হলি আর্টিজান জঙ্গিদের পরিবার লোকলজ্জায় এলাকাছাড়া

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২১, ০১:৩৯ এএম

ঢাকার মোহাম্মদপুরে একসময় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন এস এম ইমতিয়াজ খান বাবুল। তিনি দেশ-বিদেশে আলোচিত হলি আর্টিজান হামলায় অংশ নিতে গিয়ে যৌথ অভিযানে নিহত জঙ্গি নেতা রোহান ইমতিয়াজের বাবা। ঘটনার পরের বছরই তিনি এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন পরিবার নিয়ে। লোকলজ্জার ভয়ে তিনি কোথায় আছেন তাও কেউ বলতে পারছেন না। রোহানের বাবার মতোই আরেক জঙ্গি মীর সামেহ মোদাচ্ছিরের পরিবারও। রোহান ও সামেহের মতোই হামলায় নিহত অন্য জঙ্গিদের পরিবারেরও একই দশা। তারা কোথায় আছে তা এলাকার লোকজন বলতে পারছেন না। তারা শুধু বলছেন, ঘটনার পর থেকেই সবাই উধাও। কেউ ভাড়া বাসা ছেড়ে দিয়েছেন। আবার কেউ ফ্ল্যাট-বাড়ি বিক্রি করে ফেলেছেন। গতকাল রোহান ও সামেহের ঠিকানায় সরেজমিনে গিয়েও কাউকে পাওয়া যায়নি। বাসার দারোয়ান ও আশপাশের লোকজনও তাদের বিষয়ে দিতে পারেননি সুনির্দিষ্ট তথ্য।

লোকলজ্জার ভয়ে যেমন এলাকা ছেড়েছেন তেমনি আদরের সন্তানদের কবরটি ঘটনার পর থেকে একবারও দেখতে যাননি বাবা-মা বা তাদের স্বজনরা। গতকাল জুরাইন কবরস্থানে দুজন কর্মচারী এই তথ্য জানিয়ে গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, গুলশানে জঙ্গি হামলায় অংশ নেওয়া জঙ্গিদের এখানে কবর দেওয়া হয়েছে। আজও তাদের পরিবার কবর দেখতে আসেনি। তবে ঘটনার সপ্তাহ খানেক পর সামেহের এক বন্ধু এসেছিলেন। মিনিট পাঁচেক থেকে তিনিও উধাও হয়ে যান।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, হলি আর্টিজান মামলার অন্যতম মাস্টারমাইন্ড মেজর (অব.) জিয়ার রহস্য এখনো উদঘাটন করা যায়নি। তিনি কোথায় আছেন সেই তথ্যই নেই। তবে তাকে ধরার চেষ্টা চলছে। গুলশানে হামলার পর তিনি আসেন লাইমলাইটে। নব্য জেএমবিসহ কয়েকটি জঙ্গি সংগঠন গড়ে তোলেন জিয়া। জিয়ার অন্যতম সহযোগী কানাডা প্রবাসী তামিম চৌধুরী। তাকে ধরিয়ে দিতে পুলিশ সদর দপ্তর ২০ লাখ টাকার পুরস্কারও ঘোষণা করেছিল। তবে তামিম চৌধুরী নারায়ণগঞ্জে জঙ্গি হামলা চালানোর সময় এনকাউন্টারে মারা যান।

হলি আর্টিজান হামলার ৫ বছর অতিবাহিত হয়েছে গতকাল বৃহস্পতিবার। করোনার প্রভাবে জারি হওয়া লকডাউনের কারণে সংক্ষেপে নিহতদের প্রতি সম্মাননা জানান র‌্যাব মহাপরিচালক, ডিএমপি কমিশনার, পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনসহ কয়েকটি দূতাবাসের কর্মকর্তারা। গত বুধবার দুপুরে হলি আর্টিজান ও অকিচেন রেস্তোরাঁ ভবনে গিয়ে দেখা গেছে, ভবনে প্রবেশের গেইটটি সার্বক্ষণিক রাখা হচ্ছে বন্ধ। তবে লেকভিউ ক্লিনিক চালু থাকায় মূল গেইট রাখতে হয়েছে খোলা। পরিচয় নিশ্চিত হলে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। গুলশানের র‌্যাংগস আর্কেডের ২য় তলায় চালানো হচ্ছে ব্যবসা। তবে লকডাউনের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে বেকারিটি। গুলশানের ৭৯ নম্বর রোডের কয়েকজন বাসিন্দা জানিয়েছেন, জঙ্গি হামলার পাঁচ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও এখনো ভয় কাটছে না তাদের। হামলার ঘটনা মনে করলেই আঁতকে উঠেছেন। কমান্ডো অভিযানে নিহত নিবরাস ইসলাম নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির সাবেক শিক্ষার্থী ছিল। পরে সে মালয়েশিয়ায় মোনাস ইউনির্ভাসিটিতে ভর্তি হয়। মীর সামেহ মোবাশ্বের উত্তরার স্কলাসটিকার ছাত্র। রোহান ইমতিয়াজ স্কলাসটিকা থেকে পাস করে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়। খায়রুল ইসলাম পায়েল, শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল পড়ালেখায় বেশিদূর এগোতে পারেনি। ৯ জন ইতালিয়ান, সাতজন জাপানি, একজন ভারতীয় নাগরিক এবং বাংলাদেশের ফারাজ আইয়াজ হোসেন, অবন্তী কবীর, ইশরাত আখন্দ এবং দুজন পুলিশ কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম ও মোহাম্মদ সালাউদ্দিনসহ ২২ জনকে হত্যা করে জঙ্গিরা।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশ থেকে জঙ্গি নির্মূল করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো আপ্রাণ চেষ্টা করছে। হলি আর্টিজানে হামলার পর আমরা অভিযানের পর অভিযান চালিয়েছি। তারপরও আমরা সতর্ক আছি জঙ্গিদের বিষয়ে। তিনি আরও বলেন, সারাবিশ্বের জঙ্গিরা এখন অনলাইনে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। দেশেও অনলাইনে জঙ্গি কার্যক্রম দেখা যায়। অনলাইনে আমাদের কঠোর নজরদারি রয়েছে।

র‌্যাব মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, জঙ্গি দমনে র‌্যাবের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে জঙ্গিরা এখন অনলাইন প্লাটফর্ম ব্যবহার করে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। র‌্যাবের নিয়মিত অভিযান ও নজরদারির কারণে তারা তৎপরতা দেখাতে পারছে না। র‌্যাব শুরু থেকেই জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জোরালো ভূমিকা রেখে আসছে। হলি আর্টিজান হামলার পর এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক জঙ্গিকে র‌্যাব গ্রেপ্তার করেছে।

মোহাম্মদপুর লালমাটিয়ার বি ব্লকের ৭/৯ নম্বর বাসায় প্রায় বিশ বছর ধরে বসবাস করে আসছিল রোহান ইমতিয়াজের পরিবার। এলাকায় আছে তাদের প্রচুর সুনাম ও নামডাক। বিশেষ করে রোহানের বাবা এসএম ইমতিয়াজ খান বাবুল নেতা হিসেবেই পরিচিত ছিলেন এলাকায়। কিন্তু ২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিজানের ঘটনায় সবকিছু চুরমার হয়ে যায়। ওই ঘটনায় বাবুলের একমাত্র সন্তান রোহান সরাসরি জড়িত। কমান্ডো অভিযানে নিহত ৫ জঙ্গির মধ্যে রোহান অন্যতম। গতকাল দুপুরে লালমাটিয়ার বাসায় গিয়ে তাদের পাওয়া যায়নি। বাসার দারোয়ানও তাদের বিষয়ে বলতে পারছেন না। ওই বাসার দারোয়ান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঘটনার ৬ মাস পরই তিনি বাসা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। তিনি কোথায় গেছেন সেই ঠিকানা আমাদের জানা নেই। রোহান জঙ্গি হবে পরিবারের সদস্যদের মতো আমরাও বিশ^াস করতে পারছি না। পড়াশোনায় খুবই ভালো ছিল। নিয়মিত নামাজ পড়ত। তারা এক ভাই দুই বোন। দুই বোন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর রোহান বাসা থেকে বের হয়। তারপর  আর আসেনি। ওই সময় রোহানের বাবা ও মা চিকিৎসার জন্য ভারত যান। তিনি দেশে এসে মোহাম্মদপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। রোহানকে ফিরে পেতে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপিসহ সব জায়গায় যান। কিন্তু কারও কাছ থেকে সহায়তা পাননি বলে প্রায়ই বাবুল স্যার বলেছিলেন। গতকাল সকালে মীর সামেহ মোদাচ্ছিরের বনানীর ডিওএইচএসের ৫ নম্বর রোডের ৬৮/৩ নম্বরের বাসায় গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। ওই বাসার দারোয়ান জানান, তারা ফ্ল্যাট বিক্রি করে অন্য কোথাও চলে গেছে। তার বাবা হায়াত কবির গার্মেন্ট ব্যবসা করেন। মা একটি কলেজে অধ্যাপনা করেন। শুনেছি তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। সামেহ উত্তরায় স্কলাসটিকায় পড়াশোনা করেছেন। ২০১৬ সালের ২৯ ফেব্র“য়ারি বাসা থেকে বের হয়ে যায় সামেহ। উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের ১২ নম্বর রোডের একটি বাসায় বসবাস করত নিবরাস ইসলামের পরিবার। তারা অন্য কোথাও চলে গেছেন। ঘটনার কিছুদিন পর পুলিশ নিবরাসের বাবা নজরুল ইসলাম একটি চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিতে বলেন, ‘যে ছেলেটি নিজের হাতে ভাত মেখে খেতে পারত না তার হাতে কারা গুলি, বোমা ও গ্রেনেড তুলে দিল? আমরা সেসব ব্যক্তি, গোষ্ঠীর বিচার চাই আল্লাহর দরবারে। আমরা চাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রত্যেককে খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তি দেবে, আমরা ক্ষমা প্রার্থী, আমাদের ক্ষমা করে দিন। নিবরাস অত্যন্ত সৎ, বিনয়ী ও শান্ত স্বভাবের ছেলে ছিল। ২০১৬ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে সে নিখোঁজ হয়। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করা হয়। হলি আর্টিজানের ঘটনায় নিবরাস জড়িত। এই জন্য আমরা লজ্জিত এবং দুঃখিত এবং ক্ষমাপ্রার্থী। যারা স্বজনদের হারিয়েছেন তাদের কাছে আমরা ক্ষমা চাই। সারা জাতি, দেশের মানুষ ও বিশ্ববাসীর কাছে ক্ষমা চাই।’

ডিবি পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, হলি আর্টিজান ও অকিচেন রেস্তোরাঁর মালিক আলী আর্সেনাল। ঘটনার পর অনেকটা বেকায়দায় পড়ে যান। তদন্ত করতে পুলিশ একাধিকবার তাকে তলব করেছিল। তাছাড়া রেস্তোরাঁর কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পাশাপাশি ভবন মালিককেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে আলী আর্সেনালকে ব্যবসা করার অনুমতি দেয় পুলিশ। এখন তিনি ব্যবসা কার্যক্রম চালাচ্ছেন বলে আমরা জানি।

গত সপ্তাহে অকিচেন রেস্তোরাঁয় গিয়ে দেখা গেছে, অল্প কয়েকজন কর্মচারী দিয়ে বেকারিটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তবে করোনার কারণে ক্রেতার সংখ্যা কম। গত বুধবার বিকেলে দেখা গেছে বেকারিটি বন্ধ। গতকাল সকালে হলি আর্টিজান ভবনটিও দেখা গেছে তালাবদ্ধ। লেকভিউ ক্লিনিক খোলা আছে। জঙ্গি হামলার পর বসবাসের উপযোগী করা হয়েছে বাড়িটি। ১৯৭৯ সালে আবাসিক ভবন ও ক্লিনিক গড়ে তোলার জন্য ডা. সুরাইয়া জাবিনকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল বাড়িটি। ১৯৮২ সালে ওই প্লটের একপাশে গড়ে তোলা হয় লেকভিউ ক্লিনিক। সুরাইয়ার মৃত্যুর পর প্লটের মালিক হন তার মেয়ে সামিরা ও সারা আহমেদ। লকডাউনের কারণে এবার শ্রদ্ধা নিবেদন করেননি দেশি-বিদেশি নাগরিক ও স্বজনরা। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত নীরব হলি আর্টিজান ভবনটি। তবে কয়েকজন বিদেশি ও ডিএমপি কমিশনার ও র‌্যাব মহাপরিচালক এসেছেন শ্রদ্ধা জানাতে। দিবসটি উপলক্ষে নিরাপত্তার কমতি ছিল না। ভবনের সামনে ও ভেতরে ১৫-১৬ জন পুলিশের একটি টিম সক্রিয় ছিল।

সিটিটিসির প্রধান মো. আসাদুজ্জামান বলেন, হলি আর্টিজানের ঘটনার পর ২৩টি বড় ধরনের অভিযান চালানো হয়েছে। এতে ৬৩ জঙ্গি মারা যায়। সারা দেশে জঙ্গিবিরোধী সচেতনতার জন্য ১৭৪টি সভা-সমাবেশ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়েছি। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত