করোনাভাইরাস মহামারীকালে স্বাস্থ্য অধিপ্তরের কিট, মাস্কসহ বিভিন্ন কেনাকাটা ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাজ নিয়ে সমালোচনা করেছে সংসদীয় কমিটি। কমিটির সভায় স্বাস্থ্য অধিপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম উপস্থিত না থাকায় কমিটির সদস্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ডিজির অনুপস্থিতির বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। বৈঠকে করোনাভাইরাস মহামারীকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকাসহ নানা কেনাকাটা নিয়ে আলোচনা হয়।
সংসদীয় কমিটির সদস্যরা কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, বৈঠকে করোনার মহামারীকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন কেনাকাটা এবং ডিজির কর্মকান্ড নিয়ে কয়েকজন সদস্য তীব্র সমালোচনা করেছেন। তারা বলেছেন, এসব বিষয়ে কমিটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাজ নিয়ে জানেতে চেয়েছিল। এজন্য ডিজিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু তিনি আসেননি।
এক সদস্য জানিয়েছেন, বৈঠকে কমিটির সভাপতিসহ সদস্যরা ডিজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন মন্ত্রণালয়কে। মন্ত্রণালয় যদি ব্যবস্থা না নেয় তাহলে তারা বিষয়টি সংসদে তুলবেন বলেও বৈঠকে জানানো হয়।
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সদস্য বলেছেন, গতকালকের আলোচনায় কভিড-১৯ মহামারী শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত কত টাকার মাস্ক ও কিট ক্রয় করা হয়েছে, চলমান ভ্যাকসিন সংকট থেকে উত্তরণে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, ভ্যাকসিন কী পদ্ধতিতে আনা হচ্ছে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন সদস্যরা। এছাড়া করোনা মোকাবিলায় আইসিইউ ও অক্সিজেনের সরবরাহের পরিস্থিতি সম্পর্কেও আলোচনা হয়েছে। এসব বিষয়ের সার্বিক পরিস্থিতি জানতেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজিকে বৈঠকে থাকতে বলা হয়েছিল। কিন্তু আলোচনায় ডিজি না থাকায় সদস্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
সংসদীয় কমিটির একাধিক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বৈঠকে অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা ছিল। কিন্তু ডিজি বৈঠকে আসেননি। গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠকে ডিজি না আসায় সদস্যরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। কমিটির সভাপতি এ নিয়ে ডিজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছেন। যদি ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে বিষয়টি সংসদের অধিবেশনে আনা হতে পারে।
কমিটির সদস্য আব্দুল আজিজ বলেন, ‘স্বাস্থ্যের ডিজি বৈঠকে না আসায় তারা নাখোশ হয়েছেন। বিষয়টি কমিটির সভাপতি বিস্তারিত বলতে পারবেন।’
জানা গেছে, বৈঠকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ‘প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা’ এখনো না পৌঁছানোয় অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। কমিটি সহজতর প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে তাদের পরিবারের নিকট প্রণোদনার অর্থ পৌঁছানোর সুপারিশ করেছে।
আব্দুল আজিজ বলেন, অনেকে অভিযোগ করেছেন তারা প্রণোদনা পাননি। অনেক ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এই মানুষগুলো মারা গেছেন। তাদের পরিবার নিঃস্ব। তারা যদি প্রণোদনা ঠিকমতো না পায়, পরিবার কষ্টে থাকছে। আমরা মন্ত্রণালয়কে বলেছি দ্রুত এই প্রণোদনা যাতে সংশ্লিষ্ট পরিবারের কাছে পৌঁছায়।
সরকারিভাবে টিকা উৎপাদনের চিন্তা
কমিটি বৈঠকের কার্যপত্র থেকে জানা গেছে, গত এপ্রিল মাসে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব শেফিল্ডের গবেষক সানজান কে দাস স্বাস্থ্য সচিবের কাছে সরকারি পর্যায়ে টিকা উৎপাদনের লক্ষ্যে অবকাঠামো তৈরি করতে একটি প্রস্তাব পাঠান। সানজান দাসের টিকা তৈরির প্রযুক্তির আরএনডি ও প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হয়েছে বলে কার্যপত্রে বলা হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগসের বিদ্যমান কিছু অবকাঠামো এবং নতুন কিছু যন্ত্রপাতি কিনলে টিকা উৎপাদন সম্ভব বলে কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়। বিষয়টির কারিগরি দিক পর্যালোচনার ব্যাপারে মন্ত্রণালয় বিবেচনা করছে।
সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠকে দেশের সব জনগণকে টিকার আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্যে টিকা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
কমিটির আগের বৈঠকে করোনাভাইরাসের টিকা তৈরির জন্য দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে ‘উৎসাহ’ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। ওই সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় জানায়, তিনটি দেশীয় প্রতিষ্ঠানের টিকা তৈরির সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে। এগুলো হলো ইনসেপটা, পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস, হেলথ কেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস। এরমধ্যে ইনসেপটার কভিড-১৯ ভ্যাকসিন রেডি টু ফিল ও মাস্টার সিড উভয় প্রক্রিয়ার সক্ষমতা রয়েছে। পপুলারের মাস্টার সিড থেকে উৎপাদনের সক্ষমতা নেই। হেলথ কেয়ার অনুমোদন পেয়েছে, তবে এখনো উৎপাদনে যায়নি।
বৈঠকের কার্যপত্র থেকে আরও জানা গেছে, কভিড-১৯ সংক্রমণের পর থেকে ৭ জুন পর্যন্ত সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরস ডিপোর (সিএসডি) মাধ্যমে ২৬৬ কোটি ১৭ লাখ ২৪ হাজার টাকার মাস্ক এবং ৪০১ কোটি ২৫ লাখ টাকার আরটি-পিসিআর টেস্ট কিট কেনা হয়েছে। এছাড়া কভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস প্রকল্পের আওতায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৯ কোটি ৯ লাখ ২২ হাজার টাকার মাস্ক, ৩৫ কোটি ৮০ লাখ ৩১ হাজার টাকার আরটি-পিসিআর কিট এবং কভিড রেসপন্স ইমার্জেন্সি অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রকল্পের আওতায় ইউনিসেফের মাধ্যমে ৩২ কোটি ৯০ লাখ ৭২ হাজার টাকার কিট কেনা হয়েছে।
এতে বলা হয়, ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে ৩ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন কেনার চুক্তি হয়। এরমধ্যে ৭০ লাখ ডোজ পাওয়া গেছে। গত ৭ জুন পর্যন্ত ৫৮ লাখ ২০ হাজার ১৫ জনকে অ্যাস্ট্রাজেনেকার প্রথম ডোজ এবং ৪২ লাখ ২৩ হাজার ১৭৮ জনকে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ডোজ সম্পন্ন করার জন্য ১৪ লাখ ৪০ হাজার ৩০টি টিকার ঘাটতি রয়েছে।
কভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য সারা দেশে ১ হাজার ১২৫টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। এছাড়া বেসরকারি হাসপাতালে ৪৬৬ শয্যা আছে। ঢাকা মহানগর ছাড়া দেশের ২১টি জেলায় আইসিইউ শয্যা আছে। কভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য ১১ হাজার ৯১৬টি সাধারণ বেড রয়েছে। ঢাকা মহানগরে ১ হাজার ৫০১টি বেড বাড়ানো হয়েছে। দেশে বর্তমানে কোনো অক্সিজেন সংকট নেই। মজুদ অক্সিজেন ৯০০ টন। প্রতিদিন উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১৭৫ টন। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে অক্সিজেন সিলিন্ডারের সংখ্যা ২৩ হাজার ৮৯টি। হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার সংখ্যা ১ হাজার ৬০৩টি। অক্সিজেন কনসেনট্রেটরের সংখ্যা ১ হাজার ৫২২টি।
এদিকে বৈঠকে তথ্য বিভ্রান্তি এড়াতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য প্রদান ও পর্যালোচনা শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রদানের লক্ষ্যে অন্যান্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতা করার অনুরোধ করা হয়। বৈঠকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করা হয়।
শেখ ফজলুল করিম সেলিমের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, আ ফ ম রুহুল হক, মো. আব্দুল আজিজ, সৈয়দা জাকিয়া নুর, রাহগির আলমাহি এরশাদ (সাদ এরশাদ) ও মো. আমিরুল আলম মিলন অংশ নেন।
