সারা বিশ্বের মতো করোনার অভিঘাতে বাংলাদেশের মানুষের জীবন-জীবিকা ও অর্থনীতি চরমভাবে বিপর্যস্ত। এ বিপর্যয়ের ঢেউ লেগেছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান, আমদানি-রপ্তানিসহ সব ক্ষেত্রে। করোনা প্রাদুর্ভাবের পর গত এক বছরে দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে আড়াই কোটির কাছাকাছি মানুষ। কর্মচ্যুত হয়েছেন প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের অনেকেই। বেকারত্ব বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। চাকরি হারিয়ে বিদেশ থেকেও ফেরত এসেছেন অনেক প্রবাসী শ্রমিক। লকডাউন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের কারণে আয়-উপার্জনও কমে গেছে অনেক মানুষের। এমন এক পরিস্থিতিতে গত ৩ জুন জাতীয় সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই বাজেটে গুরুত্ব পেয়েছে মহামারীর ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে শক্তিশালী পুনরুদ্ধার।
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। বাজেটের এই আকার চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের চেয়ে ৬ দশমিক ২৮ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরে মূল বাজেটের আকার ছিল ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। টাকার অঙ্কে বাজেটের আকার বেড়েছে ৩৫ হাজার ৬৮১ কোটি। বাজেটে আগামী অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি হার ৫ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে।
বাজেট প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনীতিকে করোনার অভিঘাত মোকাবিলার উপযোগী করে এবারের বাজেট সাজানো হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বাজেট উত্থাপনকালে বলেন, অর্থনীতির প্রাণশক্তি হচ্ছে আমাদের দেশের মানুষ। দেশের সব মানুষের জীবনমান উন্নয়নের মাধ্যমেই মূলত অর্জিত হবে ২০৩০ (টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট), ২০৩১ (উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ), ২০৪১ (উন্নত দেশ) ও ২১০০ (বদ্বীপ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন) সালের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যগুলো। প্রস্তাবিত ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ২৪ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি ২০০২-২১ অর্থবছরের এ খাতে বরাদ্দ ছিল ২৪ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা। অর্থাৎ দেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বেড়েছে ১ দশমিক শূন্য শতাংশ। এই বরাদ্দ বৃদ্ধি বাজেটের আকার বৃদ্ধির তুলনায় কম হলেও একেবারে হতাশাব্যঞ্জক নয়। আসন্ন ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে কৃষিতে সর্বোচ্চ ভর্তুকি রাখা হয়েছে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এই ভর্তুকি সুপরিকল্পিত ও সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি উৎপাদন বৃদ্ধিতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে। কৃষি ও কৃষিসংশ্লিষ্ট উৎপাদন ও সেবা, ক্ষুদ্র ব্যবসা, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ইত্যাদি খাতে গ্রামের দরিদ্র কৃষক, বিদেশফেরত প্রবাসী শ্রমিক এবং প্রশিক্ষিত তরুণ ও বেকার যুবকদের গ্রামীণ এলাকায় ব্যবসা ও আত্মকর্মসংস্থানমূলক কাজে ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার স্বল্পসুদে ঋণ বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ৩ হাজার ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কৃষকদের কৃষিযন্ত্র ক্রয়ের ওপর ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত সহায়তার মাধ্যমে হ্রাসকৃত মূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হচ্ছে। এর আওতায় ২০১০ থেকে ২০২০ পর্যন্ত প্রায় ৬৯ হাজার ৮৬৮টি কম্বাইন্ড হারভেস্টর, রিপার, সিডার ও পাওয়ার টিলারসহ কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে। আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ২০ লাখ ৫৫ হাজার টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি পূর্ণমাত্রায় সংগ্রহ করে দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। জানা যায়, দেশে সরকারি পর্যায়ে খাদ্যশস্য সংরক্ষণের বিদ্যমান ধারণক্ষমতা ২১ লাখ ৮০ হাজার টন। বর্তমানে আরও প্রায় ছয় লাখ টন ধারণক্ষমতার আধুনিক খাদ্যগুদাম নির্মাণের লক্ষ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। প্রকল্পগুলো যথাসময়ে বাস্তবায়ন হোক। সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অধিক পরিমাণে খাদ্যশস্য সংগ্রহ করুক। কৃষক তার উৎপাদিত খাদ্যশস্যের ন্যায্যমূল্য পাক। বাজারে খাদ্যশস্যের দাম থাকুক স্থিতিশীলএটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।
কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপনে ১০ বছর মেয়াদের জন্য কর অব্যাহতি এবারের বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। প্রস্তাবিত বাজেটে শিল্পায়নের মাধ্যমে দেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজনে উদ্যোক্তাদের ১০ বছর মেয়াদে কর অব্যাহতি দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব শিল্পের মধ্যে রয়েছে ফল, শাকসবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ, দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন এবং শিশু খাদ্য উৎপাদন। এতে সবজি ও ফলচাষি ও দুগ্ধ খামারিরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং দেশে ফল, শাকসবজি চাষ ও দুগ্ধ খামার স্থাপনে শিক্ষিত যুবক-যুবতীরা এগিয়ে আসবে। এ ছাড়া দেশের কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী উদ্যোক্তারাও ১০ বছর মেয়াদের জন্য কর অব্যাহতি পাবেন। সরকার কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়মূল্যের ওপর ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি প্রদান করে। ভর্তুকির এই সুফল বড় কৃষকদের কাজে লাগলেও কৃষির চালিকা শক্তি; ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের কোনো কাজে আসে না। সে ক্ষেত্রে কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারীদের ১০ বছরের জন্য কর অবকাশ কিছুটা হলেও দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের কৃষি যান্ত্রিকীকরণে সহায়তা করবে। ভারত ও বাংলাদেশে বছরে যত লোক ক্যানসারে আক্রান্ত হন, তার বেশির ভাগই হলো কৃষক। কৃষক ফসল উৎপাদনে পোকামাকড় ও রোগবালাই দমনে সাবধানতা অবলম্বন না করে বালাইনাশক প্রয়োগ করেন। বালাইনাশকের অবশিষ্টাংশ বিভিন্নভাবে কৃষকের দেহে প্রবেশ করে এবং মরণব্যাধি; ক্যানসারে আক্রান্ত হন কৃষক। এ ছাড়া এই রাসায়নিক বালাইনাশকের কারণে আমাদের মাটি, পানি ও বাতাস দূষিত হচ্ছে। জমি হারাচ্ছে উর্বরতা শক্তি। বিনষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। এসব কারণে আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও নিরাপদ ফসল উৎপাদনে রাসায়নিক বালাইনাশকের ব্যবহার কমিয়ে জৈব বালাইনাশকের ব্যবহার বাড়াতে হবে। বাড়াতে হবে রাসায়নিক সারের পাশাপাশি জৈব সারের ব্যবহার। আমাদের প্রস্তাব ছিল নিরাপদ ফসল উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহিত করার জন্য জৈব সার ও জৈব বালাইনাশকের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে আনা। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে এসব ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রাখা হয়নি। ঘূর্ণিঝড় আম্ফান ও ইয়াসের আঘাতে উপকূল অঞ্চলের কৃষি ও মৎস্য খাত একেবারে ল-ভ- হয়ে গেছে। উদ্বেগের কথা হলো, প্রস্তাবিত বাজেটে উপকূল অঞ্চলের টেকসই বাঁধ নির্মাণের বরাদ্দের কথা উল্লেখ করা হয়নি।
প্রস্তাবিত বাজেটে খামারিদের দাবি অনুযায়ী, বিদেশি মাংসে ১৫ শতাংশ ভ্যাট বসানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে মাশরুম আমদানিতে আমদানি শুল্ক ৫ থেকে ১৫ শতাংশে বৃদ্ধি করা হয়েছে। এতে দেশে সম্ভাবনাময় মাশরুম শিল্পের প্রসার ঘটবে এবং নতুন নতুন উদ্যোক্তার সৃষ্টি হবে। বাজেটে মুরগি, মাছ ও পশুখাদ্যের উপকরণ আমদানির ওপর রেয়াতি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এতে হাঁস-মুরগি, মাছ ও গবাদিপশুর খাবারের দাম কমানোর একটা সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। অতীতে দেখা গেছে, এ সুযোগের সুফল ব্যবসায়ীরা একা ভোগ করলেও খামারিরা তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। রাসায়নিক সারে যেভাবে ভর্তুকি দেওয়া হয়, গবাদিপশু-পাখি ও মাছের খাবারে সেভাবে ভর্তুকি প্রদান করলে খামারিরাও সমভাবে উপকৃত হতেন।
স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে দেশের প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ লোকের জীবন-জীবিকার একমাত্র অবলম্বন ছিল কৃষি। বর্তমানে মোট শ্রমশক্তির মাত্র ৪০ ভাগ লোক কৃষির সঙ্গে জড়িত। কৃষিশ্রমিকের অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধি, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের অভাব, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষি আজ একটি অলাভজনক ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় পরিণত হয়েছে। এ পেশার প্রতি শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মেরও তেমন আগ্রহ নেই। নতুন প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয় করতে হলে চীন, জাপান ও কোরিয়ার মতো কৃষিকে করতে হবে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর। কৃষি পেশাকে আকর্ষণীয় করার লক্ষ্যে ৬০ বছরের বেশি বয়স্ক কৃষক ও ক্ষেতমজুরদের মাসিক পেনশন প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
করোনার মতো ভয়াবহ দুর্যোগে সারা পৃথিবীতে খাদ্য সংকট দেখা দিলেও আমাদের কর্মঠ কৃষক, মাঠকর্মী ও কৃষি বিজ্ঞানীদের নিরলস প্রচেষ্টা ও সরকারের সময়োচিত পদক্ষেপের কারণে বাংলাদেশে কোনো খাদ্য সমস্যা নেই। দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কৃষির এই অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখতে কৃষিতে বাজেট অনুপাতে ভর্তুকি/প্রণোদনা প্রদানের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। সেই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ঘাতসহিষ্ণু ফসলের জাত ও নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গবেষণা কার্যক্রম আরও জোরদার ও গতিশীল করতে হবে।
লেখক সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন
