করোনা ‘হটস্পট’ পিরোজপুরে ২১ জুনই ভোট করবে ইসি!

আপডেট : ১২ জুন ২০২১, ০১:২৫ এএম

করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি থাকলেও ২১ জুন পিরোজপুর জেলায় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভোটগ্রহণ করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গতকাল শুক্রবার সর্বশেষ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পিরোজপুরে করোনার সংক্রমণের হার ৭৫ শতাংশ। এ অবস্থায় ভোটগ্রহণ করাকে ‘আত্মঘাতী’ বলছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, কোনো জায়গায় ৬০ শতাংশের বেশি সংক্রমণ থাকে, সেই এলাকায় নির্বাচন করতে পারবে না নির্বাচন কমিশন। তবে, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যদি এ রকম কোনো ভয়াবহ পরিস্থিতি হয়, সেটা দেখা যাবে। যদিও ২১ জুনই ভোট করার সিদ্ধান্ত বলবৎ রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দক্ষিণের জেলা পিরোজপুরে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা সংক্রমণের শনাক্তের হার ৭৫ শতাংশ। করোনা সংক্রমণে শতভাগ শনাক্ত হয়েছে মেহেরপুর ও খাগড়াছড়ি জেলা। সারা দেশে করোনা সংক্রমণের হারে তৃতীয় অবস্থানে থাকা পিরোজপুর বর্তমানে করোনার ‘হটস্পট’। করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির কারণে গত বৃহস্পতিবার দেশের ৬ জেলার ১৬৩ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচন  স্থগিত করলেও পিরোজপুরের সাত উপজেলার ৩২ ইউপিতে ভোট আয়োজনে অনড় ইসি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ‘এ পরিস্থিতিতে পিরোজপুরে নির্বাচন করা হবে ‘আত্মঘাতী’ সিদ্ধান্ত। গত সপ্তাহ থেকেই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে পিরোজপুরে করোনা সংক্রমণের হার।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পিরোজপুরে ৫ জুন করোনা সংক্রমণের হার ২.৯৭ শতাংশ থাকলেও ৬ জুন তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭২.৭২ শতাংশ। ৭ জুন কমে ৫৩ শতাংশ হলেও ৮ জুন শনাক্তের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৬৬.৬ শতাংশ। ৯ জুন আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৭১.৪২ শতাংশ। ১০ জুন তা অপরিবর্তিত থাকে ৭১.৪২ শতাংশ। তবে গতকাল শুক্রবার আরও বেড়ে শনাক্তের হার ৭৫ শতাংশ।

এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ায় বর্তমানে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা। উঠান বৈঠক থেকে শুরু করে হাটবাজারে প্রচারণায় ব্যস্ত। থেমে নেই সমর্থকরা। চায়ের কাপে ঝড় থেকে শুরু করে মিটিং-মিছিলে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা প্রার্থীরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার ঊর্ধ্বগতির কারণে যেসব জেলায় নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে তার চেয়ে পিরোজপুরে সংক্রমণের হার অনেক বোশি। তাই মানবিক কারণেই এই নির্বাচন বন্ধ করে দেওয়া উচিত। কোনোভাবেই এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন মেনে নেওয়া যায় না।’

এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার (ইসি) রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকারে নির্বাচনে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নেই। তবে আইনের বাধ্যবাধকতা আছে।  স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের রিপোর্টের তথ্য ধরেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ ওই রিপোর্টে যে জেলাগুলো ছিল, সব জেলা ধরে বাদ দিয়েছি। এইটুকু করতে পারছি।’ এই কমিশনার বলেন, ‘যদি এ রকম কোনো ভয়াবহ পরিস্থিতি হয়, তাহলে কী হবে না হবে, সেটা দেখা যাবে। রিপোর্টকে ওনার করে যে জেলায় ঊর্ধ্বগতি, সেগুলোকে বাদ দিয়েছি।’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ  ডাক্তার লেলিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনার প্রকোপ যেসব এলাকায় বাড়ছে, ওই সব এলাকায় নির্বাচন করা আত্মঘাতী হবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে দেশে একটি মহামারী সংক্রমণ চলছে; এ সময় সংক্রমণ ব্যাধি প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণ এবং নির্মূল আইন ২০১৮ বলবৎ।  এই আইন অনুযায়ী দেশে লকডাউন এবং কঠোর বিধিনিষেধ চলছে। একই সঙ্গে এই আইনে স্পষ্টত বলা আছে, এই আইন যখন বলবৎ থাকবে অন্য আইনের চেয়ে এই আইন গুরুত্ব পাবে। পিরোজপুর জেলার কোনো জায়গায় ৬০ শতাংশের বেশি সংক্রমণ থাকে, সেই এলাকায় নির্বাচন করতে পারবে না নির্বাচন কমিশন। পরিষ্কার কথা। যদি নির্বাচন কমিশন করতে চায় তাহলে যে কেউ গিয়ে উচ্চতর আদালতের দ্বারস্থ হয়, এটি বন্ধ হয়ে যাবে।

এদিকে গত বৃহস্পতিবার কমিশন সভা শেষে এক প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এসব নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। অন্যান্য বিভাগের তুলনায় বরিশাল বিভাগে সংক্রমণ সহনীয় পর্যায়ে থাকায় ভোট নির্ধারিত সময়ে হবে। তাই আইইডিসিআরের উল্লিখিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর বাইরে বরিশালসহ সবখানে নির্ধারিত সময়ে ভোট হবে।’

পিরোজপুর জেলা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি এড়িয়ে যান এবং বলেন, বরিশালে বিভাগীয় কমিশনারের সঙ্গে কথা হয়েছে। বরিশাল বিভাগে সংক্রমণের হার ১৮ শতাংশ। নির্বাচনের কারণে করোনা সংক্রমণ বাড়লে দায় কে নেবে, এমন প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়ে সংবাদ সম্মেলন শেষ করেন তিনি।

পিরোজপুরের জেলা সিভিল সার্জন ডাক্তার মো. হাসনাত ইউসুফ জাকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকায় টেস্ট করছে কিন্তু বাড়ি পিরোজপুর, তাদের নামও পিরোজপুর জেলা হিসাব করেছে, তাই এত শনাক্তের হার। পার্সেন্টেজ কোনো কিছু ইন্ডিকেট করে না।’ অন্যান্য জেলায় সেই পার্সেন্টেজ গুরুত্ব দিয়েই নির্বাচন বন্ধ করা হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দেখেন সেখানে হাসপাতালের করোনা ইউনিটে কোনো জায়গা নাই।’ পিরোজপুর জেলা নির্বাচনের উপযোগী কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের উপযোগী কি না, তা বলব না। আমি বলব, লকডাউনের উপযোগী না।’ তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আগেই বলেছে, ‘এই সময় নির্বাচন করা সঠিক সিদ্ধান্ত না।’

পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া থানার ধাওয়া ইউনিয়নে চেয়ারমান পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রশিদ মৃধা গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার হার যদি ৭৫ শতাংশ হয়, তাহলে অবশ্যই নির্বাচন করা উচিত নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা যারা প্রার্থী, আমাদের তো খরচ হচ্ছে। যত দেরি হবে, তত খরচ হবে। তবে মানবতার দিকে তাকিয়ে বলব, নির্বাচন বন্ধ করা উচিত।’ এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মঠবাড়িয়া উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা নাজমুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাঠ প্রশাসন বলছে এখানে সংক্রমণের হার বেশি না, কম।’

যে ৩২ ইউপিতে ভোট : পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ার ভিটাবাড়িয়া, নদমুলা-শিয়ালকাঠী, তেলিখালী (ইভিএম), ধাওয়া ও গৌরিপুর। ইন্দুরকানীর বালিপাড়া। পিরোজপুর সদরের কদমতলা (ইভিএম), কলাখালী, টোনা ও শারিকতলা। মঠবাড়িয়ার তুষখালী (ইভিএম), মিরুখালী, বেতমোর রাজপাড়া, আমড়াগাছিয়া, সাপলেজা, হলতাগুলিশাখালী। নেছারাবাদের আটঘর কুড়িয়ানা, বলদিয়া, গুয়ারেখা, দৈহারী, সোহাগদল, সারেংকাঠী, সুটিয়াকাঠী, স্বরূপকাঠী, সমুদয়কাঠী ও জলাবাড়ী। কাউখালীর আমড়াজুড়ি ও কাউখালী। নাজিরপুরের মাটিভাংগা, মালিখালী, নাজিরপুর ও সেখমাটিয়া (ইভিএম)।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত