বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন

হাজার কোটির প্রকল্পে শত কোটি টাকার পরামর্শক

আপডেট : ২১ জুন ২০২১, ০২:০৮ এএম

ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকায়নে ১ হাজার ১৩৮ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিতে চায় ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো)। এ প্রকল্পে জার্মান উন্নয়ন ব্যাংক থেকে ৭৪৪ কোটি টাকা সহায়তা পাওয়া যাবে। প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের তিন বিভাগের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ এবং অপারেশনাল দক্ষতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে প্রকল্পে পরামর্শক খাতে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় বরাদ্দ চাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।

কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রকল্পে পরামর্শক খাতে ১০১ কোটি টাকা খরচ প্রাক্কলন খুবই বেশি। ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) সমজাতীয় প্রকল্পে পরামর্শক খাতে যেখানে ব্যয় হবে মাত্র ১৬ কোটি টাকা, সেখানে ওজোপাডিকো চেয়েছে প্রায় ১০১ কোটি টাকা। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে ব্যাখ্যা দিতে হবে। 

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, আলোচ্য প্রকল্পে তিন ধরনের পরামর্শক নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। এদের জন্য মোট ১০০ কোটি ৯২ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সুপারভিশনে ২২৮ জনমাস (একক ব্যক্তি যত মাস কাজ করেন) পরামর্শকে ব্যয় হবে ৪১ কোটি ৫২ লাখ টাকা। ক্যাপাসিটি বাড়াতে ১০৬ জনমাস পরামর্শকের জন্য খরচ ধরা হয়েছে ২৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। আর জিআইএস ম্যাপিংয়ে ১৫৬ জনমাস পরামর্শকের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তাদের জন্য খরচ ধরা হয়েছে ৩৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।

পরিকল্পনা কমিশন বলছে, বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির সমজাতীয় প্রকল্পভুক্ত আইটেমের ব্যয় প্রাক্কলন অপেক্ষাকৃত বেশি ধরা হয়েছে, যা পর্যালোচনা করে যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে আনার নির্দেশনা দেওয়া হবে।

এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের সদস্য (সচিব) শরিফা খান বলেন, ‘প্রকল্পটিতে পরামর্শক সেবার বেশি অংশই অনুদান হিসেবে আসবে। ডেসকোর যেহেতু ছোট এলাকা তাই কম লেগেছে। তবে প্রকল্পের পরামর্শক ব্যয় কমানোর বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হবে।’

প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ১৩৮ কোটি টাকা, যার মধ্যে জার্মান উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণ ও অনুদান মিলে ৭৪৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা, বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ২৯৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয় হবে। চলতি বছর থেকে আগামী ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটির কাজ শেষ হবে।

জানা গেছে, জার্মান ব্যাংকের মোট অর্থায়নের মধ্যে ৯৭ দশমিক ৬২ শতাংশ বা ৭২৭ কোটি ২৭ লাখ টাকা ঋণ এবং ১৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা বা ২.৩৮ শতাংশ অনুদান রয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, প্রকল্পের কার্যক্রম ও খরচের অনেক বিষয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে । ওজোপাডিকো পূর্বঅভিজ্ঞতা ছাড়াই প্রকল্প প্রণয়নের কারণে একই কাজে অন্য কোম্পানির খরচের চেয়ে তাদের প্রাক্কলন অনেক বেশি প্রতীয়মান হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকায় পিজিসিবির বৈদ্যুতিক সঞ্চালন লাইনের সঙ্গে অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক রয়েছে। উক্ত নেটওয়ার্ক ব্যবহার না করে স্ক্যাডা সিস্টেমের জন্য আলাদা রেডিও লিংক স্থাপনের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করা হয়নি।

এছাড়া ৮টি উপকেন্দ্র সাবস্টেশনে অটোমেটেড সিস্টেম স্থাপন এবং ৯৭টি উপকেন্দ্রের মধ্যে রেডিও লিংক এবং ফাইবার অপটিক কেব্লের মাধ্যমে স্ক্যাডা সিস্টেম স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে একই সাবস্টেশনে একাধিক রেডিও লিংক স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রতিটি লিংকের আলাদা আলাদা করে অ্যান্টেনা স্থাপনের কারণও ব্যাখ্যা করা হয়নি। প্রকল্পের সমীক্ষা ২০১৮-১৯ সালের প্রেক্ষাপটে করা হয়েছে। এটাকে হালনাগাদ করার জন্য কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।

প্রকল্প প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, দেশের ২১ জেলার ৪০টি উপজেলায় এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা প্রকল্পে নেওয়া হয়েছে। জেলাগুলো হলো- ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, খুলনা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, মাগুরা, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, বাগেরহাট, যশোর, সাতক্ষীরা, নড়াইল, বরিশাল, ঝালকাঠি, বরগুনা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী ও ভোলা।

প্রকল্পের আওতায় ওজোপাডিকোর ৯৭টি ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্রগুলোকে কেন্দ্রীয় স্ক্যাডা সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত করার জন্য স্ক্যাডা সিস্টেমসহ অটোম্যাটিক মিটার রিডিং সিস্টেম স্থাপন। ২০টি ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্রের সম্পূর্ণ পুনর্বাসন এবং ৮টি অতিরিক্ত উপকেন্দ্রে সাবস্টেশন অটোমেশন সিস্টেম স্থাপন। ১২১ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার ৩৩ কেভি নতুন লাইন নির্মাণ এবং ৬১ দশমিক ৬০ কিলোমিটার ৩৩ কেভি লাইন পুনর্বাসন করা। বিভিন্ন উপকেন্দ্রের সুইচিং স্টেশনে ২০টি ৩৩ কেভি বে সম্প্রসারণ। এর জন্য ২ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। ৭৮টি ভোল্ট ডিসি সিস্টেম স্থাপন করা। ১ হাজার ৭১ কিলোমিটার ফাইবার অপটিক বেইজড ডি-ইলেক্ট্রিক সেল্ফ সহায়তা কেবল স্থাপন। কন্ট্রোল সেন্টার নির্মাণ করা হবে।  

এ প্রসঙ্গে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) চেয়ারম্যান সেলিম আবেদ বলেন, প্রকল্পটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জার্মান থেকে প্রকল্পের মোট বরাদ্দের বড় অংশ পাওয়া যাবে। প্রকল্পের আওতায় দক্ষিণ অঞ্চলের ২১ জেলার বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা হবে, যা এই মুহূর্তে খুবই জরুরি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত