ব্র্যাক, ইউএন উইমেন ও নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা

করোনাকালে আয় কমেছে ৭৭ শতাংশ পরিবারের

আপডেট : ২৫ জুন ২০২১, ০২:০৪ এএম

করোনা মহামারীতে গত বছর এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে দেশের ৭৭ শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় কমে গেছে। একই সময়ে ৩৪ শতাংশ পরিবারে কেউ না কেউ চাকরি অথবা আয়ের সক্ষমতা হারিয়েছেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক, জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেন এবং নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ‘কভিড-১৯-এর কারণে জনমিতিক ও আর্থসামাজিক পরিবর্তনসমূহ : নতুন পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এ গবেষণা প্রতিবেদনটি গত বুধবার এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ করা হয়।

গত বছর ১০-২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত গবেষণাটি পরিচালিত হয়। এতে ৬ হাজার ৩৭০টি খানা অংশগ্রহণ করে। করোনাকালে বিবিধ পরিস্থিতির শিকার হয়ে যারা দেশ ও দেশের বাইরে থেকে নিজ বাসভূমে ফেরত আসতে বাধ্য হয়েছেন, তাদের জীবনযাত্রায় সামগ্রিক প্রভাবের ওপর এ গবেষণায় বিশেষভাবে দৃষ্টিনিবদ্ধ করা হয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদনটির তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে দৈনন্দিন খরচ মেটাতে পরিবারগুলো সঞ্চয় ও ধারদেনার ওপর নির্ভরশীল ছিল। ফলে পরিবারগুলোর গড় মাসিক সঞ্চয় ৬২ ভাগ কমে গেছে, ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৩১ শতাংশ। এ গবেষণায় করোনাকালে বিপরীতমুখী অভিবাসনের প্রভাবে বাংলাদেশের মধ্যম মানের শহর, উপজেলা ও গ্রামীণ অঞ্চলে জনমিতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক পরিবেশের ওপর পরিবর্তনগুলো তুলে ধরা হয়েছে।

নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের প্রোগ্রাম লিড লিয়া জেমোর গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। অনুষ্ঠানে গবেষণা ফল উপস্থাপন করেন ব্র্যাক বাংলাদেশের ঊর্ধ্বতন পরিচালক কেএএম মোর্শেদ। আলোচনায় অংশ নেন ইউএন উইমেন, বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি শোকো ইশিকাওয়া, কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ড. ডেনিয়েল নাওজোকস এবং ব্র্যাক ইউএসএ’র পরিচালক (স্বাস্থ্য) ড. অ্যাডাম সোয়ার্টজ।

গবেষণা প্রতিবেদনটি বলছে, পরিবারগুলোর ৬১ শতাংশেরই অন্তত একজন সদস্য কভিড-১৯ মহামারীতে চাকরি বা উপার্জনের সুযোগ হারিয়েছেন। আবার গ্রামাঞ্চল বা মফস্বল শহরে ফিরে আসা আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ অভিবাসীদের প্রায় ৭৭ ভাগ মনে করেন কাজ বা চাকরি খুঁজে পাওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

জরিপে অংশ নেওয়া খানাগুলোতে প্রায় ২৫ শতাংশ ফেরত আসা আন্তর্জাতিক অভিবাসী অভিবাসন ঋণ পরিশোধ নিয়ে উদ্বিগ্ন, যার পরিমাণ ৭৬ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত। শতকরা ৪৪ ভাগ জানিয়েছেন, তারা কোনো উপার্জনমূলক কাজ পাননি। তাদের মধ্যে কিছু পরিবার সঞ্চয় উত্তোলন করে বা বিভিন্ন সম্পদ ভাড়া অথবা বন্ধক দিয়ে সংসার খরচ চালিয়ে যাচ্ছেন। জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারগুলোতে মহামারী চলাকালীন গড়ে মাসিক রেমিট্যান্স বা বিদেশ থেকে পাঠানো অর্থ ৫৮ ভাগ হ্রাস পেয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, গ্রাম বা মফস্বল শহরগুলোতে ফিরে আসা পরিবারগুলো বিদ্যমান স্থানীয় অপ্রতুল সম্পদ বিশেষত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। অভিবাসীদের মধ্যে প্রায় ৪ দশমিক ৫৭ ভাগ স্কুলের শিক্ষার্থী রয়েছে, যাদের গড় বয়স ৫-১৬ বছর। পুনরায় স্কুল খোলার পর যদি তারা তাদের পূর্ববর্তী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফেরত না যেতে পারে তবে স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। এছাড়া ফেরত আসা প্রায় ১৩ দশমিক ৩৫ ভাগ জনগোষ্ঠীর বয়স চল্লিশোর্ধ্ব এবং ৪ দশমিক ৫৬ ভাগের বয়স পঞ্চাশের ওপরে, যাদের ফেরত যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এ বিষয়টি স্থানীয় স্বাস্থ্য পরিষেবার ওপর বিশেষ করে অসংক্রামক ব্যাধির ক্ষেত্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।

ফেরত আসা নারীদের মধ্যে বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ অভিবাসী পরিবারগুলোর নারীরা করোনাকালীন বেশকিছু সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন, যা এ গবেষণায় উঠে এসেছে। যেমন কোনো উৎপাদনশীল বা আয়মূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে না পারা (৭৪ শতাংশ), রাস্তাঘাট ও বাজারে স্বাধীনভাবে চলাচল করতে না পারা (২৬ দশমিক ৮ শতাংশ), স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সমস্যা অনুভব করা এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধার অভাব বোধ করা (২০ শতাংশ), গৃহস্থালি কাজের চাপ বৃদ্ধি এবং শিশু লালনপালন ও সন্তানদের সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে সমস্যা অনুভব করা (১৮ শতাংশ)।

জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, ওই সময়ে দেশে বাল্যবিবাহ বেড়ে গেছে। বিয়ের সময় কনে কোন শ্রেণিতে পড়ত তার ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জরিপকালে অনুষ্ঠিত বিয়ের মধ্যে বিবাহ অনুষ্ঠানের সময় তিন-চতুর্থাংশের বেশি ৭৭ শতাংশ কনের বয়স ছিল ১৮ বছরের নিচে এবং ৬১ শতাংশ কনের বয়স ছিল ১৬ বছরের কম।

গবেষণার তথ্য ও ফলাফল উপস্থাপনের পর নীতিবিষয়ক আলোচনায় শোকো ইশিকাওয়া বলেন, ‘বাংলাদেশে দেড় বছরের ওপরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ডিজিটাল পদ্ধতিতে শেখার সুযোগও অত্যন্ত সীমিত। দীর্ঘসময় স্কুল বন্ধ থাকার কারণে বাল্যবিবাহ বেড়ে গেছে। অর্থনৈতিক সংকটে পড়া পরিবারগুলো কন্যাসন্তানদের বাল্যবিবাহের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ অবস্থা থেকে বাঁচতে এসব পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষা দিতে হবে ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত