রাজশাহীতে করোনায় মৃত্যু কমছেই না। সোমবার ১৫ দিনের মধ্যে সবচেয়ে কম মৃত্যুর তথ্য দেওয়ার পরদিনই ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ডসংখ্যক মৃত্যুর কথা জানাল রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। সোমবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সেখানে সর্বোচ্চ ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে এদের মধ্যে ১৬ জন মারা গেছে করোনা উপসর্গ নিয়ে। করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু বেড়েছে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও। আলোচ্য সময়ে বরিশালে যে আটজনের মৃত্যু হয়েছে তার মধ্যে ছয়জনই উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। বিভাগটিতে আগের দিনও উপসর্গে মৃত্যু ছিল ৭০ শতাংশের বেশি। খুলনা বিভাগের যশোর, ঝিনাইদহ ও নড়াইলেও উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা করোনায় মৃত্যুর চেয়ে বেশি। একই অবস্থা দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভাগ রংপুরেও। বিভাগটির দিনাজপুরে জ¦র, সর্দি, কাশিতে অনেকে আক্রান্ত হলেও টেস্ট করানোর ক্ষেত্রে আগ্রহ নেই মোটেই। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেস্ট করে আইসোলেশনে না গেলে পরিস্থিতি ভয়ংকর রূপ নিতে পারে।
দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে বিস্তারিত
রামেকে মৃত্যুর রেকর্ড : আগের ২৪ ঘণ্টায় রামেকে করোনাকালে মৃত্যুর রেকর্ড ভেঙেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এখানে মৃত্যু হয়েছে ২৫ জনের। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী জানিয়েছেন, মৃত ২৫ জনের মধ্যে ৯ জনের করোনা পজিটিভ ছিল। বাকি ১৬ জন মারা যায় উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায়।
তিনি জানান, মৃতদের মধ্যে রাজশাহীর ১২, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫, নাটোরে ৫, নওগাঁয় ২ ও চুয়াডাঙ্গায় ১ জন। এ নিয়ে চলতি মাসে এ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মারা গেল ৩৪৩ জন। এর মধ্যে করোনা শনাক্ত হয়ে মারা যায় ১৬৩ জন। বাকিরা উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।
নাটোরে রেকর্ড শনাক্ত : নাটোর সদর হাসপাতালে করোনা উপসর্গে দুজন মারা গেছে। এছাড়া রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছে পাঁচজন। সর্বমোট মৃতের সংখ্যা আজ সাতজন। নাটোর সদর হাসপাতালে মৃতদের মধ্যে রেজিয়া (৬২) নামে এক নারী করোনায় এবং মজিবর (৬০) নামে এক ব্যক্তি উপসর্গে মারা যান। নাটোরে সরকারি তালিকা মতে, করোনায় অর্ধশত মানুষ মারা গেল।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় নাটোরে ভয়াবহ রেকর্ড ১৬১ জন নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে। ৫৭০ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। সংক্রমণের হার ২৮.২৪ শতাংশ। জেলায় মোট আক্রান্ত ৩ হাজার ৭১৫ জন।
খুলনা বিভাগে আরও ৩২ মৃত্যু : খুলনা বিভাগে করোনাভাইরাসের এক দিনে দ্বিতীয়বারের মতো সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে বিভাগে ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে নতুন করে রেকর্ড ১ হাজার ৩৬৭ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ৩ হাজার ৩৭১টি। নমুনা পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার ৪০ দশমিক ৫৫ শতাংশ। গতকাল মঙ্গলবার বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. রাশেদা সুলতানা এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এর আগে খুলনা বিভাগে গত ২৩ জুন করোনায় সর্বোচ্চ ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছিল। আর সোমবার ৩০ জনের মৃত্যু হয়।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর সূত্র জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের মধ্যে যশোরে সর্বোচ্চ আটজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া বাগেরহাটে পাঁচ, খুলনায় চার, কুষ্টিয়ায় চার, নড়াইলে তিন, মেহেরপুরে দুই, চুয়াডাঙ্গায় দুই, মাগুরায় দুই, ঝিনাইদহে এক এবং সাতক্ষীরায় একজন মারা গেছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনায় ৩৭৮, বাগেরহাটে ১১৬, সাতক্ষীরায় ৩৩, যশোরে ৩০৮, ঝিনাইদহে ৯৩, মাগুরায় ২৯, নড়াইলে ৫১, কুষ্টিয়ায় ১৮০, চুয়াডাঙ্গায় ৯৯ ও মেহেরপুরে ৮০ জন করোনায় শনাক্ত হয়েছে।
ঝিনাইদহে করোনা ও উপসর্গ নিয়ে ৮ জনের মৃত্যু : করোনা আক্রান্ত আর মৃত্যু দিন দিন বাড়ছে সীমান্তবর্তী জেলা ঝিনাইদহে। গত ২৪ ঘণ্টায় ঝিনাইদহে করোনায় তিন ও উপসর্গ নিয়ে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৯৩ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে।
এদিকে করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে ঝিনাইদহ জেলায় শুরু হয়েছে ‘কঠোর লকডাউন’। ‘লকডাউন’ কার্যকরে শহরের বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট ও অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ ও ভ্রাম্যমাণ আদালত।
বরিশালে করোনায় ৭ জনের মৃত্যু : বরিশালে প্রতিদিনই বাড়ছে করোনা শনাক্তের হার। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর পর বরিশাল বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় এক দিনে সর্বোচ্চ করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বরিশাল বিভাগে ৫৪৪ জনের নমুনা পরীক্ষায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ১৯৩ জনের। এতে বিভাগে শনাক্তের হার ৩৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এর আগের সোমবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৪৬৭ জনের নমুনা পরীক্ষায় করোনা শনাক্ত হয়েছিল ১৮১ জনের।
গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা পজিটিভ ও উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে সাতজন। এর আগের (সোমবার) ২৪ ঘণ্টায় মারা যায় আটজন। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া সাতজনের মধ্যে পাঁচজন উপসর্গ নিয়ে এবং দুজন করোনা পজিটিভ রোগী।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের ছয় জেলায় করোনা পজিটিভ রোগী শনাক্ত হয়েছে ১৯৩ জন। এর মধ্যে বরিশাল জেলায় শনাক্ত ৬৭ জন নিয়ে মোট ৭ হাজার ৭০৮, পটুয়াখালী জেলায় নতুন ২০ জন নিয়ে মোট ২ হাজার ৪৫৬, ভোলায় নতুন ১০ জনসহ মোট ১ হাজার ৪৭ জন, পিরোজপুর জেলায় নতুন ৬৩ জন নিয়ে মোট ২ হাজার ১৪২ জন, বরগুনা জেলায় নতুন ১৫ জন নিয়ে মোট আক্রান্ত ১ হাজার ৪১০ জন এবং ঝালকাঠি জেলায় নতুন ১৮ জন শনাক্ত হওয়ায় মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬২৯ জন।
বরগুনায় ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত দ্বিগুণ : বরগুনায় রেকর্ডসংখ্যক ৩৮ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের এক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়। করোনা মহামারীর শুরু থেকে এখনো পর্যন্ত জেলায় এটি সর্বোচ্চ সংক্রমণ।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, সোমবার ১১৪ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল। প্রাপ্ত ফলে ৩৮ জন ব্যক্তির শরীরে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়। সিভিল সার্জন অফিসের জেলা স্বাস্থ্য তত্ত্বাবধায়ক খান সালামত উল্লাহ জানান, মঙ্গলবার (আজ) জেলায় সর্বাধিক আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে। এর আগে এতসংখ্যক ব্যক্তির আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি।
এ বিষয়ে সিভিল সার্জন ডা. মারিয়া হাসান বলেন, ‘দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বরগুনায় প্রতিদিনই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। নিয়ন্ত্রণে আনতে আমাদের সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কঠোর হওয়ার বিকল্প নেই। নয়তো অন্য এলাকার মতো আমরাও দ্রুত সবচেয়ে ঝুঁকির এলাকায় পরিণত হব।’
ময়মনসিংহ বিভাগে শনাক্ত ২৪২ : ময়মনসিংহ বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসে আরও ২৪২ জন আক্রান্ত হয়েছে। বিভাগের চার জেলায় ১ হাজার ১৪২ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। শনাক্তের হার ২০ দশমিক ৭৯। এই ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে।
শেষ ২৪ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ বিভাগের শেরপুর জেলায় করোনায় দুজনের মৃত্যু হয়েছে। ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলায় এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে ১৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ময়মনসিংহ বিভাগের চারটি জেলায় বাস চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। বিধিনিষেধ কার্যকর করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে।
রংপুর বিভাগে ৭ জনের মৃত্যু : রংপুর বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে করোনা শনাক্ত হয় ৪৬৭ জনের। মৃত সাতজনের মধ্যে ঠাকুরগাঁও জেলার ছয় ও দিনাজপুরের একজন।
এদিকে একই সময়ে ১ হাজার ১৫৫ জনের নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। এতে করোনা শনাক্ত হয়েছে আরও ৪৬৭ জনের। এ নিয়ে বিভাগে মোট করোনা শনাক্ত হয়েছে ২৫ হাজার ৫০৭ জনের। বিভাগে করোনায় মারা গেছে ৫১০ জন। এছাড়া ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছে ২০২ জন।
বিভাগে করোনায় এ পর্যন্ত মারা যাওয়া ৫১০ জনের মধ্যে দিনাজপুরের ১৮২, রংপুরের ১১১, ঠাকুরগাঁওয়ের ৮৩, পঞ্চগড়ের ২২, নীলফামারীর ৩৮, লালমনিরহাটের ২৪, কুড়িগ্রামের ২৭ ও গাইবান্ধার ২৩ জন।
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক আবু মো. জাকিরুল ইসলাম এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানান।
পার্বতীপুরে টেস্টে আগ্রহ নেই : দিনাজপুরের পার্বতীপুরে জ¦র, সর্দি ও কাশির প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। প্রায় প্রতিটি বাড়িতে জ¦র ও কাশিতে আক্রান্ত হচ্ছে পরিবারের সদস্যরা। সর্দি, জ¦র, কাশি ও গলাব্যথা হলেও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাচ্ছে না করোনা টেস্ট করাতে। যেই জ¦র নিয়ে পরীক্ষা করাতে যাচ্ছে তারই করোনা শনাক্ত হচ্ছে। এ কারণে অনেকেই ডাক্তারের কাছে না গিয়ে বাড়িতেই চিকিৎসা নিচ্ছে। ওষুধের দোকানদাররা জানিয়েছেন, বর্তমানে সর্দি, জ¦র, কাশি, শ্বাসকষ্ট ও গলাব্যথার ওষুধ বিক্রি হচ্ছে অনেক বেশি।
উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় এখন পর্যন্ত করোনা পজিটিভ হয়েছে ৫৫৭ এবং সুস্থ হয়েছে ৪৮৭ জন।
পার্বতীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আবদুল্লাহেল মাফী জানান, হাসপাতালে করোনা টেস্টের যথাযথ ব্যবস্থা রয়েছে। সবার উচিত করোনা টেস্ট করা। আল্লাহর অশেষ রহমতে পার্বতীপুরে করোনা সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। জনসাধারণদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাফেরা করা, নিয়মিত মাস্ক ব্যবহার করা দরকার।
