করোনা ঠেকাতে বিধিনিষেধ বা লকডাউন পদ্ধতি মূলত কার্যকর কিন্তু অত্যন্ত ব্যয়বহুল। অথচ মাস্কের ব্যবহার বাড়িয়ে করোনার ঝুঁকি কমিয়ে আনা সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে তা লকডাউনের চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে। দেশে বিনামূল্যে মাস্ক বিতরণ করা হলে স্থানভেদে ১৩ থেকে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত মাস্ক ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব বলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জরিপে উঠে এসেছে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে গত বছরের মে মাসে ৫১ শতাংশ মানুষকে মাস্ক ব্যবহার করতে দেখা গেছে। তবে জুন মাসে এ হার ২৬ শতাংশে নেমে আসে। জরিপে অংশ নেওয়া মাত্র ২০ শতাংশ মানুষকে সঠিকভাবে মাস্ক পরতে দেখা গেছে। মানুষের কাছে বিনা পয়সায় মাস্ক পৌঁছে দিতে খরচ হবে জনপ্রতি ১০ টাকা।
গতকাল বুধবার মাস্ক ব্যবহার : স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক প্রভাব শিরোনামে সংলাপের আয়োজন করে বিআইডিএস। বিআইডিএসের মহাপরিচালক বিনায়ক সেনের সঞ্চালনায় ভার্চুয়াল আলোচনায় প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিকবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান, অর্থ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আবদুর রউফ তালুকদার। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুশফিক মোবারক ও ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ। মুশফিক মোবারক বলেন, প্রচারকের মাধ্যমে মাস্ক ব্যবহারের জন্য উদ্বুদ্ধ করার ফলে মাস্কের ব্যবহার ২৯ শতাংশ হারে বাড়ে, যা ১০ সপ্তাহ পর্যন্ত টেকসই হয়। বিনা পয়সায় মাস্ক বিতরণে জনপ্রতিনিধি, মসজিদের ইমাম ও প্রচারকের সহযোগিতা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
আসিফ সালেহ বলেন, করোনা ঠেকাতে বিধিনিষেধ বা লকডাউন দেওয়া হচ্ছে, এ পদ্ধতি কার্যকর নয় বরং অত্যন্ত ব্যয়বহুল। করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে মাস্ক কার্যকর ভূমিকা রাখছে বলে তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে। তিনি বলেন, ব্র্যাক ইতিমধ্যে ৭ কোটি ৭০ লাখ বিনা পয়সায় সার্জিক্যাল মাস্ক বিতরণ করেছে। এ কাজে আরও প্রয়োজন সাড়ে পাঁচ কোটি সার্জিক্যাল মাস্ক, যা তৈরিতে খরচ পড়বে ২৫ কোটি টাকা। এ টাকা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে চাওয়া হলেও পাওয়া যায়নি।
অর্থ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব আবদুর রউফ তালুকদার বলেন, অর্থায়ন কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু বিতরণ, ব্যবস্থাপনা বড় সমস্যা। ব্যয়ের সক্ষমতাও থাকতে হবে। কারণ আমরা দেখেছি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তার বড় অংশ তারা ব্যয় করতে পারেনি। সারা দেশে মাস্ক বিতরণ করতে হবে এটা সমর্থন করি না। অভিযান পরিচালনা করে, বলপ্রয়োগ করে এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেও মানুষকে মাস্ক পরানো যায়নি। মাস্ক বিনা পয়সায় দেওয়া হবে। কিন্তু বিতরণ করবে কে? বিতরণ করতে গিয়ে আরও ১০ টাকা করে খরচ হবে। তাছাড়া সরবরাহ ব্যবস্থা, সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর বিষয় রয়েছে। তাই মাস্কের পরিবর্তে সরকার টিকার দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। সব জায়গা থেকে টিকা পাওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। সরকারের অগ্রাধিকার এখন টিকায়, মাস্কে নয়। তিনি বলেন, এখন ১২০ কোটি ডলার বরাদ্দ রয়েছে শুধু ভ্যাকসিন সংগ্রহে। উন্নয়ন সহযোগীদের আরও ২০০ কোটি ডলার রয়েছে পাইপলাইনে।
ড. মসিউর রহমান বলেন, অর্থায়ন সমস্যা নয়, এটা এক অর্থে সঠিক অন্য অর্থে সঠিক নয়। অনেক ধাপ পেরিয়ে অর্থ ছাড় হয়। তিনি বলেন, টিকার বিকল্প মাস্ক নয়।
ড. আতিউর রহমান বলেন, মাস্ক ব্যবহার করলে সংক্রমণ কমে আসে। মানুষের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি পায়। তিনি ব্যাংকগুলোর করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার খরচের (সিএসআর) মাধ্যমে এ ধরনের উদ্যোগে তহবিল সংগ্রহের পরামর্শ দেন।
