শেরপুরে সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান

কৃষকের অ্যাপে নেই কৃষকরা নিয়ন্ত্রণ ফড়িয়াদের হাতেই

আপডেট : ২২ মে ২০২১, ০২:২৯ এএম

মধ্যস্বত্বভোগী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের কারসাজিতে বরাবরাই কৃষকরা ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব সিন্ডিকেটের দাপটে কৃষকরা সরাসরি সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে পারেন না। এমন প্রেক্ষাপটে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনতে অ্যাপের মাধ্যমে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম চালানোর পদক্ষেপ নিয়েছে সরকারের খাদ্য বিভাগ। যে অ্যাপের নাম ‘কৃষকের অ্যাপ’। তবে এ অ্যাপের প্রতি আগ্রহ নেই শেরপুরের কৃষকদের। জেলায় গত ৫ মে আনুষ্ঠানিকভাবে ওই অ্যাপের মাধ্যমে ধান-চাল কেনা শুরু হলেও এখন পর্যন্ত নিবন্ধন করেছেন মাত্র ১৪ হাজার ৫৯৭ জন কৃষক।

কৃষকদের অভিযোগ, প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষকদের জন্য সরকারিভাবে প্রচারের অভাব, খাদ্য গুদামে সিন্ডিকেটের দাপট এবং ধান বিক্রির জন্য সনাতনী শর্তসহ নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে সাধারণ কৃষকরা। এছাড়া অ্যাপের কারিগরি সমস্যার কারণে যে কারও নম্বর দিয়ে যে কেউ নিবন্ধন করতে পারছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। আর এর সুযোগ নিচ্ছেন ফড়িয়ারা, লাভ যাচ্ছে তাদের পকেটে।

এদিকে অ্যাপ ব্যবহারে কৃষকের অনাগ্রহের দায় নিতে নারাজ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে তারা দোষ চাপাচ্ছেন একে অন্যের দপ্তরের ওপর।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, শেরপুরে ২ লাখ ১৫ হাজার কৃষক পরিবারের ৮৫ শতাংশই ধানচাষি। ব্যক্তির হিসাবে শেরপুর জেলায় প্রায় ১০ লাখ ধানচাষি থাকলেও গত ১০ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া নিবন্ধন কার্যক্রমে এক মাসের ব্যবধানে নিবন্ধন করেন মাত্র ১.৪ শতাংশ। অনলাইনে নিবন্ধনের মাধ্যমে জেলার পাঁচ উপজেলাতে ২৪ হাজার ৫২৫ মেট্রিক টন বোরো সেদ্ধ চাল এবং ১২ হাজার ৯৬৭ মেট্রিক টন বোরো ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তবে গত ২০ মে পর্যন্ত চলা নিবন্ধন কার্যক্রমে গড়ে ২ শতাংশ কৃষকের নিবন্ধন কার্যক্রমের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।

জানা গেছে, জেলায় এবার বোরো আবাদ হয়েছে ৯০ হাজার ৬৫৫ হেক্টর জমিতে। এখন চলছে ধান মাড়াইয়ের কাজ। এ বছর জেলায় ৬ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হবে বলে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। সরকারিভাবে বোরো ধান কেনার ক্ষেত্রে শেরপুরে প্রতি কেজি চাল ৪০ এবং প্রতি কেজি ধান ২৭ টাকা দর নির্ধারণ হয়েছে। তবে ধান দিতে হলে কৃষককে মানতে হচ্ছে ১৪ ভাগ আর্দ্রতা নিরূপণের শর্তসহ নানান শর্ত। এই সনাতনী শর্তের কারণে প্রতি বছরের মতো এবারও সরকারের কাছে ধান বিক্রিতে বিপাকে রয়েছে সাধারণ কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, পুরো জেলার প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষকদের মাঝে সরকারিভাবে ধান-চাল বিক্রির বিষয়ে কোনো প্রচারণা চালানো হয়নি। পরিচিত ও সিন্ডিকেটভুক্ত কৃষকদের মাধ্যমে ‘কৃষকের অ্যাপে’ আবেদন করে ধান-চাল বিক্রি করা হচ্ছে।

খাদ্যগুদামের শর্ত জটিলতায় গুদামে ধান বিক্রি করতে পারছেন না প্রকৃত কৃষকরা। এতে সরকার নির্ধারিত প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৮০ টাকায় বিক্রি না করতে পেরে বাজারে বা ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করতে হচ্ছে ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকায়। প্রতি মণে লোকসান হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। প্রকৃত কৃষকের বদলে লাভ যাচ্ছে ফড়িয়াদের পকেটে। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মৌসুমের শুরুতেই জমির ধানের জন্য টাকা অগ্রিম পরিশোধ করে রাখেন (বড় ব্যবসায়ীরা) ফড়িয়ারা। মৌসুম শেষে ধান কেটে নিয়ে তারাই প্রস্তুত করে ওই কৃষকের নামেই নিবন্ধন করে ধান গুদামে বিক্রি করেন। এতে পরিশ্রম ও সময়ের প্রেক্ষাপটে ন্যায্যমূল্য পান না সাধারণ কৃষক। জেলার প্রতিটি উপজেলাতেই এ ফড়িয়াদের সিন্ডিকেট এখন সক্রিয়।

অন্যদিকে ‘কৃষকের অ্যাপে’ও রয়েছে কারিগরি সমস্যা। ওটিপি ছাড়াই নিবন্ধন হওয়ায় যে কারও নম্বর দিয়ে যে কেউ এই নিবন্ধনে অংশ নিতে পারছেন। ধান দেওয়ার পর পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের লোকদের ম্যানেজ করে বিল তুলে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

জেলার এক কৃষক শওকত মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এক পরিবারের পাঁচ ভাইয়ের সবাই আবেদন করছে, পাঁচজনই ধান বেচতাছে। কিন্তু তাদের তিনজন শেরপুরেই থাকে না। ঢাকায় ব্যবসা করে। ব্যবসায়ীরাও আজকে কৃষক হয়া গেছে!’ আরেক কৃষক মিজান মিয়া বলেন, ‘কৃষক না, নিজের জমি নাই, এমন লোকও কৃষকের অ্যাপে আবেদন করছে। আবার নিজের আবাদ নাই, আরেক মিলার বা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সিন্ডিকেট করে ধান এনে বিক্রি করছে কেউ কেউ।’ শেরপুর সদরের কৃষক মজনু মিয়া (৪৫) বলেন, ‘আগে গোডাউনে (খাদ্যগুদাম) কার্ড দিয়া ধান বেচা যাইতো। এখন মোবাইলে আবেদন করা লাগে। এই বিষয়টা সবাই জানেই না। গোডাউনের কোনো লোক আসে নাই, কৃষি অফিসেরও কোনো লোক আসে নাই। আমরা জানমু কেমনে।’

সরকারি দামে গুদামে ধান দিতে সর্বোচ্চ ১৪ ভাগ ময়েশ্চারাইজার বা আর্দ্রতা নিশ্চিত করতে গিয়েও বিপাকে পড়ছেন প্রান্তিক চাষিরা। ময়েশ্চারাইজার সম্পর্কে ধারণা না থাকায় ও বিভিন্ন শর্ত মেনে সরকারিভাবে ধান বিক্রি করতে পারছেন না তারা। চরশেরপুর এলাকার জমেল উদ্দিন (৪৮) বলেন, ‘গোডাউনে ধান দিতে গেলে মুশ্চার ১৪ না হইলে দেওন যায় না। একেক সময় একেক কথা কয় হেরা। কিছুই বুঝি না।’

ঝিনাইগাতী উপজেলার ধানশাইল এলাকার রাকিব মিয়া (৩৮) বলেন, ‘ধান বিক্রির জন্য আবেদন কইরা লাভ কি? ধান নিয়া গেলেই কয় ধানে চিটা আছে, ধানের সাইজ ঠিক নাই। অথচ কয়ডা টেহা দিলেই এই ধান ওরা নিজেরাই সব ঠিক করে নিয়ে নেয়।’ শ্রীবরদীর বকুল চন্দ্র বলেন, ‘ঘরে থেকে যে ধান পাইকররা আরও বেশি দামে কিন্না নিয়া যায়, সেই ধান গুদামে দেওন যায় না। কত নিয়মের কথা যে শোনায়! আবার তাগোরে কিছু খরচাপাতি দিলেই ধান তারা নিয়ে নেয়।’

‘কৃষকের অ্যাপে’ নিবন্ধন করেও গত বছর বিড়ম্বনা পোহাতে হয়েছে অনেককে। শেরপুর সদরের রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘লটারিতে বাছাইয়ের পরও ধান দিতে গেলে ধানের সাইজ, আর্দ্রতা নিয়ে বেশ ভোগান্তি হয়। কিছু সময় সংশ্লিষ্ট দপ্তরের লোকেরাও এ সমস্যাগুলো করে। তারা নিজেরাই অনেক সময় এসব ভোগান্তি সৃষ্টি করে।’

জেলা সদরের কৃষক সোহেল বলেন, ‘গোডাউনে গাড়ি ঢুকতে বেরোতেও টাকা লাগে। ধানের খলায় ধান শুকায়ে ধান দিলেও তাদের মাপমতো হয় না। ১২ থেকে ১৪ ময়েশ্চার থাকার কথা থাকলেও তারা ১৪-এর নিচে নিতেই চায় না। একটু বৃষ্টি থাকলে তো এইটা অ্যাকুরেট মাপ দেওয়া যায় না। কিন্তু কিছু কিছু কৃষক আছে, যাদের কাছ থেকে এসব নিয়মের বাইরের ধান নেওয়া হয়।’

কৃষকদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মুহিত কুমার দে বলেন, ‘কৃষকের অ্যাপ ব্যবহারের প্রচারণার দায়িত্ব খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের। জেলার মোট জনগোষ্ঠী অনুপাতে প্রয়োজনীয় প্রচারের অভাব রয়েছে। কৃষক তার ধান ন্যায্যমূল্যে বিক্রির চেষ্টা করেন। নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে ধান ন্যায্যমূল্যে বিক্রি সম্ভব হয় না। তাই অনেক সময় কৃষক ক্ষেতে থাকতেই ধান বিক্রি করে দেন। শর্তগুলো সহজ করে কৃষকদের অ্যাপ ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এটা আমাদের সবারই দায়িত্ব।’

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের তথ্যমতে, প্রান্তিক কৃষক পর্যায়ে কৃষকদের অংশগ্রহণে গত বছর অ্যাপ ব্যবহারের মাধ্যমে ৮০ শতাংশ ধান ক্রয় অর্জিত হয়েছে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) মো. ফরহাদ খন্দকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুরো জেলার সব কৃষকই কৃষি বিভাগের আওতাধীন। তারা চাইলে খুব সহজেই আমাদের এ বিষয়গুলো কৃষক পর্যায়ে জানানো সম্ভব। করোনা ইস্যুতে সঠিকভাবে প্রচার সম্ভব হয়নি। আমরা গ্রাম পর্যায়ে মাইকিং ও পোস্টারিং করেছি। আশা করছি নিবন্ধনের সময় বাড়লে নিবন্ধনকারীও বাড়বে।’

সিন্ডিকেটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল সময়ে এসে সিন্ডিকেটের মতো বিষয়ে কথা বলা অর্থহীন। আর আমার দপ্তরের ভেতরে কোনো সিন্ডিকেট নেই। এই সিন্ডিকেট ভাঙার জন্যই অ্যাপে নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালু হয়েছে।’ ধান কেনাবেচা বিষয়ে সিন্ডিকেটের সমস্যা দৃশ্যমান থাকলে লিখিত অভিযোগ বা কৃষকের অ্যাপে অভিযোগ দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত