কর আদায় সহজ, আধুনিক ও দুর্নীতিমুক্ত হোক

আপডেট : ২৯ মে ২০২১, ১০:২৮ পিএম

সংবিধানের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিকের গুরুত্ব, মর্যাদা ও অধিকার সমান। প্রত্যেক নাগরিকের জন্য বিভিন্ন সেবা নিশ্চিত করা যেমন রাষ্ট্রের কাজ, তেমনি ন্যায্যতার ভিত্তিতে কর আদায় করাটাও রাষ্ট্রের একটি অপরিহার্য দায়িত্ব। একটি রাষ্ট্রের করব্যবস্থা কতটা ন্যায্য, তার ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রের চরিত্র। রাষ্ট্র কতটা সুশীল, কতটা কল্যাণমুখী ও মানবিক তা অনেকাংশেই নির্ভর করে সেই দেশের মানুষ কতটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর দেয়, বিনিময়ে তারা কতটা রাষ্ট্রীয় সেবা পায় তার ওপর। সামর্থ্য অনুযায়ী নাগরিকদের কাছ থেকে যেমন কর আদায় করতে হবে, সেই সঙ্গে করের টাকার যেন অপচয় না হয়, সাধারণ মানুষ যেন সরকারি সেবাগুলো সহজে পায়, পাশাপাশি করের ভারে জর্জরিত না হয়ে পড়ে, এসব নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

কিন্তু দেখা যায় আমাদের দেশের কর ব্যবস্থা ন্যায্যতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয় না। বড়লোকরা নানাভাবে কর ফাঁকি দেয়। আবার তাদের জন্য রয়েছে কর রেয়াতের নানা ব্যবস্থা। পক্ষান্তরে গরিবদের প্রতিনিয়ত পরোক্ষ করের বোঝা বইতে হয়। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রেও তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বঞ্চিত থাকে।

নাগরিকের কর ও তার যথাযথ ব্যবহারের ওপরই একটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন নির্ভর করে। উন্নত দেশগুলোয় রাজস্ব আহরণের প্রধান উৎস হচ্ছে প্রত্যক্ষ কর। কিন্তু আমাদের দেশে প্রত্যক্ষ কর আহরণের আওতা মোটেও বাড়েনি। কর বাবদ সরকারের যে আয় হয়, তার ৭০ শতাংশ হচ্ছে পরোক্ষ কর, যা মূলত ভ্যাটের মাধ্যমে সাধারণ জনগণের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। আর বাকি ৩০ শতাংশ আয়করের বেশির ভাগ মধ্যবিত্ত দিয়ে থাকেন। বাংলাদেশে বর্তমানে আয়কর বা প্রত্যক্ষ করের অবদান মাত্র ৩০ ভাগ হলেও ভারতে তা ৫৬ ভাগ। আর মালয়েশিয়ায় প্রত্যক্ষ করের পরিমাণ ৭৫ ভাগ। সব উন্নত দেশেই প্রত্যক্ষ করের পরিমাণ পরোক্ষ করের চেয়ে অনেক বেশি।

দেশে করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ বার্ষিক ৩ লাখ টাকার বেশি আয় হলে যে কেউ আয়করের আওতায় আসবে। এ হিসাবে দেশের অন্তত ৩ থেকে ৪ কোটি লোকের আয়কর দেওয়ার কথা। কিন্তু এদের বেশির ভাগই করের আওতার বাইরে। আর যারা করের আওতার মধ্যে আছে তারা নিয়মিত কর পরিশোধ করে না। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে এখন নিবন্ধিত বা কর শনাক্তকারী নম্বরধারীর (টিআইএন) সংখ্যা ৬১ লাখ হলেও আয়কর রিটার্ন জমা দেন মাত্র ২৫ লাখ। এর মধ্যে কমপক্ষে ৩ লাখ রিটার্ন আছে, যাদের কর শূন্য। তাদের কাছ থেকে কোনো কর পায় না সরকার। ফলে নিয়মিত রিটার্ন দিচ্ছে মাত্র ২২ লাখ। কারা কর দিচ্ছেন না, ঠিক ধরতে পারছে না সরকার। আমাদের দেশের করব্যবস্থার এটা একটা বড় দুর্বলতা।

সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, আমাদের দেশে শীর্ষ করদাতাদের মধ্যে হাকিমপুরীর জর্দার স্বত্বাধিকারী কাউস মিয়ার নাম ছাড়া বড় কোনো ব্যবসায়ী বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নাম খুঁজে পাওয়া যায় না। দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা কেউই সর্বোচ্চ করদাতা নন। অর্থাৎ যাদের আয় বেশি, তারাই বেশি কর পরিশোধে পিছিয়ে রয়েছেন। কর ফাঁকি দিচ্ছেন। যারা আয়কর সীমার মধ্যে রয়েছে, তাদের কাছে কর আদায় করতে না পারাটা সরকারের একটা বড় ব্যর্থতা।

কর আদায়ে এই ব্যর্থতা, বৈষম্য ও দুর্নীতির কারণে সৎ নাগরিকদের মধ্যে কর প্রদানে এক ধরনের অনীহা রয়েছে। এর কারণও স্পষ্ট। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমি বেসরকারি চাকরি করে যা আয়কর দিই, আমার অপর এক ব্যবসায়ী বন্ধু আমার চেয়ে অন্তত দশ গুণ বেশি রোজগার করে একই পরিমাণ আয়কর দেন। তার কয়েকটা বাড়ি, দামি গাড়ি, প্রচুর গহনা, দশটা ক্রেডিট কার্ড, ডিজিটাল বাংলাদেশের দৌলতে এখন তিনিও ক্যাশলেস। তিনি যদি আমার মতোই তার গোটা আয়ের ওপর কর দিতেন, তবে তার মোট আয়করের পরিমাণ আমার দেওয়া করের তুলনায় ঢের বেশি হতো। তিনি দেননি বা সরকার তাকে সেই কর দিতে বাধ্য করতে পারেনি। তাতে এটাই দাঁড়াল যে আমার রোজগারের একটা অংশ সরকারের ঘরে চলে গেল, কিন্তু আমার বন্ধুর টাকা তার নিজের হাতেই থাকল। এতে সরকার বঞ্চিত হলো, আমার মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হলো। আসলে বাংলাদেশের করব্যবস্থা এখনো অন্যায্য ও অপরিকল্পিত। যার গতি নেই, সে দিচ্ছে; না দিয়েও যাদের উপায় আছে, তারা দিচ্ছে না। এ প্রবণতা বাংলাদেশের কর-সংস্কৃতির বড় দুর্বলতা।

বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত সমপর্যায়ের অনেক দেশের তুলনায় বেশ কম। সক্ষম সব করদাতা এবং প্রযোজ্য সব খাত করজালের আওতায় আসেনি। যেকোনো দেশে জিডিপির অন্তত ১৫-১৬ শতাংশ কর হিসেবে আহরিত হয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় আট দেশের মধ্যে সবার নিচে। আমাদের কর জিডিপির অনুপাত ১০-১১ শতাংশের মধ্যে দীর্ঘদিন ঘোরাফেরা করছে। এ বছর কভিডসহ নানা কারণে তা ৭-এ নেমে এসেছে, যা ছিল ১৪ বছর আগে। সহজে কর আদায় করা যায়, এমন পথেই হাঁটার কারণে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উভয় শ্রেণির সংখ্যা ও রাজস্বের পরিমাণ গত কয়েক বছরে খুব বেশি বাড়াতে পারেনি এনবিআর। মূলত তিনটি কারণে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত অনেক কম। প্রথমত, আওতার সীমাবদ্ধতা, পরিধিগত ঘাটতি। সব যোগ্য করদাতা ও খাতকে করজালের মধ্যে আনার দীর্ঘসূত্রতা বা ক্ষেত্রবিশেষে অপারগতা বা অক্ষমতা। দ্বিতীয়ত, ব্যাপক করছাড়, কর রেয়াত, কর ফাঁকি, মামলায় আটকানো, কর্তন কিংবা আদায় করা কর রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা না হওয়া। তৃতীয়ত, কর আদায়ে সৃজনশীল উদ্যোগ, গবেষণা, রাজস্ব বিভাগের দক্ষ লোকবলের অভাব, অদক্ষতা, অপারগতা, অসততা, মনিটরিংয়ের দুর্বলতা, কর আইন ও আহরণ ও প্রদান পদ্ধতির জটিলতা।

কর আদায়ে কাঠামোগত সংস্কারের কথা অনেক দিন ধরেই উচ্চারিত হচ্ছে। বলা হচ্ছে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু বা অটোমেশনের কথাও। কিন্তু এ ব্যাপারে তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। কর দেওয়ায় হয়রানি কমাতে নব্বইয়ের দশক থেকেই অটোমেশন ব্যবস্থার নানা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একমাত্র ব্যক্তিশ্রেণির টিআইএন গ্রহণ ছাড়া অন্য কোনো সুবিধাই স্বয়ংক্রিয় হয়নি। অনলাইনের ভ্যাট রিটার্ন দেওয়ার ব্যবস্থাও বন্ধ হয়ে গেছে। গ্রিন চ্যানেলের মতো সুবিধা দেওয়ার জন্য অথরাইজ ইকোনমিক অপারেটর (এইও) ব্যবস্থাও নিয়মিত করা যায়নি। করের টাকা যে সরকার সত্যি সত্যিই জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করছে তাও সরকার স্পষ্ট করতে পারেনি।

আমাদের দেশে কর প্রশাসনের যে অবকাঠামো তাতে দূর-দূরান্তের গ্রাম তো দূরের কথা বড় বড় গুটিকয় শহর-বন্দর বাদ দিলে অনেক ছোট শহর ও বাণিজ্যকেন্দ্রেও তার উপস্থিতি একেবারেই নেই। কর আদায়ের জন্য পর্যাপ্ত জনবল না থাকার ফলে অনেক সম্ভাব্য করই ওইসব এলাকায় অনাদায়ি থেকে যায়। রাজধানী ঢাকা মহানগরের কথাই যদি ধরা যায় তাহলেও দেখা যাবে অবস্থা খুব একটা সন্তোষজনক নয়। সুসংগঠিত কতিপয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প-কারখানা কিংবা সেবাদানকারীরা নিয়মিত কর দেন কিংবা দিতে বাধ্য হন। তাদের মধ্যেও কেউ কেউ যে কর ফাঁকি দেন না এমন কথা কেউই হলফ করে বলতে পারবে না। তবু কর প্রশাসনের আওতায় তারা আছেন। কিন্তু কর দেওয়া যাদের জন্য আইনানুযায়ী বাধ্যতামূলক এমন অনেক ব্যবসায়ী, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এমনকি চাকরিজীবীও এই ঢাকায়ও কোনো ধরনের কর দেন না। এর একাংশ ঘটে কর প্রশাসনের যোগসাজশে আর একাংশ তাদের নাগালের বাইরে থাকে বলে। সুতরাং যত দ্রুত সম্ভব কর প্রশাসনকে দক্ষ, দুর্নীতিমুক্ত ও এর প্রশাসনিক কাঠামো বিস্তৃততর করা অত্যন্ত জরুরি। কর ব্যবস্থায় একটি বড় সমস্যা হলো তথ্যপ্রযুক্তির অভাব। আমাদের বর্তমান কর প্রশাসন অনেকটা মান্ধাতা আমলের। আইনগত অনেক পরিবর্তন সত্ত্বেও স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে কর প্রশাসনে সামগ্রিক কোনো সংস্কার হয়নি।

এই বাস্তবতায় কর আদায়ে ব্যাপক ও কার্যকর সংস্কার আনতে হবে। পাশাপাশি শিল্পপতিদের হাতে ব্যাংক ও বীমাব্যবস্থার মালিকানা যাতে কেন্দ্রীভূত না হয়, সেজন্য প্রয়োজনীয় বিধিবিধান প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। অনেক দেশে এখন ‘ফেইসলেস ট্যাক্স অ্যাসেসমেন্ট’ প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হচ্ছে। যেখানে করদাতা ও আয়কর অফিসার, কেউ কাউকে চিনবেন না, মুখোমুখি হবেন না। পুরো প্রক্রিয়াটিই হবে অনলাইনে। এমনকি কেউ কম কর জমা করলে অফিসাররা তাকে ডেকে পাঠিয়ে জবাব চাইবেন না। পুরো প্রক্রিয়াই ই-মেইল মারফত হবে। যত দ্রুত সম্ভব আমাদের এ ধরনের আধুনিক ব্যবস্থার দিকে যেতে হবে।

লেখক লেখক ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত