স্বাস্থ্যবিধি মানায় উদাসীনতা সংক্রমণ আরও বাড়ার শঙ্কা

আপডেট : ২২ জুন ২০২১, ০২:৩৬ এএম

দেশে অনেকেই এখন করোনা আক্রান্ত হওয়ার পরও ঘুরে বেড়াচ্ছেন; বিশেষ করে ঢাকার বাইরে গ্রামাঞ্চলের অনেকেই উপসর্গ থাকার পরও চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছেন না বা নিজেরাও বুঝতে পারছেন না যে তারা আক্রান্ত। বিশেষ করে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে যারা আক্রান্ত, তাদের উপসর্গও কিছুটা ভিন্ন। ফলে করোনা আক্রান্ত হলেও তারা একে সাধারণ সর্দি-জ্বর মনে করে অবাধে ঘুরছেন হাট-বাজারে। খোদ করোনা হাসপাতালগুলোতেও একই অবস্থা। কঠোর বিধিনিষেধ বা লকডাউন দিয়েও এসব জায়গায় ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি মানানো যাচ্ছে না। সামাজিক দূরত্ব বা মাস্ক না পরার হাজারো অজুহাতও থাকে তাদের। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। বিএসএমএমইউর সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম মনে করেন, এভাবে আক্রান্তরা ঘুরে বেড়ালে এটা জ্যামিতিকভাবে ছড়িয়ে পড়বে। তখন তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তখন চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকবে না।

তবে বিভিন্ন এলাকার স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, করোনা নিয়ন্ত্রণে তারা সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছে। বাজার-ঘাটসহ সব জায়গায়ই টেস্ট করা হচ্ছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করার সব প্রস্তুতিও তাদের রয়েছে। করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট সীমান্ত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর  এখন সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়ছে। ঢাকায় আক্রান্তদের ৬৮ ভাগের মধ্যেই এই ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে। দেশে এখন গড়ে প্রতিদিন অ্যান্টিজেন টেস্টসহ ২২ হাজার নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্তের হার ১৯ দশমিক ২৭ ভাগ। আর এ পর্যন্ত গড় আক্রান্তের হার ১৩ দশমিক ৪৮ শতাংশ। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন ৭৮ জন। এই ২৪ ঘণ্টায় আগের দিনের তুলনায় এক হাজারের বেশি আক্রান্ত হয়েছেন।

এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা খুলনা ও রাজশাহীর। রংপুর বিভাগেও সংক্রমণ বাড়ছে হু হু করে। গত রবিবার করোনায় সর্বোচ্চ মৃত্যু নিয়ে আলোচনায় আসে খুলনা। ঢাকাকে টপকে ২৪ ঘণ্টায় ৩২ জন মারা যায় সেখানে। ওই দিন ঢাকায় মারা যায় ২১ জন। তবে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় খুলনায় মৃত্যু কমেছে। ১২ জন মারা গেছে। আর বিভাগটিতে আক্রান্ত হয়েছে ৯৪৫ জন।

বিভাগওয়ারী হিসেবে ঢাকায় দৈনিক শনাক্তের সংখ্যা আগের দিনের ১ হাজার ৪৫ থেকে বেড়ে ১ হাজার ৮৩৭ জন হয়েছে, যা সারা দেশের মোট শনাক্তের প্রায় ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে নতুন রোগীর সংখ্যা আগের দিনের ২৯৩ থেকে বেড়ে ৪৬১ জন এবং রাজশাহী বিভাগে নতুন রোগী আগের দিনের ১ হাজার ২৩ থেকে কমে ৭৯৯ জন হয়েছে।

খুলনার দাকোপ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মিন্টু বিশ্বাস দেশ রূপান্তরকে জানান, তার এলাকায় তুলনামূলকভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতা থাকলেও হাট-বাজারে তা অনুপস্থিত। অনেক সময় জরিমানা করেও তেমন মাস্ক পরানো যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘আমরা অভিযান পরিচালনার সময় প্রতিদিনই একটি অংশের অ্যান্টিজেন টেস্ট করাচ্ছি। আর সেই টেস্টে অনেকের করোনা পজিটিভ আসছে। তাদের হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।’

অনেকে উপসর্গ থাকার পরও বাইরে বের হচ্ছেন বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, ‘তারা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু টেস্ট করাচ্ছেন না। অনেকের মধ্যেই উদাসীনতা রয়েছে। তারা করোনাকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না। হাসপাতালেও যাছেন না। আবার কেউ কেউ আছেন তাদের উপসর্গ প্রকাশ পায়নি। কিন্তু টেস্টে পজিটিভ আসছে। এটি বেশি উদ্বেগের।’

খুলনা বিভাগে নতুন রোগী ৯৪৫, জেলাজুড়ে লকডাউন : খুলনা বিভাগে ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে বিভাগে ৯৪৫ জনের শরীরে করোনার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গতকাল দুপুরে বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. রাশেদা সুলতানা এ তথ্য নিশ্চিত করেন। খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর সূত্র জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনায় ৩, কুষ্টিয়ায় ৩, ঝিনাইদহে ২, চুয়াডাঙ্গায় ১, যশোরে ১, বাগেরহাটে ১ ও নড়াইলে ১ জন মারা গেছেন।

তবে গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, জেলায় আগের ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু হয়েছে অন্তত ১০ জনের। সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হয়েছে যশোরে, ৩০৫ জন। আর খুলনা জেলায় শনাক্ত হয়েছে ১৭৫ জন নতুন করোনা রোগী।

এ অবস্থায় সংক্রমণ রোধে আজ মঙ্গলবার থেকে খুলনায় শুরু হচ্ছে এক সপ্তাহের কঠোর লকডাউন। এ বিষয়ে গত রবিবার বিকেলে খুলনা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ওই বিধিনিষেধ খুলনা জেলা ও মহানগরীর সংশ্লিষ্ট সবাইকে মেনে চলার অনুরোধ করা হয়েছে। অন্যথায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। গণবিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, খুলনায় করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির কারণে ২২ থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত সব ধরনের দোকানপাট, মার্কেট, শপিং মল ও কোচিং সেন্টার বন্ধ থাকবে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও কাঁচাবাজারের দোকান প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।

রাজশাহী বিভাগে ১৭ মৃত্যু : দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, আগের ২৪ ঘণ্টায় বিভাগটিতে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ২১ জনের; যা আগের দিনের তুলনায় দ্বিগুণ। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়াদের বেশির ভাগই রামেক হাসপাতালের। এ ছাড়া নাটোরে এক দিনে ৭ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। 

ময়মনসিংহ বিভাগে বেড়েছে শনাক্ত হার : বিভাগের ৪ জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ১৪৩ জনের। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় করোনা শনাক্ত হয়েছিল ১২৫ জনের। এ ছাড়া শেষ ২৪ ঘণ্টায় এই বিভাগে শনাক্তের হার ১৮ দশমিক ৬৪, যা আগের ২৪ ঘণ্টায় ছিল ১৪ দশমিক ৮১। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় সংক্রমিত হয়ে ময়মনসিংহ বিভাগে কেউ মারা যায়নি। স্বাস্থ্য বিভাগের পাঠানো পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ জেলায় মোট ৩৪২ জনের নমুনা পরীক্ষায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ৫০ জনের। শেরপুরে ২৮০ জনের নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত হয়েছে ৬১ জনের। নেত্রকোনায় ৫৯ জনের নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত হয়েছে ১৮ জনের আর জামালপুরে ৮৬ জনের নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত হয়েছে ১৪ জনের।

সিলেটে পরিস্থিতি স্থিতিশীল : সিলেট বিভাগে ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। তারা দুজনই সিলেট জেলার বাসিন্দা। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় দুজনের মৃত্যু হয়েছিল। এ নিয়ে বিভাগে করোনায় মারা গেছেন ৪৪৯ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ৭৭ জনের। এ নিয়ে বিভাগে করোনায় সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে ২৪ হাজার ২৯২ জনের। গতকাল দুপুরে সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।

এ ছাড়া গতকাল চট্টগ্রাম বিভাগে গতকাল আগের দিনের তুলনায় শনাক্ত বাড়লেও মৃত্যু কমেছে। নতুন রোগী ও মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছেন দেশ রূপান্তরের ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ, বাগেরহাট, দিনাজপুর, যশোর, সাতক্ষীরা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, পঞ্চগড় প্রতিনিধি। এই সব জেলার অনেক উপজেলা বা পৌরসভা এসেছে লকডাউনের আওতায়। তবে দেশের অন্যান্য এলাকার মতোই এসব এলাকায় স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতা কম। গতকালও ওই সব জেলায় লকডাউনের মধ্যেই প্রায় সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল। অবাধে চলাচল করেছে মানুষজন।

স্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, এভাবে আক্রান্তরা ঘুরে বেড়ালে এটা জ্যামিতিকভাবে ছড়িয়ে পড়বে। তখন তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এখন গ্রামে যেভাবে ছাড়াচ্ছে তা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তাদের চিকিৎসা কোথায় হবে। এমনিতেই ঢাকার বাইরে স্বাস্থ্যসেবা-সুবিধা অপ্রতুল। এখন এই সুবিধা খুব বেশি বাড়ানোর সুযোগও হয়তো কম। এই অপ্রতুল সুবিধা নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখন রোগী ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত