সিলেটের গোয়াইনঘাটে দুই সন্তানসহ স্ত্রীকে গলা কেটে ও কুপিয়ে হত্যার মামলায় স্বামী হিফজুর রহমানকে (৩৫) গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তিনি বর্তমানে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পুলিশ পাহারায় চিকিৎসাধীন। শঙ্কামুক্ত হিফজুরকে আজ রবিবারই ছাড়পত্র দিতে পারে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। আর সেটা হলে আজই তাকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড চাওয়া হবে। চাঞ্চল্যকর ওই হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে গতকাল শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে সিলেটের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন এসব তথ্য জানান।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, হিফজুরের স্ত্রী আলিমা বেগম ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। অন্তঃসত্ত্বা আলিমা বেগম (৩০), তার ছেলে মিজান (১০) ও মেয়ে তানিশার (৩) রক্তাক্ত লাশ গত বুধবার সকালে নিজ ঘর থেকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় আহত অবস্থায় ঘরে পড়েছিলেন স্বামী হিফজুর রহমান। অচেতন অবস্থায় তাকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাত থাকলেও তা গুরুতর ছিল না। তখনই পুলিশের সন্দেহ হয়। পুলিশ পাহারায় চলে হিফজুরের চিকিৎসা। সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার জানান, কিছুটা সুস্থ হলে হিফজুরকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পুলিশ। কিন্তু হিফজুর উল্টাপাল্টা কথা বলে নিজেকে মানসিক ভারসাম্যহীন হিসেবে উপস্থাপন করতে চান। জিজ্ঞাসাবাদে হিফজুর পুলিশকে জানান, ‘ওই রাতে তিনি স্বপ্নে মাছ দেখতে পান, এরপর মাছ মনে করে উপর্যুপরি কুপিয়েছেন’।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার বলেন, হিফজুর পেশায় দিনমজুর। তাদের সংসারে দাম্পত্য কলহ ছিল নিয়মিত ব্যাপার। এ নিয়ে গত দুই মাসে দু’বার সালিশ হয়েছিল। গত শুক্রবার তার শ্যালিকার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। সেই বিয়েতে যাওয়া না যাওয়া নিয়েও আলিমা বেগমের সঙ্গে তার ঝগড়া হয়। পারিবারিক কলহের জের ধরেই দুই শিশুসহ তাদের মাকে গলা কেটে হত্যার ঘটনা ঘটতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, বাইরের লোক ঘরের ভেতরে গিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। এ হত্যাকাণ্ডের আগের দিন দুপুরে হিফজুর তার স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে কথিত পীর আতা মোল্লার কাছে গিয়েছিলেন গলা ব্যথার সমস্যা নিয়ে। হিফজুরের প্রতি বছর মানসিক সমস্যা হতো, তখন তিনি কথিত পীরের কাছে গিয়ে ঝাড়ফুঁক নিতেন। তার বাড়ি থেকে উদ্ধার করা বঁটি ও দা দিয়েই তিনজনকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সম্পত্তি নিয়ে কোনো ঝামেলা ছিল না হিফজুরের। হিফজুর প্রথম থেকেই সন্দেহজনক আচরণ করছেন। তিনি ঘরের ভেতরে অচেতনের ভান করে পড়েছিলেন। তবে হাসপাতালে নেওয়ার পর বোঝা যায় তার আঘাত গুরুতর নয়। বাইরে থেকে কেউ হত্যার জন্য এলে সঙ্গে করে অস্ত্র নিয়ে আসত। ঘরের বঁটি-দা দিয়েই খুন করত না। আর কোনো বিরোধের কারণে খুনের ঘটনা ঘটলে প্রথমেই হিফজুরকে হত্যা করা হতো কিংবা স্ত্রী-সন্তানদের প্রথমে হামলা করলেও হিফজুর তা প্রতিরোধের চেষ্টা করতেন। এতে স্বভাবতই তিনি সবচেয়ে বেশি আঘাত পেতেন। তাই পুলিশের ধারণা, স্ত্রী-সন্তানদের হত্যা করে ঘটনা অন্যখাতে প্রবাহিত করতে নিজেই নিজের হাত-পা ক্ষতবিক্ষত করেন হিফজুর।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, সাধারণত ঘুমানোর আগে পরিবারটির সবাই হাত-পা ধুয়ে ঘুমাতে যেত। হিফজুরের নিহত স্ত্রী ও দুই সন্তানের হাত-পাও পরিষ্কার ছিল। অথচ তার পায়ে বালু ও কাদা লাগানো ছিল। এতে বুঝা যায় তিনি রাতে ঘুমাননি। পারিবারিক বিরোধের জের ধরেই হিফজুর স্ত্রী ও সন্তানদের কুপিয়ে খুন করেছেন বলে পুলিশের ধারণা।
আলিমা বেগম ও তার দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় আলিমার বাবা আইয়ুব আলী বাদী হয়ে গত শুক্রবার গোয়াইনঘাট থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এই মামলায় হিফজুরকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ। আলিমা-হিফজুর দম্পতির ৫ বছর বয়সী আরেক ছেলে ওই রাতে তার নানার বাড়িতে থাকায় প্রাণে রক্ষা পেয়েছে।
