সারা দেশে সোমবার করোনা রোগী শনাক্তের হার ছিল গড়ে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। কিন্তু আগেরদিন রবিবার সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে শনাক্তের হার ছিল সাতগুণ বেশি ৫৫ শতাংশ। বিপজ্জনকভাবে হারে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়া এবং করোনার ভারতীয় ধরনে সংক্রমণ রোধে মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে আগামী সাত দিন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাজুড়ে ‘সর্বাত্মক লকডাউন’ ঘোষণা করা হয়েছে। লকডাউন চলাকালে সব দোকানপাট ও যান চলাচল বন্ধ থাকবে। রাজশাহী ও নওগাঁ থেকে কোনো যানবাহন চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রবেশ করতে পারবে না, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকেও কোনো যানবাহন জেলার বাইরে যাবে না। তবে রোগী ও অন্য জরুরি সেবাদানকারীর ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য হবে না। এই পদক্ষেপ জরুরি ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে আশঙ্কাজনক হারে সংক্রমণ বাড়তে থাকার ঘটনা কেবল চাঁপাইনবাবগঞ্জেই নয় দেশের আরও কয়েকটি সীমান্তবর্তী জেলাতেও রয়েছে। ঈদের ছুটির সময় থেকেই সীমান্তবর্তী রাজশাহী, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা ও সিলেটেও করোনা সংক্রমণ বেড়েছে। দেশে ইতিমধ্যেই করোনার ভারতীয় ধরন এবং ব্ল্যাক ফাঙ্গাস সংক্রমণের প্রমাণ মেলায় সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে সংক্রমণ বৃদ্ধির খবর খুবই উদ্বেগজনক।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অবশ্য চাঁপাইনবাবগঞ্জে হঠাৎ করে সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত নয়। কিন্তু ঈদের আগে থেকে দেশে চলমান ‘বিধিনিষেধ’ এবং ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ রাখার ঘোষণা সত্ত্বেও বাস্তবিক অর্থে সরকারের নির্দেশাবলি পালনে শিথিলতা দেখা গেছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এই শিথিলতার বিষয়টি সমালোচিতও হয়েছে। এই সময়ে চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়ে আটকেপড়া বাংলাদেশি যাত্রীরা বিশেষ অনুমতি নিয়ে ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে দেশে ফিরছেন। পাশাপাশি স্থলবন্দরগুলোতে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চালু থাকায় অনেকটাই নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলাচল করেছেন ভারতীয় ট্রাকচালক ও তাদের সহকারীরা। এছাড়া পাসপোর্টধারী যাত্রীদের যাতায়াত বন্ধ থাকায় বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের আঁধারে চোরাপথেও অবৈধভাবে অনেকে ভারতে আসা-যাওয়া করছেন। কোনো কোনো জেলায় প্রশাসনের চেষ্টা সত্ত্বেও কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশন মানেনি মানুষ। এসব কারণে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে করোনার ভারতীয় ধরনের ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আগে থেকেই ছিল। ফলে এখন সীমান্তের জেলাগুলোতে দ্রুত সংক্রমণ বাড়তে থাকার ঘটনাকে আকস্মিক বলা যাবে না। প্রশ্ন হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জের পরিস্থিতি থেকে সীমান্তবর্তী বাকি জেলাগুলোতে কঠোর নিয়ন্ত্রণের দিকে প্রশাসন যাচ্ছে কি না?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে সংক্রমণ বেশি, রোগী বেশি পাওয়া যাওয়ায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অন্য স্থানগুলোতেও যদি সংক্রমণ ২০-২৫ শতাংশে চলে যায়, সেখানেও নিশ্চয় একইরকম ব্যবস্থা করা হবে। এক্ষেত্রে প্রশ্ন থেকে যায় যে, সংক্রমণের হার বাড়ার অপেক্ষায় না থেকে প্রশাসন কেন এখনই সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে সংক্রমণ প্রতিরোধের উদ্যোগ বাস্তবায়নে কঠোর হচ্ছে না। বিশেষত, সীমান্ত পারাপারকারীদের করোনা সনদ পরীক্ষা এবং কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশনে থাকা নিশ্চিত করতে নজরদারি ও তদারকি জোরদার কার হচ্ছে না কেন? একইসঙ্গে এসব বিধিনিষেধের দেশের অভ্যন্তরেও জোরদার করা জরুরি। এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতির সঞ্চার না করে স্থানীয় মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে কীভাবে জনপ্রতিনিধিদের আরও সক্রিয় ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করা যায় সেটা ভাবা জরুরি। তাহলে স্থানীয়ভাবে বিধিনিষেধ বাস্তবায়ন আরও সহজ হওয়ার কথা। লক্ষ করা দরকার যশোরের বেনাপোল, দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর এবং দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর ভোমরা দিয়েও পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রাকচালক ও তাদের সহকারীদের যাতায়াত আছে। কিন্তু পণ্যবাহী ট্রাকের ভারতীয় চালক-হেলপাররা যেমন করোনা সনদ ছাড়াই দেশে প্রবেশ করছে তেমনি বাংলাদেশি ট্রাকের চালক- হেলপাররাও দেশে ফিরে কোয়ারেন্টাইনের বিধান মানছেন না। ফলে স্থলবন্দর এলাকাগুলোতে করোনার ভারতীয় ধরনের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আতঙ্ক বিরাজ করছে। একইভাবে উদ্বেগ বেড়েছে আখাউড়া স্থলবন্দরসহ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট সীমান্তের স্থলবন্দরগুলোতেও। এই পরিস্থিতিতে সীমান্তবর্তী জেলাগুলো এবং স্থলবন্দরগুলোতে যুগপৎভাবে বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে কঠোর হওয়া প্রয়োজন।
বিদ্যমান বাস্তবতায় এপ্রিলের শুরু থেকে জারি করা চলমান বিধিনিষেধ আরও এক সপ্তাহ বাড়িয়ে ৩০ মে পর্যন্ত বলবৎ রাখার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। কিন্তু এরই মধ্যে গণপরিবহন ও হোটেল-রেস্তোরাঁর ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ট্রেন ও বাসে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার চেষ্টা থাকলেও নৌপথে স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। সন্দেহ নেই যে, বিপুল সংখ্যক মানুষের এমন অবাধ চলাচল বিপদ ডেকে আনতে পারে। এদিকে দেশে করোনায় মৃত্যুর হারও হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। সর্বশেষ চব্বিশ ঘণ্টায় সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত মারা গেছেন ৪০ জন। অন্যদিকে, ভারতে দ্রুতগতিতে ছড়াতে থাকা ব্ল্যাক ফাঙ্গাস বা কালো ছত্রাকের সংক্রমণ থেকে মঙ্গলবারই দেশে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এমতাবস্থায় সীমান্তবর্তী জেলাগুলোসহ দেশের অভ্যন্তরেও সংক্রমণ প্রতিরোধে নজরদারি বাড়ানো এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় সক্রিয়তা জোরদার করা জরুরি।
