তি করলে নতুন লোকদের কাছ থেকে টাকা পাবে। এ কারণে কি আমাদের বহাল রাখছে না? আমি তো আর কোনো কারণ দেখি না।’
ঢাকা বিভাগের উপমহাপরিদর্শকের কার্যালয়ের চাকরিচ্যুত একজন জানিয়েছেন, তিনি তার বাড়ির পাশের একজনকে ৩ লাখ ৫ হাজার টাকা দিয়েছেন। তিনি বেতন পেতেন মাসে ১৪ হাজার ৯৫৯ টাকা। যারা হেড অফিসে ছিলেন তাদের টাকা একটু বেশি ছিল। জেলাভিত্তিক আরও কম। তাদের পরিচিত অনেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে এ চাকরি নিয়েছিলেন। তিন বছরে তাদের আসল টাকাই ওঠেনি। তারা তিন বছর অনেকটা বিনা পারিশ্রমিকে চাকরি করেছেন। তাদের শ্রমের মূল্যটা কোথায় থাকলÑ জানতে চেয়েছেন চাকরিচ্যুত ওই কর্মচারী।
কর্মচারীর প্রয়োজন থাকার পরও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করেনি কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর।
জনবল সরবরাহের চুক্তি নবায়ন না করে নতুন করে চুক্তি করার নীতি নিয়েছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। অথচ নতুন করে জনবল নেওয়ার মাধ্যমেই এ খাতে মূল অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নতুন করে নিয়োগ মানেই হচ্ছে নতুন করে টাকা আদায় করার সুযোগ সৃষ্টি করা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও আউটসোর্সিং পদ্ধতির ঠিক এ জায়গাটি থেকে অনিয়ম দূর করার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হয়েছে, আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে ঠিকাদার বাছাইয়ে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠছে। পুরনো জনবলের পরিবর্তে অবৈধ অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে নতুনভাবে জনবল নিয়োগ করা হচ্ছে। ফেব্রুয়ারির প্রথম পক্ষের পাক্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এ সংক্রান্ত প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হলে তিনি তা অনুমোদন দেন। এর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে লোকবল নিয়োগের দুর্নীতি দূর করার জন্য সব মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য সব সচিবের কাছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক মো. নাসির উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়গুলো ঘটেছে আমার এই অধিদপ্তরে যোগদানের আগে। আমি যতদূর জেনেছি অধিদপ্তর থেকে পুরনো লোকদের রাখার প্রস্তাবই দেওয়া হয়েছিল।’
করোনাকালে শ্রমিক ছাঁটাই করাকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে জানিয়েছিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। কমিশনের এই বক্তব্য সব দপ্তরে পাঠিয়ে শ্রমিক ছাঁটাই না করে মানবাধিকার রক্ষার নির্দেশ দিয়েছিল শ্রম মন্ত্রণালয়। কিন্তু ১৬২ জন কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করে নির্দেশনা লঙ্ঘন করল শ্রম মন্ত্রণালয়।
আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে নিয়োগ হচ্ছে অস্থায়ী ভিত্তিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। বিভিন্ন মেয়াদে নির্ধারিত বেতনে কর্মচারী সরবরাহের জন্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থা গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দেয়। তাতে সাড়া দিয়ে জনবল সরবরাহের আবেদন করে আউটসোর্সিং সেবার জন্য নিবন্ধিত বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা। যে সংস্থার প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট দপ্তরের শর্ত পূরণ করতে পারে সেই সংস্থাকে জনবল সরবরাহের জন্য কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কার্যাদেশ পাওয়ার পর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে আউটসোর্সিংয়ের জন্য নিবন্ধিত সংস্থা। তারাই কর্মচারী বাছাই করে এবং তাদের নিয়োগপত্র দেয়। নিয়োগপত্রেই লেখা থাকে অফিস সময়ের পর কাজ থাকলে করতে হবে। কিন্তু এজন্য কোনো ওভারটাইম পাওয়া যাবে না। চাকরিতে যোগদান করার পর কোনো কারণে চাকরি ছাড়তে চাইলে এক মাস আগে জনবল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে জানাতে হবে। কোনো অবস্থায় কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ করা যাবে না। যদি কোনো বিশেষ কারণে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন তাহলে লিখিতভাবে কারণ জানাতে হবে। অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে বেতনভাতা পাবেন না এমনকি দাবিও করতে পারবেন না। কর্মচারীর অবহেলার কারণে সরকারি কোনো সম্পত্তি নষ্ট হলে তার সমমূল্য কর্মচারীর কাছ থেকে আদায় করা হবে। চাকরির স্থায়িত্ব নির্ভর করবে কর্মচারীর আচার-আচরণ, কর্মদক্ষতা ও কর্মতৎপরতার ওপর। এসব সন্তোষজনক না হলে যেকোনো সময় চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। চাকরিরত অবস্থায় কোনো ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারবেন না। অনৈতিক কাজে লিপ্ত হলে বিনা নোটিসে অব্যাহতি দেওয়া হবে। এ বিষয়ে কোনো আপত্তি চলবে না। এ নিয়োগপত্র কর্মচারীকে চাকরি নিয়মিতকরণের কোনো নিশ্চয়তা দেয় না।
উল্লিখিত সব শর্তসহ আরও নানা শর্তে ১৬২ জনকে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে নিয়োগ দেয় যমুনা স্টার সেভ গার্ড সার্ভিসেস লিমিটেড। সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর তিন বছরের জন্য চুক্তি করে। নির্ধারিত সময় শেষে এ চুক্তি বহাল রাখার জন্য কলকারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা চায়।
যমুনা স্টার সেভ গার্ড সার্ভিসেস লিমিটেড শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিবকে জানিয়েছে, টেন্ডার ডকুমেন্ট, চুক্তিপত্র ও কার্যাদেশে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, চুক্তির মেয়াদ শেষে পুনরায় চুক্তিটি নবায়ন করা যাবে। তাছাড়া পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা অনুযায়ী চুক্তিটি নবায়নযোগ্য। কিন্তু মহাপরিচালকের প্রস্তাবে সাড়া না দিয়ে চুক্তিপত্র, কার্যাদেশ, প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা উপেক্ষা করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে চুক্তি নবায়নের সুযোগ নেই।
এর আগে যমুনা স্টার সেভ গার্ড সার্ভিসেস লিমিটেড নিজ উদ্যোগে সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিপিইউ) কাছে জানতে চায় চুক্তি বহাল রাখা যায় কি না। জবাবে সিপিপিইউ জানায়, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সেবা নেওয়া পিপিআর অনুযায়ী ভৌত সেবার অন্তর্ভুক্ত। ক্রয়কারী এ সেবা বছরভিত্তিক বা তার চেয়ে কম সময়ের জন্য বাড়াতে পারে। এ ক্ষেত্রে কতবারের জন্য চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো যাবে সে বিষয়ে ক্রয় আইনে বা বিধিতে কোনো সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়নি। তবে কোনো ক্রয় চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হবে কি না এবং হলে কত সময়ের জন্য সেটা একান্তই ক্রয়কারীর এখতিয়ার।
শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ানের সঙ্গে কথা বলার জন্য সচিবালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে লাভ হয়নি। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে শ্রম সচিব কেএম আবদুস সালাম বলেন, ‘বিধি অনুযায়ীই সবকিছু হচ্ছে। বিধির বাইরে কিছু করা হয়নি, হবেও না।’
