করোনাকে গুরুত্ব দিয়ে বরাদ্দ বাড়ল স্বাস্থ্যে

আপডেট : ০৪ জুন ২০২১, ০২:২৪ এএম

করোনা মহামারীর বাস্তবতায় আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এই খাতের জন্য ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা পুরো বাজেটের ৫ দশমিক ৪ শতাংশ এবং চলতি অর্থবছরের বাজেটের প্রস্তাবিত বরাদ্দের চেয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা বেশি। আর সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ১ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা বেশি। প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দের প্রায় ৫২ ভাগ রাখা হয়েছে পরিচালন ব্যয় হিসেবে এবং বাকি ৪৮ ভাগ উন্নয়ন ব্যয় (এডিপি)। সকল নাগরিকের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং করোনা মহামারী মোকাবিলায় জরুরি কার্যক্রম বাস্তবায়নে এ বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করা হবে। অন্যদিকে করোনা মোকাবিলায় জরুরি চাহিদা মেটাতে গতবারের মতো এবারও ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন ও আমদানিতে কর মওকুফ করা হয়েছে।

গতকাল জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট। ইতিহাসের বৃহত্তম এই বাজেটের আকার ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। ‘জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে সুদৃঢ় আগামীর পথে বাংলাদেশ’ শিরোনামের এই বাজেটে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে করোনাভাইরাস অভিঘাত থেকে মোকাবিলার বিষয়টি। স্বাস্থ্য খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে আগামী বাজেটে নতুন করে কর অবকাশ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।

আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্যের মোট বরাদ্দের ৭৯ শতাংশ রাখা হয়েছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে এবং ২১ শতাংশ স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মোট বরাদ্দ ২৫ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা, যার মধ্যে পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন ব্যয় (এডিপি) ১৩ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে মোট বরাদ্দ ৬ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিচালন ব্যয় ৪ হাজার ২৫৯ কোটি ও উন্নয়ন ব্যয় ২ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা। এদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে মেডিকেল ডিভাইস উৎপাদনে ব্যবহৃত উপকরণ আমদানি, অ্যান্টি-ক্যানসার ওষুধ প্রস্তুত এবং ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে কর রেয়াতি (মওকুফ) সুবিধা প্রদান করা হয়েছে।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী করোনা মহামারী মোকাবিলায় সরকারের নানা কর্মকান্ডের কথা তুলে ধরেন এবং আগামী বাজেটে স্বাস্থ্য খাতকে সর্বাপেক্ষা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, করোনার প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা এবং জীবন ও জীবিকাকে প্রাধান্য দিয়ে আগামী বাজেটে স্বাস্থ্য খাতকে সর্বাপেক্ষা অগ্রাধিকার প্রদান করে এ খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া কভিড-১৯ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজসমূহের বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখাকে দ্বিতীয় অগ্রাধিকার খাত হিসেবে উল্লেখ করেন।

প্রস্তাবিত বাজেটে বলা হয়েছে, রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ এবং বিভাগীয় শহরের বাইরে হাসপাতাল-ক্লিনিক নির্মাণে বিনিয়োগ করলে ১০ বছরের কর অবকাশ সুবিধা দেওয়া হবে। ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এ সুযোগ মিলবে। পাশাপাশি সরকারি সব হাসপাতালকে অত্যাধুনিক করা হবে। আইসিইউ, ভেন্টিলেটরসহ করোনা মোকাবিলার পর্যাপ্ত সামগ্রী কেনা হবে। এছাড়া করোনা মোকাবিলায় নতুন ২ হাজার চিকিৎসক, ৬ হাজার নার্স এবং ৭৩২ জন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। এদের জন্য আসছে বাজেটে ৫০০ কোটি টাকা রাখা হচ্ছে।

করোনা মোকাবিলায় ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ : গত বাজেটের ন্যায় আগামী বাজেটেও করোনা মোকাবিলায় ১০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, ‘বছর ঘুরে এলেও করোনা মহামারীর ভয়াবহ প্রকোপ এখনো বিদ্যমান। ফলে আগামী অর্থবছরেও কভিড-১৯ মোকাবিলায় জরুরি চাহিদা মেটানোর জন্য পুনরায় ১০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দের প্রস্তাব করছি।’ অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের সকল নাগরিককে বিনামূল্যে টিকা প্রদান নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ডোজ সংগ্রহের জন্য যত টাকাই লাগুক সরকার প্রদান করবে। সে লক্ষ্যে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এছাড়া স্বাস্থ্য খাতের টেকসই অর্জন ও ভবিষ্যতে মহামারীর আঘাত থেকে রক্ষা পেতে গতবারের মতো স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রযুক্তি খাতে গবেষণার জন্য এবারও ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।

প্রস্তাবিত বাজেট পেশকালে অর্থমন্ত্রী বলেন, সমন্বিত স্বাস্থ্য-বিজ্ঞান গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিল থেকে করোনাভাইরাস, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ বিভিন্ন ভাইরাসের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা শিক্ষার বিষয়ে গবেষণার সুযোগ থাকবে। তহবিলটি কার্যকর করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, আগামী দিনের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ভর করবে ভ্যাক্সিনেশন বা টিকার ওপর। যত দ্রুত সর্বসাধারণকে টিকার আওতায় আনা যাবে, অর্থনীতির মঙ্গলের সম্ভাবনা ততটাই বাড়বে। টিকা সংগ্রহে অর্থায়নের সমস্যা নেই, প্রয়োগের অভিজ্ঞতাও রয়েছে। এখন টিকার সংগ্রহ ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। এছাড়া স্বাস্থ্য খাতের শুধু বরাদ্দ দিলেই হবে না, বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে উদ্যোগ থাকতে হবে, যা বাজেটে স্পষ্ট করা হয়নি। 

এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, স্বাস্থ্য খাতে টিকাদান কর্মসূচির জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ পর্যাপ্ত নয় বলেও মনে করে সিপিডি। সংস্থাটির কর্মকর্তারা মনে করেন, অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে হলে সবাইকে টিকার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এজন্য এ খাতের ব্যয় আরও বাড়াতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত