টিকায় প্রাধান্য চায় উন্নয়ন সমুন্বয়

আপডেট : ০৬ জুন ২০২১, ০১:৩৫ এএম

টিকা দিতে পারলে মানুষের মনে স্বস্তি আসবে। ব্যবসায়ীদের আস্থা বাড়বে। তাহলেই করোনা সংকট কাটিয়ে অর্থনীতিতে আরও গতি আসবে। এজন্য করোনাভাইরাস মহামারীর সময় প্রস্তাবিত ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে প্রবৃদ্ধি ও অর্থায়নের চেয়ে টিকাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া উচিত বলে মনে করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন সমুন্বয়।

গতকাল শনিবার এক বাজেটোত্তর প্রতিক্রিয়ায় এ মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও সংগঠনটির সভাপতি ড. আতিউর রহমান। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির ইমেরিটাস ফেলো খন্দকার সাখাওয়াত আলী ও ড. এ কে এনামুল হক।

আতিউর রহমান বলেন, ‘যেকোনো মূল্যে টিকা সংগ্রহ করতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। এখন টাকার অভাব নেই, অভাব রয়েছে টিকার। তাই টাকা নয়, টিকা প্রধান বিবেচ্য বিষয়।’

তিনি বলেন, ‘এখন প্রবৃদ্ধি ও ঘাটতির চিন্তা বাদ দিয়ে কীভাবে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকা দেওয়া যায়, সেটি আগে ভাবতে হবে।’

বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ নিয়ে উন্নয়ন সমুন্বয়ের সভাপতি আতিউর রহমান বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের ক্ষেত্রে আরও সাহসী হওয়ার সুযোগ ছিল। করোনা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা, কিন্তু সেখানে ঘাটতি রয়েছে। ব্যয়ের বিষয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। এ খাতে ব্যয় ঠিকমতো হচ্ছে কি না, তা কোথায় যাচ্ছে, তাও নজরদারিতে রাখতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘বরাদ্দ ও আশা দিলে চলবে না। সক্ষমতা ও জবাবদিহির অভাব কাটিয়ে উঠতে হবে। সঠিক কৌশলগত বাস্তবায়ন পরিকল্পনাও নিতে হবে। তবে থোক বরাদ্দসহ ৮০ শতাংশ নাগরিককে এর আওতায় আনার লক্ষ্য এবং ঢাকার বাইরে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা আশা-জাগানিয়া।’

সাবেক গভর্নর বলেন, ‘সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে যে খাতে, তার একটি হচ্ছে শিক্ষা। এক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। গ্রামে শিক্ষার্থী ঝরে যাচ্ছে, কিশোরীদের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। অনলাইন শিক্ষার দিকেও নজর দেওয়া দরকার। ডিজিটাল ডিভাইডেশনের কারণে শিক্ষার্থীরা এরই মধ্যে পিছিয়ে পড়েছে। প্রতিটি স্কুলে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে ইন্টারনেট দেওয়া যায় কি না, ভেবে দেখতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘কৃষি ও কৃষকের সন্তানরা করোনা মহামারীর সময় অর্থনীতিকে সবচেয়ে বেশি রক্ষা করেছে। এ খাতে বরাদ্দ ৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ৩২ হাজার কোটি টাকা করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু নতুন দরিদ্রদের বিষয়ে কিছুই বলা নেই। নগরীর দরিদ্রদের সামাজিক নিরাপত্তা দেওয়ার সে রকম কোনো উদ্যোগও নেই। তাদের একটা ডাটাবেজ দ্রুত করা উচিত।’

কিছু ক্ষেত্রে করহার পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করে আতিউর রহমান বলেন, ‘মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের করপোরেট কর থাকা যুক্তিযুক্ত নয়। একই কথা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়করের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তামাকপণ্যের উৎপাদকদের আয়কর ৪৭ শতাংশ থেকে বাড়ানো উচিত।’

বাজেট ঘাটতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এই গভর্নর বলেন, ‘বাজেট ঘাটতি ৬ শতাংশ নিয়ে দুর্ভাবনা নেই। কারণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আছে। আবার ঘাটতির বড় অংশ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে সহায়তা হিসেবে আসবে। এটা নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই। এই টাকা পরিশোধের দীর্ঘ সময় পাওয়া যাবে। সুদের হারও অনেক কম।’

বাজেট নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ড. এনামুল হক বলেন, ‘বর্তমান কাঠামোতে নতুন দরিদ্ররা সহায়তা পাবে না, তাই কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। তাদের জন্য আলাদা করে ভাবতে হবে। একই কথা স্বাস্থ্য খাতের বেলায়ও প্রযোজ্য।’

তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাত এবারের টাকাও খরচ করতে পারছে না। বরং এ ক্ষেত্রে উন্নত বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ১০ শতাংশ পর্যন্ত দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দ রাখা উচিত। প্রয়োজনে সরকার এতে অর্থ-সহায়তা দেবে।’

সাখাওয়াত আলী বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশের বাস্তবতায় সামাজিক সুরক্ষা খাতে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের বিকল্প নেই। কারণ কম আয়ের মানুষের কথা চিন্তায় আনতে হবে, যেন তারা চাকরিজীবনের শেষে নিশ্চিন্তে থাকতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘নতুন দরিদ্রদের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। করোনার তৃতীয় ধাক্কা এলে আরও বেশিসংখ্যক মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়বে। কিন্তু সেখানে তাদের কথা কিছুই বলা হয়নি, কিছুই রাখা হয়নি। স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় যে আরও মানসম্মত ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ দরকার, করোনা আমাদের সেই বিষয়গুলো দেখিয়ে দিয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত