করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে ‘কঠোর বিধিনিষেধের’ দ্বিতীয় দিনে গতকাল শুক্রবার রাজধানীর সড়ক ছিল অনেকটাই ফাঁকা। দিনভর বৃষ্টি ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলে এদিন সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ির উপস্থিতি ছিল খুবই কম। তবে স্বল্পসংখ্যক রিকশা, মালবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান চলাচল করেছে।
ঘর থেকে বেরিয়ে অনেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জেরায় পড়েন। এদের বেশিরভাগ স্বজনরা হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন বলে জানান। যারা বের হওয়ার যৌক্তিক কারণ দেখাতে পারেননি, তাদের কপালে জুটেছে জেল-জরিমানা। এদিন ৩২০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। গত বৃহস্পতিবার ৫৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
গতকাল সরেজমিন ও সড়কে দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। তারা বলছেন, বাইরে বের হওয়াদের বেশিরভাগ জানিয়েছেন তাদের মা আইসিইউতে, বাবা ও অন্যান্য স্বজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আবার কেউ কেউ বলেছেন, তারা স্বজনের মরদেহ দাফন করতে বের হয়েছেন। তাদের কারণ যৌক্তিক মনে হলে ছাড় দেওয়া হয়েছে। আর জরুরি সেবার সঙ্গে জড়িতরাও নির্বিঘেœ চলাচল করেছে।
ডিএমপির হেডকোয়ার্টার্স সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ডিএমপির আটটি বিভাগে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ‘বিনা কারণে’ সড়কে বের হওয়াদের মধ্যে ৩২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং জরিমানা করা হয়েছে ২০৮ জনকে। ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ ২১৯টি মামলা করেছে। জরিমানা করেছে ৫ লাখ ৪৫ হাজার ৫০০ টাকা।
গতকাল সকাল থেকেই বৃষ্টির মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন চেকপোস্টে পুলিশকে সতর্ক দেখা গেছে। মোটরসাইকেল, রিকশা, প্রাইভেট কারে চলাচলকারীদের থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তারা। ব্যাখ্যা সন্তোষজনক হলে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। বেশিভাগই জরুরি প্রয়োজনে বৃষ্টির মধ্যে ঘর থেকে বের হয়েছেন বলে দাবি করেছেন।
গতকাল বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে দেখা যায়, ট্রাফিক পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সেখানে ঢাকা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. খাইরুল ইসলাম ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছেন।
এ সময় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মাঝে একটি মোটরসাইকেল থামালে পেছনের সিটে বসা নারী জানান, তার মা গুরুতর অসুস্থ। ঢাকা মেডিকেলের আইসিইউতে, সেখানে যাচ্ছেন তারা। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কথা না বাড়িয়ে তাদের যাওয়ার সংকেত দেন। এ সময় রিকশা থামিয়ে এক যুবককে জিজ্ঞাসা করলে তিনিও জানান বন্ধু আইসিইউতে, সেখানে যাচ্ছেন। তাকেও ছেড়ে দেন। এখানে যাদের থামানো হচ্ছিল, তাদের বেশিরভাগই হাসপাতালে স্বজন, ওষুধ কিনতে, ব্লাড ডোনার সংগ্রহের কথা জানান।
এ সময় মাস্ক ছাড়া বের হওয়া শাহিনুর নামে এক যুবককে ২০০ টাকা জরিমানা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. খাইরুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রথম দিনের চেয়ে আজ (গতকাল) রাস্তায় লোক কম বের হয়েছে। যারা বের হয়েছেন, তাদের বেশিরভাগই জরুরি প্রয়োজনের কথা বলছেন। তাদের মধ্যে হাসপাতালের কথাই বেশি বলছেন তারা। আসলে মা হাসপাতালের আইসিইউতে জানালে কিছু বলার থাকে না। এরপরও মাস্ক ছাড়া এলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছি। এরকম চারটি মামলা ও ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।’
গতকাল বেলা ১১টার দিকে গণভবনের ঠিক পাশেই ‘নাবিল গ্যাপ চেকপোস্টে’ বৃষ্টির মধ্যে কড়া নজরদারিতে ছিল পুলিশের তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগ। বৃষ্টির মধ্যে রাস্তা অনেকটাই ফাঁকা ছিল। রিকশা, মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারে গন্তব্যে যাতায়াতকারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
এ চেকপোস্টে দায়িত্বরত ডিএমপির ট্রাফিক তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার এসএম শামীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তেজগাঁও ডিভিশনে নয়টি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। আজ (গতকাল) সকাল থেকেই বৃষ্টি হওয়ায় লোকজনের চলাচল অনেক কম। বিনা প্রয়োজনে বের হলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হচ্ছে। বাইরে আসা বেশিরভাগ মানুষই চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যাওয়ার কথা বলেছেন।’
রাজধানীর খিলগাঁও খিদমাহ হাসপাতালের সামনের চেকপোস্টে দায়িত্বরত ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) জাকির হোসেন বলেন, ‘বৃষ্টির জন্য যেমন রাস্তায় মানুষ কম, গাড়িও কম। এরপরও আমরা সন্দেহ হলেই জিজ্ঞাসা করেছি।’
তেজগাঁও বিজি প্রেসের সামনে অবস্থিত চেকপোস্টের দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক সার্জেন্ট মো. সোহেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বৃহস্পতিবারের চেয়ে আজ (গতকাল) লোক অনেক কম বের হয়েছে। যারা বের হয়েছেন, তারা নানা অজুহাত দেখাচ্ছেন।’
