লালমনিরহাটে সরকারি বিধি উপেক্ষা করে সপ্তাহখানেক আগে ই-জিপির (ইলেকট্রনিক গভর্মেন্ট প্রকিউরমেন্ট) বদলে ‘ম্যানুয়েল’ পদ্ধতিতে প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) দরপত্র কার্যক্রমের রেশ না কাটতেই আরও একটি কারসাজির ঘটনা ঘটেছে একই দপ্তরে। এবার ই-জিপিতে দরপত্র আহ্বান করা হলেও লটারি অনুষ্ঠিত হয়েছে ম্যানুয়েল বা সনাতন পদ্ধতিতে। ওই পদ্ধতিতে প্রায় আড়াই কোটি টাকার দুটি দরপত্রের বিপরীতে লটারি করে কাজগুলো ‘ভাগাভাগি’ করা হয়েছে। এলজিইডির সদর উপজেলা প্রকৌশলী দরপত্র দুটি আহ্বান করেছিলেন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরের দিকে উপজেলা পরিষদ হলরুমে ওই লটারি অনুষ্ঠিত হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন সাধারণ ঠিকাদাররা।
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ‘বিধি মোতাবেক লটারি’ আয়োজনের দাবি করলেও তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট (সিপিটিউ) এটিকে ‘অনিয়ম’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। অভিযোগ উঠেছে, ওই দরপত্রে যাতে বেশিসংখ্যক ঠিকাদার অংশগ্রহণ করতে না পারে এবং লালমনিরহাট শহর ও সদর উপজেলার অল্প কিছু ঠিকাদার যাতে কাজগুলো পান সেজন্য দরপত্র আহ্বান থেকে লটারি পর্যন্ত নানা কৌশল গ্রহণ করা হয়েছিল।
সদর উপজেলা এলজিইডি কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ মে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় লালমনিরহাট সদর উপজেলায় কালভার্ট, রাস্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তোরণ নির্মাণসহ ২২টি বিভিন্ন কাজের জন্য ই-জিপিতে দরপত্র আহ্বান করেন উপজেলা প্রকৌশলী শাহ মো. ওবায়দুর রহমান। এসব কাজের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৯ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। অন্যদিকে একই দিন অন্য ২৯টি কাজের জন্য পৃথক একটি দরপত্র আহ্বান করা হয়, যার প্রাক্কলিত ব্যয় ১ কোটি ৩২ লাখ টাকা। দরপত্র কমিটির আহ্বায়ক হলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও), সদস্য সচিব উপজেলা প্রকৌশলী এবং উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হচ্ছেন অনুমোদনকারী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই দরপত্র দুটির বিজ্ঞপ্তি যথারীতি পত্রিকায় প্রকাশ করা হলেও ই-জিপি আইডি কৌশলে প্রকাশ করা হয়নি। দরপত্র দুটি খোলার জন্য গত ২০ মে দিন নির্ধারিত থাকলেও তা খোলা হয়েছে গতকাল। সবচেয়ে বড় যে অনিয়ম করা হয়েছে তা হলো বিধি মোতাবেক ই-জিপিতে অংশ নেওয়া ঠিকাদারদের নিয়ে অনলাইনেই লটারি অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও তা করা হয়েছে ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে। যদিও ২০১২ সালে জারি করা সরকারি এক পরিপত্রে বলা হয়েছে, ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে লটারির কোনো সুযোগ নেই।
এলজিইডি কর্মকর্তা ও জেলার একাধিক ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলার অন্যান্য উপজেলা এবং জেলার বাইরের ঠিকাদাররা যাতে দরপত্র দুটিতে অংশ নিতে না পারেন সেজন্য প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে কাজের আইডি প্রকাশই করা হয়নি। ফলে ঠিকাদারদের একটি অংশ ছাড়া অন্যরা এতে অংশ নিতে পারেননি। আর ওই অংশটিই উপজেলা প্রকৌশলীসহ দরপত্র কমিটির সঙ্গে যোগসাজশে নীতিমালা লঙ্ঘন করে ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে লোক দেখানো লটারি সম্পন্ন করে কাজগুলো ভাগাভাগি করে নিয়েছেন।
গতকাল সরেজমিন দেখা গেছে, উপজেলা পরিষদ হলরুমে আয়োজন করা হয়েছে দরপত্র দুটির লটারির। এজন্য রাখা হয়েছে খাঁচাসদৃশ লটারি বক্স। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান সুজন, ইউএনও উত্তম কুমার রায়, পৌর মেয়র রেজাউল করিম স্বপন ও উপজেলা প্রকৌশলী শাহ মো. ওবায়দুর রহমান। এ সময় সেখানে বেশ কয়েকজন ঠিকাদারসহ এলজিইডির সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। দুপুর ১২টার দিকে লটারি শুরু হওয়ার আগে জুয়েল শেখ নামে একজন ঠিকাদার ম্যানুয়েল পদ্ধতির লটারির বিরোধিতা করলেও সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি আমলে নেননি। পরে ইউএনও বাক্স খুলে লটারির উদ্বোধন করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লালমনিরহাট উপজেলা প্রশাসনের দুজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি চরম অন্যায়। ই-জিপি পদ্ধতিতে টেন্ডার করে সনাতন পদ্ধতিতে লটারিÑ আইনে কোনোভাবেই পারমিট (অনুমোদন) করে না।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে এলজিইডির সদর উপজেলা প্রকৌশলী শাহ মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, ‘বিধি অনুযায়ী ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে লটারি করা হয়েছে।’ আর সদর উপজেলার ইউএনও উত্তম কুমার রায়ের দাবি, সার্ভারের সমস্যার কারণে উপস্থিত সবার সম্মতিতে ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে লটারি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তবে লালমনিরহাট এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফ আলী খান দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘ই-জিপির মাধ্যমে আহ্বানকৃত টেন্ডারে ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে লটারির কোনো সুযোগ নেই।’
