ভিসি সোবহানের দেওয়া ১৭৫ নিয়োগ বাতিলের সুপারিশ

আপডেট : ২৪ মে ২০২১, ০৪:১০ এএম

শেষ কর্মদিবসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এম আবদুস সোবহানের দেওয়া ১৪১ শিক্ষক-কর্মচারীর নিয়োগকে সম্পূর্ণ অবৈধ বলে তা বাতিলের সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। ‘বিধিবহির্ভূতভাবে’ এই নিয়োগ দেওয়ার জন্য অধ্যাপক সোবহানসহ দোষীদের বিচারের আওতায় আনা এবং তার বিদেশ যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ করেছে কমিটি।

বিদায়ী ভিসি সোবহানের দেওয়া বিতর্কিত ১৪১ নিয়োগ বাতিল ছাড়াও তার মেয়ে সানজানা সোবহান ও জামাই শাহেদ পারভেজসহ আগে দেওয়া আরও ৩৪ জন শিক্ষকের নিয়োগও বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। সব মিলিয়ে ১৭৫ জনের নিয়োগ বাতিলের সুপারিশ করেছে কমিটি। যদিও শেষের ১৪১ জনের মধ্যে ১৩৭ কিংবা ১৩৮ জন যোগদান করেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।

প্রতিবেদনের সুপারিশ সম্পর্কে কিছু না বললেও গতকাল রবিবার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কমিটির আহ্বায়ক বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর। তিনি গতকাল সন্ধ্যায় এ প্রতিবেদককে জানান, ‘নয়টি সুপারিশ করে সকালে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন ২২ পৃষ্ঠার এবং ২৯টি অ্যাটাচমেন্ট রয়েছে।’ অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না এবং নিয়োগ বাতিলের সুপারিশ সম্পর্কে জানতে চাইলে ড. আলমগীর বলেন, ‘এ কথা বলব না। অভিযোগ প্রসঙ্গে যেসব তথ্য-উপাত্ত পেয়েছি তাই।’

ড. মুহাম্মদ আলমগীর বলেন, কমিটি গঠনের এক দিন পর গত ৮ মে তারা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনসহ বিতর্কিত এসব নিয়োগের নথিপত্র সংগ্রহ এবং এর সঙ্গে জড়িত ছাড়াও রাবির বিভিন্ন বিভাগের সভাপতি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্মকর্তা ও প্রগতিশীল ও দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেন।

প্রসঙ্গত, আবদুস সোবহানের শেষ কার্যদিবসে ১৪১ জনের নিয়োগকে কেন্দ্র করে গত ৬ মে রাবি ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের একাধিক গ্রুপ এবং বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে দিনব্যাপী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে ভিসির কার্যালয় ঘেরাও করা হয়। ভিসির বিরুদ্ধে অবৈধ নিয়োগ ও দায়িত্বে থাকাকালীন বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে আন্দোলন চলতে থাকে ক্যাম্পাসে। একপর্যায়ে পুলিশের কড়া পাহারায় ভিসি সোবহান ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন।

অভিযোগ করা হয়েছিল, সর্বশেষ গত ৬ মে শেষ কার্যদিবসের আগের রাতে নয়জন শিক্ষকসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিভিন্ন পদে মোট ১৪১ জনকে নিয়োগ দেন ভিসি সোবহান। এর আগে তিনি উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ নীতিমালা সংশোধন করে নিজের মেয়েজামাইসহ অবৈধ উপায়ে আরও ৩৪ জন শিক্ষককে নিয়োগ দেন।

এ আন্দোলন ও অভিযোগকে আমলে নিয়ে ওইদিনই ওইসব নিয়োগকে অবৈধ ঘোষণা করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক মো. আলমগীর এ কমিটির প্রধান। সেদিন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য ছিল, মেয়াদের শেষ কর্মদিবসে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করে বিভিন্ন পদে অবৈধ ও বিধিবহির্ভূতভাবে জনবল নিয়োগ দিয়েছেন অধ্যাপক সোবহান। এ অবৈধ জনবল নিয়োগের বৈধতার সুযোগ নেই। এজন্য এ অবৈধ নিয়োগ ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার লক্ষ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় এদিন বিকেলে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে ১৪১ জনের নিয়োগকে অবৈধ ঘোষণার পর ইউজিসির সিনিয়র সদস্য প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আলমগীরকে প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন ইউজিসির সদস্য প্রফেসর ড. আবু তাহের, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব জাকির হোসেন আকন্দ ও ইউজিসির পরিচালক জামিনুর রহমান। কমিটিকে অবৈধ এসব নিয়োগে জড়িতদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় সুপারিশ দিতে নির্দেশ দেন।

জানা গেছে, বিতর্কিত এসব নিয়োগের সঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদনে অধ্যাপক সোবহান ও তাকে সহযোগিতাকারী একজন ডেপুটি রেজিস্ট্রার ও দুজন সহকারী রেজিস্ট্রার এবং ভিসির জামাতাকে সরাসরি দায়ী করা হয়েছে। নিয়োগ ঠেকাতে তৎপর না হওয়ায় দুই প্রো-ভিসিকেও দায়ী করা হয়েছে।

কমিটির একজন সদস্য জানান, কমিটি রাবি রেজিস্ট্রার প্রফেসর আবদুস সালাম, বিদায়ী ভিসি ড. সোবহানসহ দুই উপ-উপাচার্য ড. আনন্দ কুমার সাহা ও ড. সিএম জাকারিয়ার বক্তব্য রেকর্ড করেন। জড়িত কর্মকর্তারা কমিটির কাছে দেওয়া বক্তব্যে নিজেদের বিতর্কিত নিয়োগে জড়িত নন বলে দাবি করেছিলেন। তবে ভিসি সোবহান এসব নিয়োগের সব দায় তার বলে নিজেই স্বীকার করেন।

কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করে বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে তারা রবিবার মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছেন। প্রতিবেদনে দেওয়া নয়টি সুপারিশ মন্ত্রণালয়ই বাস্তবায়ন করবে। তারা শুধু বিতর্কিত নিয়োগে জড়িতদের চিহ্নিত ও তাদের দায়দায়িত্ব নিরূপণ করেছেন। কমিটিকে নির্দিষ্টভাবে এ কাজটি করতে বলা হয়েছিল।

জানা গেছে, গত ১০ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় ভিসি সোবহানকে চিঠি দিয়ে তার জামাতার নিয়োগ বাতিলসহ রাবিতে সব ধরনের নিয়োগ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে বিদায়ের এক দিন আগে তিনি ১৪১ জনকে নিয়োগ দেন। এছাড়া ড. সোবহান তার জামাতার নিয়োগ বাতিল করেননি। বরং সিন্ডিকেট সভা ডেকে তা স্থায়ী করেন গত ৩ মে বিদায়ের ঠিক তিন দিন আগে।

তদন্ত কমিটির কাছে দেওয়া সাক্ষ্যে বলা হয়েছে, নিয়োগ তালিকা অনুযায়ী তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী পদে ৮৫ জনের তালিকার মধ্যে ৮২ নম্বরে আছেন ডেপুটি রেজিস্ট্রার ইউসুফ আলীর ছেলে নাহিদ পারভেজের নাম। সিনিয়র সহকারী পদের বিপরীতে নিম্নমান সহকারী হিসেবে সংস্থাপন শাখায় তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। অন্য দুই কর্মকর্তা স্বার্থ ছিল নিজের ভাইদের নিয়োগ নিশ্চিত করা। এর মধ্যে তারিকুল আলমের ভাই রফিকুল আলম সেকশন অফিসার ও আরেক ভাই শরিফুল আলমকে নিম্নমান সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। আর তালিকার ৬৮ নম্বরে থাকা শেখ ফারহানুল ইসলাম, পরিষদ শাখার কর্মকর্তা নিয়োগ পান সহকারী রেজিস্ট্রার মামুন অর রশীদের ভাই।

তদন্ত প্রতিবেদনে এম আবদুস সোবহানের দেওয়া এ অবৈধ নিয়োগের সুবিধাভোগী বেশ কয়েকজন শিক্ষকের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওইসব শিক্ষকের স্ত্রী, সন্তান, জামাতাসহ বিভিন্ন নিকটাত্মীয় অবৈধভাবে নিয়োগ পেয়েছেন এবারে ও আগের বিভিন্ন নিয়োগে। এজন্য অবৈধ এ নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। এছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঘটে যাওয়া এত বড় অবৈধ নিয়োগ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কার্যত কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় রাবির বর্তমান দুই উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমানের নীরব ভূমিকাকেও দায়ী করা হয়েছে।

জানা গেছে, সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের শেষদিনে রবিবার দুপুরে কমিটির সদস্যরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমানের কাছে তদন্ত প্রতিবেদনটি হস্তান্তর করেন।

গত ৫ মে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচর্য অধ্যাপক ড. এম আবদুস সোবহান ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী অ্যাডহক ভিত্তিতে ৯ জন শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ১৪১ জনকে নিয়োগ দেন। নিয়োগ পাওয়া প্রায় সব শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী পরদিন উপাচার্যের মেয়াদের শেষ দিন ৬ মে যোগদান করেন। নিয়োগ দেওয়া শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অধিকাংশই সরাসরি ছাত্রলীগ নেতাকর্মী, আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য এবং মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে অবস্থান নেওয়া পরিবারের সদস্য বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সূত্র জানায়। এ নিয়োগকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় গত ৬ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ নিয়োগ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।

ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক মুহাম্মদ আলমগীরকে আহ্বায়ক করে গঠন করা কমিটির অন্য সদস্যরা হচ্ছেন অধ্যাপক ড. মো. আবু তাহের, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব ড. মো. জাকির হোসেন এবং সদস্য সচিব ইউজিসির পরিচালক মোহাম্মদ জামিনুর রহমান। নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে এক সপ্তাহের মধ্যে। তবে কমিটি দুই সপ্তাহের বেশি সময় পর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত