প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের খাত। অথচ বছরের পর বছর ধরে প্রবাসীদের উন্নয়নে সরকারের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই বললেই চলে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কর্মীর দক্ষতা উন্নয়ন, উন্নত কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক সেবা বাড়ানোর বিষয়গুলো আলোচনার টেবিলেই ঘুরপাক খাচ্ছে। জাতীয় বাজেটে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সর্বনিম্ন বরাদ্দ পাওয়া তিনটি মন্ত্রণালয়ের একটি। ফলে আসন্ন ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে প্রবাসী উন্নয়নের বাজেট দাবি করেছেন অভিবাসন খাতসংশ্লিষ্টরা। তবে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, প্রবাসীদের উন্নয়নের দিকটি পরিকল্পনাগতভাবে পিছিয়ে থাকায় আসন্ন অর্থবছরেও গতানুগতিক বরাদ্দই থাকছে।
সর্বনিম্ন তৃতীয় বরাদ্দ প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে : কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের ১০ মাসেই রেমিট্যান্স (জুলাই-এপ্রিল) এসেছে ২ হাজার ৬৭ কোটি ডলারের বেশি। দেশের সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের খাত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। অথচ এই প্রবাসী কর্মীদের উন্নয়নে বাজেটে বরাদ্দ নেই বললেই চলে। বাজেটে যেসব মন্ত্রণালয় বরাদ্দ তালিকায় সবার তলানিতে থাকে তার মধ্যে অন্যতম প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় (নিচ থেকে তৃতীয়)। চলতি অর্থবছরে এই মন্ত্রণালয় পেয়েছে ৬৪১ কোটি টাকা, যার বেশির ভাগই খরচ হয়েছে অবকাঠামো ও পরিচালন ব্যয়ে।
সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, প্রবাসীরা ব্যক্তি খাতের লোক। তারা যে অর্থ পাঠান, সরকার সেটি সরাসরি পায় না। তারপরও সরকার রেমিট্যান্সের ওপর ২ শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছে। তবে গবেষণার মাধ্যমে বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন শামসুল আলম।
নিঃস্ব হয়ে ফেরা চার লাখ প্রবাসীর জন্য উদ্যোগ সীমিত : গত বছরের মার্চে গোটা পৃথিবীতে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে লাখ লাখ প্রবাসী কর্মী কাজ হারান। তাদের মধ্যে নিঃস্ব অবস্থায় দেশে ফিরতে বাধ্য হন দুই লাখের বেশি। এরপর জুনে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে এই প্রবাসীদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির দাবি ওঠে। এরপর কর্ম হারিয়ে দেশে ফেরা প্রবাসীদের জন্য বাজেটে প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্প সুদে ৭০০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণের ঘোষণা দেয় সরকার। কিন্তু বছর শেষে এই অর্থের মাত্র ১৪৮ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। দেশ রূপান্তরের কাছে বেশ কয়েকজন বিদেশফেরত বলেছেন, তারা অনেক ঘুরেও নানা জটিলতায় ঋণ পাননি।
এ বিষয়ে জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বায়রার সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, সহজ শর্তের কথা বলে ঋণ পাওয়া আরও কঠিন করা হয়েছে। শিল্পপতিরা হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণখেলাপি অথচ নিঃস্ব প্রবাসীদের মাত্র ৭০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার ঝুঁকি নিতে চাইছে না সরকার।
অভিবাসন নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর হিসাব বলছে, গত বছরের সঙ্গে হিসাব করলে করোনার প্রায় দেড় বছরে অন্তত চার লাখ প্রবাসী দেশে ফিরেছেন। যাদের দুই-তৃতীয়াংশই প্রায় নিঃস্ব। অভিবাসন নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) সাম্প্রতিক এক হিসাব অনুযায়ী, করোনায় দেশে ফেরা প্রবাসী প্রায় সাড়ে তিন লাখ। এ ছাড়া ভিসা করেও প্রায় দেড় লাখ ব্যক্তি বিদেশে যেতে পারেননি। ফলে তারাও সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
প্রায় একই সময়ে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এক গবেষণায় জানায়, দেশে ফেরা প্রবাসীদের ৭০ শতাংশ জীবিকার সংকটে রয়েছেন। রেমিট্যান্স বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলেও ৬১ শতাংশ পরিবার রেমিট্যান্স পায়নি। ৮৭ শতাংশের আয় নেই। ফলে তারা পরিবার নিয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসফেরত ব্যক্তিদের নাম নিবন্ধন, প্রশিক্ষণের জন্য জেলায় জেলায় কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। আসন্ন বাজেটে রেমিট্যান্সের ওপর সরকারের প্রণোদনা ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪ শতাংশ করতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন ও অর্থ বিভাগ) শহিদুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, বরাদ্দ বাড়ালেই তো হয় না, গুণগত ব্যয়ের সক্ষমতাও থাকতে হবে। আধুনিক মানসম্পন্ন কর্মী তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ, বাজার, ট্রেড সবকিছু ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। এ জন্য শক্তিশালী পরিকল্পনা দরকার। মন্ত্রণালয় সেগুলো করছে। এবার বাজেট না বাড়লেও হয়তো সামনে বাড়বে।
প্রবাসী মানবসম্পদ উন্নয়নের বাজেট চাই : বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিয়ে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বরাবর যে অভিযোগটি তোলেন সেটি হলো, অদক্ষতা। অর্থাৎ বিদেশে কাজের মান অনুযায়ী কর্মী তৈরি করতে না পারা। এ ছাড়া, ভাষাগত অদক্ষতা, আইনকানুন না জানাসহ ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশি শ্রমিকরা বিদেশে অত্যন্ত নিম্ন মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হন। মালিকের নির্যাতন, বেতন না পাওয়াসহ নানা প্রতারণাও তাদের নিত্য সঙ্গী। এই অদক্ষতার কারণে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার শুধু মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিকমানের দক্ষ শ্রমশক্তির অভাবে প্রচুর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার শ্রমবাজারে প্রবেশ করা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আন্তর্জাতিক শ্রম খাতে বাংলাদেশের ৭টি প্রধান সমস্যা চিহ্নিত করে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ আসন্ন বাজেটে বড় বরাদ্দ দাবি করেছেন। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, প্রথম সরকারের ৬০টি প্রশিক্ষণকেন্দ্র দক্ষ কর্মী তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। এসব সরকারি-বেসরকারি মালিকানায় ছেড়ে দিয়ে প্রচুর বিনিয়োগ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিদেশ গমনের আগে প্রবাসীদের বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স মওকুফ করতে হবে। তৃতীয়ত, এয়ারলাইনস ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার শ্রমিকদের জন্য এ খাতে বিশেষ বরাদ্দ দেবে। চতুর্থত, প্রবাসীরা যে রেমিট্যান্স পাঠান, সেখান থেকে একটি নির্দিষ্ট অংশ এবং সরকারের একটি অংশ বরাদ্দ দিয়ে একটি প্রকল্প করতে হবে। যেন প্রবাসীরা দেশে ফিরে নিঃস্ব না হয়ে যান। পঞ্চমত, প্রবাসীরা বিদেশে যে কাজ করবেন, সেই কাজ যেন দেশেও এসে করতে পারেন, এ জন্য সে রকম প্রকল্প নিতে হবে। ষষ্ঠত, পাসপোর্ট ফি মওকুফ ও সহজসাধ্য করতে হবে। পোশাক ও চামড়াশিল্প নগরীর আদলে রিক্রুটিং এজেন্সি ট্রেনিং পল্লী গড়ে তুলতে হবে।
এ প্রসঙ্গে বায়রার সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী বলেন, আমাদের কারিগরি প্রশিক্ষণ ল্যাব ও ইনস্টিটিউট দরকার। শ্রীলঙ্কা, ফিলিপিন তারা এ খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। অথচ আমাদের সরকার অর্থ ব্যয়ের খাত খুঁজে পায় না। শ্রমবাজার নিয়ে আমাদের ব্যাপক গবেষণা দরকার। এ খাতেও প্রচুর টাকা দরকার। বিদেশে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায়ও প্রচুর বিনিয়োগ দরকার।
