ঢাকার বাইরে করোনা

অপ্রতিরোধ্য সংক্রমণ, কাজে আসছে না কোনো ব্যবস্থাই

আপডেট : ২৩ জুন ২০২১, ০২:১০ এএম

ঈদুল ফিতরের পর থেকে দেশজুড়েই বাড়ছে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে সংক্রমণ বাড়ছিল হু হু করে। এমন পরিস্থিতিতে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে এলাকাভিত্তিক ‘লকডাউনের’ পাশাপাশি কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও কিছুতেই লাগাম টানা যাচ্ছে না সংক্রমণের গতির। বরং সীমান্তবর্তী কিছু এলাকায় প্রতিদিনই সংক্রমণ ও মৃত্যু হার বাড়ছে। পরিস্থিতির এ অবনতির জন্য স্বাস্থ্যবিধি পালনে সাধারণ মানুষের অনীহাকে দায়ী করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, অনেকেই করোনা আক্রান্ত হওয়ার পরও বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আবার অনেকেই উপসর্গ থাকার পরও চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছে না বা নিজেরাও বুঝতে পারছে না যে তারা আক্রান্ত। সাধারণ সর্দি-জ¦র মনে করে অবাধে ঘুরছে হাট-বাজারে। এ অবস্থা চলতে থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে উল্লেখ করে সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে বাধ্য করার বিকল্প নেই বলেও মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে দেশের কয়েকটি এলাকায় গতকাল মঙ্গলবার নতুন করে ‘লকডাউন’ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, টাঙ্গাইল ও এলেঙ্গা পৌর এলাকা, ঝিনাইদহ এবং চুয়াডাঙ্গার জীবননগর। বিস্তারিত দেশ রূপান্তরের সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিনিধি ও নিজস্ব প্রতিবেদকদের পাঠানো খবরে :

সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা খুলনা ও রাজশাহীর। খুলনা বিভাগে ফের বেড়েছে করোনায় মৃত্যু ও শনাক্তের সংখ্যা। কোনোভাবেই থামছে না মৃত্যুর মিছিল। প্রতিদিনই কেউ না কেউ হারাচ্ছে তাদের প্রিয়জন, আত্মীয়স্বজনকে। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় করোনা আক্রান্ত হয়ে খুলনা বিভাগে মৃত্যু হয়েছে ২৭ জনের। এ সময়ে সর্বাধিক মৃত্যু ও শনাক্ত হয়েছে খুলনা জেলা ও মহানগরীতে। একই সময়ে বিভাগে ৯৯৮ জনের শরীরে করোনার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গতকাল দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক রাশেদা সুলতানা এসব তথ্য জানান।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় খুলনায় নয়, কুষ্টিয়ায় পাঁচ, যশোরে চার, বাগেরহাটে চার, নড়াইলে তিন ও মেহেরপুরে দুজন মারা গেছেন।

খুলনায় সংক্রমণ রোধে সাত দিনের কঠোর ‘লকডাউন’ শুরু হয়েছে। মানুষের চলাচল বন্ধে নগরীর বিভিন্ন সড়ক ও গলির মাথায় বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে। তবে ‘লকডাউনের’ প্রথম দিন গতকাল সকালে খুলনা মহানগরীতে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিতি বৃদ্ধি পায়। সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘লকডাউন’ মানতে অনীহা দেখা গেছে। পাশাপাশি ‘লকডাউন’ সফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের তৎপরতাও চোখে পড়ে।

বাগেরহাটে সংক্রমণের হার ৪৯ শতাংশ : বাগেরহাটে সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় (গত সোমবার ভোর ৬টা থেকে গতকাল ভোর ৬টা পর্যন্ত) নমুনা পরীক্ষায় নতুন করে ৫৫ জনের শরীরে করোনা সংক্রমণ ধরা পড়েছে। ১১২টি নমুনা পরীক্ষায় ৫৫ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। সংক্রমণের হার ছিল ৪৯ শতাংশ। যা আগের দিনের চেয়ে ৬ শতাংশ বেশি। জেলার সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মোংলা উপজেলায় ১৪টি নমুনা পরীক্ষায় ছয়জনের শরীরে সংক্রমণ ধরা পড়ে। সেখানে সংক্রমণের হার ছিল ৪৫ শতাংশ।

মোংলা উপজেলায় তৃতীয় দফায় বাড়ানো সাত দিনের কঠোর বিধিনিষেধ ঢিলেঢালাভাবে চলছে। বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষের চলাফেরা বেড়েছে। জনসমাগমের উৎসস্থল হাটবাজারে মানুষের উপচেপড়া ভিড় ছিল। প্রশাসনের আরোপ করা কঠোর বিধিনিষেধ কেউ মানছে না। নৌকাতে গাদাগাদি করে যাত্রী পারাপার চলছে। প্রশাসনের আরোপিত কঠোর বিধিনিষেধ ২৩ জুন পর্যন্ত চলবে বলে জানিয়েছেন মোংলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কমলেশ মজুমদার।

তিনি বলেন, ‘বাগেরহাটে সংক্রমণ বাড়ছে। সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। হাট-বাজারে মানুষ মাস্ক ছাড়া ঘোরাঘুরি করছে। স্বাস্থ্যবিধি না মানায় করোনার সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।’

বাগেরহাটের সিভিল সার্জন ডা. কেএম হুমায়ুন কবির বলেন, ‘সংক্রমণ রোধের একটাই উপায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। না মেনে চললে লকডাউন দিয়ে কোনো উপকার আসবে না।’

রামেকে আরও ১৩ মৃত্যু, ১২ জনই রাজশাহীর : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আগের দিনও একই সংখ্যা ছিল। এ নিয়ে চলতি মাসের ২২ দিনে হাসপাতালটির করোনা ইউনিটে মারা গেল ২২৯ জন।

হাসপাতালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে আগের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে করোনা ইউনিটে যে ১৩ জনের মৃত্যু হয়, তাদের মধ্যে রাজশাহীরই ১২ জন। অন্য একজন নাটোরের। মৃত ১৩ জনের মধ্যে ছয়জন মারা গেছে আইসিইউতে।

রামেক হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়জদানী জানান, বর্তমানে হাসপাতালের আইসিইউর ২০টি ও কেবিনের ১৫টি বেডসহ ৩৫৭ বেডের বিপরীতে ভর্তি রোগী আছে ৩৯৩ জন। যেসব ওয়ার্ডে বেডের চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি আছে, সেসব রোগীকে ওই ওয়ার্ডের মেঝে ও বারান্দায় রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির কারণে রাজশাহী মহানগর এলাকায় ১৪ দিনের সর্বাত্মক ‘লকডাউনের’ গতকাল ছিল ১২তম দিন। ‘লকডাউনের’ ফলে মহানগর এলাকায় ওষুধ ও কৃষিপণ্যের দোকান এবং জরুরি সেবার দোকান ছাড়া সবধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কথা থাকলেও নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ছাড়া অন্যান্য এলাকায় মানা হচ্ছে না এ নিয়ম। ছোটখাটো দোকান খোলা রয়েছে। কাঁচাবাজারগুলোতে উপেক্ষিত হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি।

যশোরে আক্রান্তের হার দ্বিগুণ : যশোরে ১৫ দিনের ব্যবধানে জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। গত সোমবার সকাল থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় যশোরে ৫২৮ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ২৫৩ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. শাহনেওয়াজ। শনাক্তের হার ৪৮ শতাংশ।

এছাড়া যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আখতারুজ্জামান জানান, করোনা আক্রান্ত হয়ে ছয় এবং উপসর্গ নিয়ে আরও চারজন মারা গেছে হাসপাতালে।

করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে যশোরে সাত দিনের ‘সর্বাত্মক লকডাউন’ ঘোষণা করা হয়েছে। আগে থেকে আরোপিত বিধিনিষেধ আরও সাত দিনের জন্য কঠোর করে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তমিজুল ইসলাম খান।

সাতক্ষীরায় ‘লকডাউনেও’ নিয়ন্ত্রণ হারা সংক্রমণ-মৃত্যু : সাতক্ষীরায় চলমান ‘লকডাউনের’ মধ্যে সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. হুসাইন শাফায়াত জানান, এর মধ্যে করোনা আক্রান্ত হয়ে এক ও উপসর্গ নিয়ে আটজন মারা গেছে। এছাড়া সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১৮৮ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৮৬ জনের করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ৪৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

সংক্রমণ রোধে জেলায় চলমান ‘লকডাউনের’ মধ্যেও স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো বালাই নেই সাধারণ মানুষের মাঝে। ‘লকডাউনের’ মধ্যে শহর ও গ্রাম অঞ্চলের হাট-বাজারগুলোতে মানুষের ভিড় লক্ষণীয়।

সিভিল সার্জন ডা. হুসাইন শাফায়াত বলেন, ‘সাধারণ মানুষ কিছুতেই স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। এমন পরিস্থিতিতে লকডাউন আরও জোরদার করতে হবে।’

সংক্রমণ বাড়ায় চট্টগ্রামে কড়াকড়ি, ফটিকছড়ি ৮ দিনের ‘লকডাউনে’ : চট্টগ্রাম নগরীসহ বিভিন্ন উপজেলা ও আশপাশ এলাকায় আবারও করোনার প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রশাসন কড়াকড়ি আরোপ শুরু করেছে। এরই অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম নগরী ও আশপাশ এলাকায় ওষুধের দোকান ছাড়া সব ধরনের দোকানপাট, মার্কেট ও শপিং মল রাত ৮টার পর বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলার মধ্যে ফটিকছড়িতে গত ১৪ দিনে সংক্রমণের হার সর্বোচ্চ (৩৫ দশমিক ০৯ শতাংশ) হওয়ায় প্রথম পর্যায়ে আজ বুধবার সকাল ৬টা থেকে ৩০ জুন রাত ১২টা পর্যন্ত ‘লকডাউন’ কার্যকরের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গতকাল বিকেলে চট্টগ্রাম জেলা করোনাভাইরাস প্রতিরোধ সংক্রান্ত জেলা কমিটির সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

টাঙ্গাইলে ‘লকডাউন’ উপেক্ষা করে চলছে দূরপাল্লার বাস : টাঙ্গাইল জেলায় কয়েক দিন ধরে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় ‘লকডাউন’ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে ‘লকডাউন’ উপেক্ষা করে টাঙ্গাইল থেকে ছেড়ে যাচ্ছে দূরপাল্লার বাস। এতে করে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। গতকাল থেকে টাঙ্গাইল ও এলেঙ্গা পৌর এলাকায় সাত দিনের কঠোর বিধিনিষেধ ঘোষণা করে জেলা প্রশাসন।

ঝিনাইদহে কঠোর ‘লকডাউন’ ঘোষণা : ঝিনাইদহে নতুন করে আরও ৩০ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় ৬৩ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৩০ জনের ফলাফল পজিটিভ এসেছে। আক্রান্তের হার ৪৭ দশমিক ৬১ ভাগ। ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন ডা. সেলিনা বেগম জানান, গতকাল সকালে ঝিনাইদহ ল্যাব থেকে আসা নমুনার ফলাফলে এ তথ্য জানা গেছে। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে গতকাল সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৩০ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত জেলাব্যাপী ‘লকডাউন’ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন। গত সোমবার রাতে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে করোনা প্রতিরোধে জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

চুয়াডাঙ্গার জীবননগর ‘লকডাউন’ : সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলাতে ‘লকডাউনের’ ঘোষণা দিয়েছে প্রশাসন। আজ বুধবার সকাল ৬টা থেকে শুরু হয়ে পরবর্তী সাত দিন পর্যন্ত এ ‘লকডাউন’ বলবৎ থাকবে। গতকাল দুপুরে উপজেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত